ফিক করে হেসে তিনি ছোট্ট করে বললেন–উচ্ছন্নে যাও তুমি।’ তারপর অপেক্ষাকৃত গলা চড়িয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ করলেন–‘অবশ্যই! অবশ্যই। ঠিকই বলেছ বাছা।
আর আমি এ ব্যাপারেও নিঃসন্দেহ যে, আপনি আমার সঙ্গে রসিকতা করছিলেন। শুনুন কাকা, সম্প্রতি কেট আর আমার একমাত্র ইচ্ছা–আপনার সুচিন্তিত সারগর্ভ পরামর্শ দান করে আমাদের ধন্য করুন। পরামর্শ বলতে আমি সময়টার কথা বলতে চাইছি। কাকা, আপনি অবশ্যই বুঝতে পারছেন আমি বলতে চাইছি, সংক্ষেপে ব্যাপারটা হল, আমাদের বিয়েটা কবে, কখন সম্পন্ন হলে আপনার পক্ষে সুবিধা হয়, বুঝতেই তো পারছেন, এ-কথাটা জানার জন্যই আমি এমন ধানাই-পানাই করছি।
‘ওরে হতচ্ছাড়া কোথাকার। তুই কি বলতে চাইছিস, আমার মাথায় আসছে না? তার চেয়ে বরং বল কখন সম্পন্ন হয়ে গেল? বল তো?
‘হ্যাঁ! হা! হো! হো! আ! কী ভালল! কী চমৎকার কথা! কী ভালো কাকাটি আমার! কী বুদ্ধিমানের ঢেকি! কী আমার পরম পূজনীয় কাকা, এখন আমার যা-কিছু জানতে ইচ্ছে করছে, মানে জানতে চাইছি।’
‘কি জানতে চাইছিস, খোলাসা করে বল তো?’ মানে কোন্ সময়ে
‘আমার একটা কথাই জানা দরকার, সঠিক সময়টা মানে কোন্ সময়ে আমাকে বলে দাও।
‘উফ! সঠিক সময়? সঠিক সময়টা জানার জন্য খুবই উতলা হয়ে পড়েছিস, তাই না?’
‘হ্যাঁ, কাকা, সঠিক সময়টা–তবে আপনার যদি এ-ব্যাপারে কোনো ওজর আপত্তি না থাকে।
মুহূর্তের জন্য কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ এঁকে বুড়োভামটা বললেন– একটা কথা–’
তাঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম-এর মধ্যে একটা কথার কি থাকতে পারে।
‘আরে পারে, থাকতে পারে বলেই তো–’
‘ঠিক আছে তোমার সে-একটা কথা বলতে কি বলতে চাইছ, খোলসা করেই বল?
‘কথাটা হচ্ছে, আমি যদি এ ব্যাপারটাকে অনেক দূর টেনে নিয়ে যাই, মানে অনেকটা পিছিয়ে দেই, তবে?
‘আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, অনেক পিছিয়ে দিতে চাইছেন?
‘হ্যাঁ। অনেকটা মানে–মনে কর এক বছর-দুবছর বা ওরকম কোনো একটা সময়ের কথা বলছি।
আমি চোখ দুটো কপালে তুলে সবিস্ময়ে বললাম–এক বছর-দু বছর বা তার চেয়েও বেশি?
‘হ্যাঁ! তবে কি কাজটা সঠিক হবে, বল তো?
‘ইয়ে মানে আপনি যদি তা-ই সঠিক জ্ঞান করেন।
‘ভালো কথা। ঠিক আছে ববি, সোনামণি আমার, বাছা আমার, কী ভালো ছেলেই তুমি! সচরাচর এমন ভালো ছেলে চোখেই পড়ে না। ঠিক বলিনি?’
‘কাকা–‘
আমাকে কথাটা বলতে না দিয়ে আমার পরম শ্রদ্ধাস্পদ কাকাই আবার বলতে লাগলেন–শোন বাছাধন আমার, সঠিক সময়টাই যখন আমার কাছে জানতে চাইছ। তখন আমি মাত্র এই একটাবারের জন্য তোমাকে ধন্য করব, বুঝলে কিছু?
‘আদরের কাকা আমার। লক্ষ্মী কাকা আমার।
আমার কণ্ঠস্বরটাকে চাপা দিয়ে, গলা ছেড়ে বুড়োভাম আমার পূজ্যাস্পদ কাকা এবার বলে উঠলেন–‘চুপ কর বাপধন! চুপ কর! আমি এই একবার মাত্র এই একবার তোমাকে ধন্য করব।’
‘আমার লক্ষ্মী কাকা! সোনামণি কাকা আমার!
