১০ অক্টোবরের কথা। সেদিনটা ছিল রবিবার। পূর্ব ব্যবস্থা অনুযায়ী সেদিন বিকেলে সেই দুজন লোককে সঙ্গে করে আমি আমার পরম পূজ্যাস্পদ খুল্লতাত ক্যাবলাকান্তর সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে হাজির হলাম। আমাদের আশা আকাঙ্খ তছনছ হয়ে যাবে মনে গেঁথে রাখার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক তিন সপ্তাহ পরে সে ঘটনাটা ঘটে।
আমরা তাঁর বাড়ি পা দেবার পর প্রথম আধঘণ্টা মামুলি কথাবার্তার মধ্য দিয়েই কেটে যায়। তারপর খুবই সতর্কতার সঙ্গে আমরা আলোচনাটাকে মোড় ঘুরিয়ে এভাবে নিয়ে গেলাম–
ক্যাপ্টেন প্যান্ট বললেন–আপনি তো জানেনই যে, তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বুড়ো খুল্লতাত বলে উঠলেন–‘কথা? কি কথা, নির্দিধায় বলে ফেলুন মি. প্র্যান্ট।
‘কথাটা হচ্ছে, আমি এক বছর এখানে ছিলাম না তা-তো আপনি ভালোই জানেন, কী বলেন?’
‘হ্যাঁ, তা জানি বটে।’
‘আজ ঠিক এক বছর পূর্ণ হলে আমি আবার এ দেশের মাটিতে পা দিয়েছি।’
‘হ্যাঁ, তা-তো দেখতেই পাচ্ছি।’
‘হ্যাঁ, আজ তো দশই অক্টোবর–আজই এক বছর পূর্ণ হল। আশা করি আপনার অবশ্যই মনে আছে মি. ক্যাবলাকান্ত, গত বছর ঠিক এ তারিখটাতেই আপনার বাড়ি এসেছিলাম, বিদায় নেবার জন্য।
‘হ্যাঁ, মনে আছে–অবশ্যই মনে আছে।
‘ভালো কথা, ব্যাপারটা কিন্তু আকস্মিক যোগাযোগই সন্দেহ নেই–আমাদের এ বন্ধু ক্যাপ্টেন স্মিদার্টনও ঠিক এক বছর এখানে ছিলেন না। তিনিও আজই এখানে পৌঁছেছেন।
এবার ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন বললেন–‘হ্যাঁ, এক বছরই বটে। ঠিক এক বছরেরই ব্যাপার। ঠিক এক বছর বিদেশে কাটিয়ে আজই এখানে পৌঁছেছি।’
‘হ্যাঁ–হ্যাঁ, তা বটে। আমার হাড়গিলে খুল্লতাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন।
‘মি. ক্যাবলাকান্ত, আশা করি আপনার স্মরণ আছে, গত বছর ঠিক যে দিনে, অর্থাৎ দশ অক্টোবর ক্যাপ্টেন এ্যান্টের সঙ্গে আপনাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাবার জন্য আমিও এ-বাড়িতে এসেছিলাম।’
‘আছে, অবশ্যই মনে আছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ আছে মনে তো আছেই। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুতই বটে মি. স্মিদার্টন, তাই না?
‘কেন? অদ্ভুত কেন?’
‘অদ্ভুত নয় বলছেন? আপনারা দুজনই ঠিক এক বছর আগে গিয়েছিলেন।
আবার আজ, আবার একই দিনে দেশের মাটিতে ফিরে এসেছেন। অদ্ভুত তো বটেই।
‘এদিক থেকে তো অদ্ভুতই বটে।
‘খুবই আশ্চর্য যোগাযোগ। ডক্টর ডাবু এলো. ডী, যাকে ঘটনার এক অদ্ভুত যোগাযোগ আখ্যা দিয়েছেন। ডক্টর ডাক্ বলেন–‘
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই কেট আগ বাড়িয়ে বলে উঠল–‘ব্যাপারটা যে অদ্ভুত এ-কথা তো স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু বাবা, ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন আর ক্যাপ্টেন প্যান্ট তো ঠিক একই দিকে, মানে একই পথে যাননি। আর আশা করি অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে না, সেটাই উভয়ের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য, ঠিক বলিনি?
