একমাত্র তাঁর এরকম অদ্ভুত চরিত্র, আর এরকম অভাবনীয় চারিত্রিক বৈচিত্র্যের জন্যই বাইরের লোকজন, পরিচিত মহলে সবাই তাকে একজন হাড়কিপ্টে বলেই জানে।
আরও আছে, সমাজের বহু ভালো মানুষের মতোই তিনি আরও একটা বিশেষ গুণের অধিকারী। সেটা হচ্ছে, মানুষকে আশা ভরসা দিয়ে হঠাৎ করে নিরাশ করার গুণের কথা বলতে চাইছি। সত্যি তাঁর এ মনোভাবটা বড়ই অদ্ভুত।
যে কোনো লোক, যে কোনো প্রশ্নই করুক না কেন, তিনি সরাসরি জবাব দিয়ে থাকেন–‘না’।
তবে এও সত্য যে, দু-একবার সামান্য অনুরোধ করলেই নিজের মতো পরিবর্তন করে ফেলেন। আর টাকার থলেটার দিকে কেউ লালসা-মাখানো দৃষ্টিতে তাকায়, হাত বাড়ায় তবে কঠোরভাবে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করেন। তবে এও সত্য যে, যদি গো ধরে বসে থাকলে টাকার অঙ্কটা মোটাই হয়ে যেত।
আর দান ধ্যানের বেলায়ও দেখা যায়, তাঁর মতো উদার হৃদয় ব্যক্তি সচরাচর হয় না। তবে এও খুবই সত্য যে, তবে তাকে অকৃপণভাবে কাউকে কিছু দান করতে দেখা যায়নি।
এ বুড়ো লোকটার সঙ্গে কাছাকাছি, পাশাপাশি আমি সারাটা জীবন অতিবাহিত করেছি। আমার বাবা-মা দুনিয়া ছেড়ে যাবার সময় এক বহুমূল্য উত্তরাধিকাররূপে আমাকে তাঁর জিম্মায় সঁপে দিয়ে গেছেন।
আর যা-ই হোক না কেন, আমি কিন্তু মনে প্রাণে বিশ্বাস করি নচ্ছাড় এ বুড়ো হাবড়াটা আমাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশিই ভালোবাসেন। তবে এও সত্য যে, তিনি আমাকে খুব ভালোবাসলেও কেটকে যতটা ভালোবাসেন ততটা অবশ্যই নয়। আর ভালোবাসলেও তার কবলে পড়ে আমি তো একটা পোষা কুকুরের মতোই জীবন ধারণ করছি।
সত্যি বলছি, প্রথম থেকে পঞ্চাশ বছর অবধি পাঁচ-পাঁচটা বছর তিনি প্রতিদিন আমাকে নিয়মিত বেতের আঘাতের শাসনে ধন্য করেছেন।
পাঁচ থেকে পনের বছর অবধি দীর্ঘ দশ-দশটা বছর তিনি প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় আমাকে শোধনাগারের ভয় দেখিয়ে জড়সড় করে রাখতেন।
তারপর পনেরো থেকে বিশ বছর পর্যন্ত পাঁচটা বছরের মধ্যে এমন একটা দিন যায়নি যেদিন আমাকে মাত্র পাঁচটা শিলিং হাতে গুঁজে দিয়ে তিনি বিদায় করে দেবার ভয় দেখাননি।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি রীতিমত একটা দুঃখি কুকুর। কিন্তু সেটাই তো আমার জীবনের একটা অংশে পরিণত হয়ে উঠেছিল। আমার বিশ্বাসের একটা অংশ ছিল।
অবশ্য কেট ছিল আমার বিশ্বাসী ও নির্ভরযোগ্য আর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। এ ব্যাপারে আমি শতকরা একশো ভাগই বিশ্বাসী ছিলাম।
সত্যি বলছি, মেয়ে হিসেবে কেট বড়ই ভালো। তার ভেতর বাহির সবটাই ভালো। সে আমাকে ভালোবাসে। আর সে ভালোবাসানিখাদ। সে আমাকে কথা দিয়েছে পাকা কথা–ভাঁওতা দিয়ে আমার ক্যাবলাকান্ত কাকাটির মন জয় করতে পারলে, তাকে বিয়েতে রাজি করাতে পারলেই সে আমাকে বিয়ে করবে।