‘যা বলছি, মন দিয়ে শোন, তোমাকে আমি সম্মতি দেব। আমার ভোজটা–জেনে রাখ, ভোজের কথাটা ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না। ব্যাপারটা আমি ভেবে দেখছি, কি করা যায়।
‘উফ! আবারও ভাববেন!
‘হ্যাঁ, ভাবতে তো হবেই বাছাধন। ব্যাপারটা তো কম জটিল নয়। ভাবনাচিন্তা তো অবশ্যই করা দরকার। আমি কণ্ঠস্বরে কিছুটা উন্মা প্রকাশ করে বললাম–‘বেশ আপনি ভাবুন, সারাটা জীবন ধরে আপনি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবুন।
‘তুই এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন বাপধন।
‘এটা উত্তেজিত হবার মতো কথা নয়, আপনি বলতে চাইছেন?
‘যাক গে, মাথা ঠাণ্ডা করে শোন, আমি কি বলতে চাইছি। যাক এবার বল তো বিয়েটা কবে হতে পারে?
‘আমিই যদি তা ঠিক করব তবে আর আপনাকে মিছে বিরক্ত করতে যাব কেন, বলতে পার? আজ তো রবিবার ঠিক কি না?
‘হ্যাঁ, আজ রবিবারই বটে।
‘তবে কবে তোর বিয়েটা সেরে দেওয়া যেতে পারে–ঠিক কবে সারা যেতে পারে! বাপধন, আমার কথাগুলো তোর কানে ঢুকছে তো? আমার দিকেনিস্তেজ চোখের মণি দুটো মেলে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে নিয়ে তিনিই আবার বলতে আরম্ভ করলেন– কি হে, অমন বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে আছিস যে বড়! আমি বলছি–কথা দিচ্ছি, কেটকে তুই নিজের করে পাবি।
‘পাব? আপনি বলছেন, কেটকে আমি পাব।’
‘পাবি। অবশ্যই পাবি বাপধন। শুধু পাবিই না, সে সঙ্গে পেটপুরে ভোজও খাবি।
‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু সেটা কবে?
‘কবে? যখন একই সপ্তাহে তিনটি রবিবার পড়বে।
‘একই সপ্তাহে তিন-তিনটি রবিবার!
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। তার আগে অবশ্যই নয়। হতচ্ছাড়া নচ্ছাড় পাজি কোথাকার–তার আগে অবশ্যই নয়, জেনে রাখ । মাথা খুটে মরলেও তার আগে হবার নয়। হতচ্ছাড়া চরিত্রহীন–জেনে রাখ, তার আগে কিছুতেই নয়।
‘হুম! ‘বাপধন, তুই তো আমাকে ভালোই জানিস–এক কথার মানুষ আমি।’
‘হুম!
‘আমার কথা তো সাফ সাফই তোকে বললাম। এবার আমার সামনে থেকে কেটে পড়।
কথাটা বলেই বুড়ো হাবড়াটা হাতের বোতলের ছিপিটা খুলে ঢক ঢক্ করে মদ গিলতে লাগলেন।
আমি রাগে গ গস্ করতে করতে হতাশায় জর্জরিত মন নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম। আর আমার পরম পুজ্যাস্পদ কাকা মদের বোতলটা নিয়েই মেতে রইলেন।
আমার কাকা ক্যাবলাকান্ত একজন সভ্য-ভব্য রুচিবান বৃদ্ধ ইংরেজ। আর যথার্থই একজন ভদ্রলোক বলে তার খ্যাতি রয়েছে। তবে এ নামের গানের লোকটার সঙ্গে তার বৈসাদৃশ কিছু না কিছু অবশ্যই রয়েছে। ব্যাপারটা হচ্ছে, তার কয়েকটা দুর্বল দিক অবশ্যই রয়েছে। সে হচ্ছে, একজন বেঁটেখাটো, ইয়া বড় টাকওয়ালা, রসিক আর প্রেমের পূজারি আর দেহটা প্রায় অর্ধগোলাকৃতি । তিনি এমন একজন পুরুষ যার নাকটা টকটকে লাল, লম্বা একটা টাকার থলে সব সময় তার সঙ্গে সঙ্গে থাকে আর নিজের মান সম্মান সম্বন্ধে যারপর নাই সচেতন। কোনো পরিস্থিতিতেই মর্যাদা নষ্ট করতে সে রাজি নয়।