আমার পূজ্যাস্পদ কাকা বললেন–‘বাছা, আমি অন্য কোনো কথা বুঝি না। কি করেই বা বুঝব, বল? আমার কিন্তু ধারণা, ব্যাপারটা এরই ফলে আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডক্টর ডাবল’।
তাঁকে নামিয়ে দিয়ে কেট আবার সরব হল–না, তা কেন হবে? ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন উত্তমাশা অন্তরীপে গিয়েছিলেন, আর হর্ণ অন্তরীপ ঘুরে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট।
‘ঠিক! একদম ঠিক কথা বলেছ। একজন গিয়েছিলেন পশ্চিম দিকে, আর দ্বিতীয়জন গিয়েছিলেন পূর্বদিকে, ঠিক কি না?
কেট বলল–‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন।
‘ভালো কথা, ডক্টর ডাব–‘
আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম–‘ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন আর ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট, আপনাদের কাছে আমার একটা সনির্বন্ধ অনুরোধ আছে।
‘অনুরোধ? কি বলছেন, খোলাখুলি বলেই ফেলুন?’ ক্যাপ্টেন স্মিদার্টন ও ক্যাপ্টেন প্যান্ট সমস্বরেই বলে উঠলেন।
‘আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ আগামীকাল সন্ধ্যায় আপনাদের একবারটি আমার বাড়ি আসতে হবে।
উভয়ে মুচকি হেসে প্রায় সমস্বরেই বলে উঠলেন–সে-না-হয় এলাম, কিন্তু কেন দয়া করে বলবেন কী?
‘আরে ব্যাপার তেমন কিছুই নয়, কিছুক্ষণ একসঙ্গে বসে গল্পসল্প আর পানাহার করে কাটাতে চাচ্ছি, এই আর কি।
উভয়ে হাসতে হাসতে এবার বললেন–‘ব্যাপারটা অবশ্যই খুবই আনন্দের আপত্তির কোনো কারণই থাকতে পারে না।’
‘তবে কথা এই, ক্যাপ্টেন স্মাির্টন আর আপনি ক্যাপ্টেন প্যান্ট–আপনারা আপনাদের সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা গল্পাকারে শোনাবেন, সবাই মিলে আনন্দ করে হুইস্ট খেলব আর গলা অবধি মদ–‘।
ক্যাপ্টেন প্যান্ট তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন–‘গলা অবধি যে মদ গিলতে চাচ্ছেন–কিন্তু আগামীকাল যে রবিবার সেটা কি খেয়াল আছে? অবশ্য আমারও এতক্ষণ খেয়াল ছিল না, স্বীকার করে নিচ্ছি।
আমার পরম পূজ্যাস্পদ খুল্লতাত ক্যাবলাকান্ত সঙ্গে সঙ্গে জিভ কেটে বললেন ‘আরে আপনাদের উভয়কে কাছে পেয়ে আমি আনন্দ-উচ্ছ্বাসে এতই অভিভূত হয়ে পড়েছি যে, আগামীকাল কি বার তা-ও আমার হুঁশ নেই!
ক্যাপ্টেন প্যান্ট, মুখের হাসিটুকু অব্যাহত রেখেই এবার বললেন–‘আপনার নিমন্ত্রণ আমরা মাথা পেতে নিচ্ছি। তবে আগামীকালের পরিবর্তে বরং অন্য কোনো দিন
কেট এতক্ষণ নীরবে সবকিছু শুনছিল। সে এবার মুখ না খুলে পারল না– আরে ধৎ! আপনারা কী সব যা-তা বকছেন, বুঝছি না তো!
ক্যাপ্টেন প্র্যান্ট নিতান্ত অপরাধীর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল–কেন? আবার কী হল?