কেট! বেচারি কেট! আমার মন ময়ুরী–আমার প্রিয়তমা কেট। তার বয়স পনেরো বছর। সামান্য অর্থকড়ি যা আছে তা দিয়ে কোনোরকমে দিন গুজরান হয়ে যায়।
আমার মতে পনেরো বছর বয়সে যা-কিছু আছে, একুশ বছরেও তার খুব একটা হেরফের হবে বলে আমি অন্তত মনে করি না।
কিন্তু হায়! এ কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল রে বাবা! হাড়গিলে বুড়োটার কাছে গিয়ে বহু বহু তোয়াজ, হা-পিত্যেশ কান্নাকাটি করেছি। কি কাকস্য পরিবেদন। ফলাফল লবডঙ্কা। বার বার হতাশ হয়েই ফিরে আসতে হয়েছে।
কী পাষণ্ড বুড়োট! তার বুকটা সত্যি পাথর দিয়ে তৈরি। দয়া-মায়ার লেশটুকুও নেই। নচ্ছাড়টা আমাদের মতো দুটো ইঁদুরছানাকে নিয়ে এমন নির্মম খেলায় মেতেছে যা দেখে কেবল রক্ত মাংসের মানুষই নয়, স্বয়ং জোভ-এরও ক্রোধে ফেঠে পড়ার কথা। শত তোয়াজ করেও হাড়গিলে বুড়োটার মন জয় করা যাচ্ছে না। এঁটুলির মতো। সর্বদা তার গায়ের সঙ্গে সেঁটে রয়েছি তবুও তার পাথর মন এতটুকুও নরম হচ্ছে না।
নচ্ছাড় বুড়োটা মনে-প্রাণে আমাদের বাসনা পূর্ণ করার মতো একটা অজুহাত দাঁড় করাতে পারলেই দুম্ করে দশ হাজার পাউন্ড খসাতে রাজি আছে।
কিন্তু হায়! আমরা এমনই আহাম্মক যে, বিয়ের ব্যাপারটা নিজেরাই ঠিক কেবল নয়, পাকা করে ফেলেছি। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমরা এতটা এগিয়ে যাওয়ায় বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, অর্থাৎ বিয়েটা তিনি কিছুতেই ঠেকাতে পারবেন না।
আমি তো তাঁর কিছু কিছু দুর্বলতার কথা আগেই বলে রেখেছি। সবকিছু খোলসা করে বললেও তাঁর একগুঁয়েমির কথা তেমন কিছু বলা হয়নি, মানে বলিনি।
আমি তার দুর্বলতার কথা বলেছি সত্য। দুর্বলতা বলতে আমি সে-কথাই বোঝাতে চেয়েছি যে, তিনি একরকম মেয়েলি কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। আর সে কুসংস্কারগুলো তিনি মনে প্রাণে মেনে চলেন।
আমার পরম পূজ্যাস্পদ খুল্লতাতর কুসংস্কারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হচ্ছে, স্বপ্ন আর অমঙ্গল প্রভৃতির ব্যাপারে তার বিশেষ বিশ্বাস।
কুসংস্কার ছাড়া আর যা-কিছু তিনি মেনে চলেন তাদের মধ্যে আর যেগুলোকে তিনি বেশি করে মেনে চলেন তা হচ্ছে, কথা রাখারাখির ব্যাপার আর ঠুনকো মান। সম্মানবোধ। পুরো ব্যাপারটাই তবে খোলসা করেই বলা যাক। ব্যাপারটা কি হল– অদৃষ্টকেই সবকিছুর জন্য দায়ী না করে পারা যাচ্ছে না।
আমার বাগদত্তা কেটের পরিচিত নৌ-বিভাগের দুটো লোক আছে। তারা এক বছর বিদেশে কাটিয়ে ইংল্যান্ডে উপস্থিত হয়।
