এবার আমেরিকার এক বড় শহরের ছোট্ট একটা তঞ্চকতার কাহিনী পাঠক পাঠিকাদের সামনে তুলে ধরছি।
একবার সে শহরে এলেন এক ভদ্রলোক। মানে সবাই তাকে বিশিষ্ট ভদ্রলোক বলেই জানে। তার চেহারা ছবি যেমন দেখাক, আবার পোশাক আশাকও খুবই রুচিসম্মত ব্যবহার করেন। যাকে বলে সর্বদা একজন ভদ্ৰশিষ্ট ব্যক্তির মতো সেজেগুজে থাকেন। কথাবার্তাও রীতিমত রুচিশীল ব্যক্তির মতো। আচার আচরণ আর কথা বলার ধরন-ধারণ মহাশয় ব্যক্তির মতোই লক্ষণীয়। এক কথায় এমন মার্জিত স্বভাবের মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। প্রথম আলাপের মুহূর্তেই তিনি সবার মন ও নজর কেড়ে নেবার ক্ষমতা রাখেন।
ভদ্রলোক শহরে এসেই সোজা সম্ভ্রান্ত পল্লিতে চলে গেলেন। সেখানে খুঁজেপেতে সুদৃশ্য একটা বাড়ি ভাড়া করে ফেললেন।
আগন্তুক ভদ্রলোক বাড়িউলির সঙ্গে কথা বলে ভাড়া ঠিক করে ফেললেন। আর তাকে এ কথাও পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, প্রতি মাসের প্রথম দিনই সকাল দশটার মধ্যেই যেন এসে ভাড়া বুঝে নিয়ে রসিদ দিয়ে যায়। এমন একজন উদারচেতা নিষ্ঠাবান ভাড়াটে পেলে এমন কোন বাড়িউলি আছে যে খুশিতে ডগমগ হবে না?
ব্যস, আর কোনো সমস্যাই রইল না। বাড়িউলি এক মাসের অগ্রিম ভাড়া বুঝে পেয়ে, ভাড়াটের হাতে খুশিমনে বাড়ির চাবি তুলে দিলেন।
বাড়িউলি প্রথম মাস শেষ হতেই ভাড়াটে ভদ্রলোকের কথার দাম যে যথেষ্টই আছে তার প্রমাণ পেয়ে গেলেন। কারণ মাসের পয়লা তারিখে বেলা দশটার মধ্যেই ভাড়ার টাকা হাতে পেয়ে গেল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভাড়াটের প্রতি তার আস্থা আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল।
এবার ভদ্রলোক শহরের এক নামি খবরের কাগজে অগ্রিম টাকা মিটিয়ে দিয়ে জবরদস্ত একটা বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনটার মূল বক্তব্য এরকম–তিন-চারজন কেরানি নিয়োগ করা হবে। কর্মপ্রার্থীদের অবশ্যই শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভুত এবং মার্জিত স্বভাবের হতে হবে। কারণ অগাধ অর্থ তাদের জিম্মায় থাকবে, হাতাতে হবে। তাই চাকরিতে নিযুক্ত হবার আগে নির্বাচিত প্রার্থীদের কেরাণিদের মাত্র দেড় হাজার টাকা জমা রাখতে হবে।
সব শেষে কোম্পানির নাম ছাপা হয়েছে–বগ, হগস, লগস্, ফ্রগ অ্যান্ড কোম্পানি। ১১০, ডগ স্ট্রিট।
বিজ্ঞপনের পাতায় প্রতিষ্ঠানটার এমন একটা বাহারি নাম দেখে সবাই তো রীতিমত ভিরমি খাওয়ার যোগাড় হলো। কারো মনে এতটুকু সন্দেহ জাগল না জাগার কথাও নয়। খালি পাত্রের আওয়াজ বেশি এ-কথা কারো অজানা না থাকলেও কেউ তিলমাত্র বিপরীত ধারণাও করতে পারল না।
এক মাসের মধ্যেই প্রায় পঞ্চাশজন কর্মপ্রার্থী ভদ্রলোকের বাড়ির দরজায় এসে হাজির হলো। প্রত্যেকেই চাকরিটা পাওয়ার জন্য তার কাছে বহুভাবে কাকুতি মিনতি জানাতে লাগল।
ভদ্রলোক কিন্তু প্রথম দিন কাউকেই চাকরিতে বহাল করার আগ্রহ দেখালেন না।
পরবর্তীকালে অর্থাৎ মাসের শেষ দিন বারে বারে পঞ্চাশ জনকেই চাকরিতে বহাল করলেন। আর প্রত্যেকের কাছ থেকে দেড় হাজার করে নগদ টাকা বুঝে নিয়ে রসিদও দিয়ে দিলেন প্রত্যেককে।
মাসের এক তারিখ সকাল দশটায় এক এক করে পঞ্চাশজনই কোম্পানির দরজায় হাজির হলো চাকরিতে যোগদান করার বাসনা নিয়ে। কিন্তু হায়! কোথায় অফিস! কোথায়ই বা কোম্পানি মালিকই বা কোথায় গেলেন? পাখি খাঁচা ভেঙে পালিয়েছে।
এদিকে বাড়িউলি সকাল দশটায় রসিদ নিয়ে হাজির হতে পারল না। ফলে তার পক্ষে ভাড়া বুঝে পেয়ে রসিদটা তার হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হলো না। কিন্তু যদি এক মিনিট আগে, ঠিক কাঁটায় কাঁটায় দশটায় রসিদ নিয়ে হাজির হতো তবে কি সত্যনিষ্ঠ মার্জিত স্বভাবের নৈপুণ্যের সঙ্গে কোম্পানি পরিচালনাক্ষম ভদ্ৰবেশি তঞ্চকের দেখা পেত, নাকি ভাড়ার টাকা হাতে পেত?
থ্রী সানডেস ইন এ উইক
তোমার মনটা পাথরের মতো কঠিন।
তোমার মাথায় ঘিলু বলতে রতিও নেই। তুমি একটানিরেট বোকা, হদ্দ বোকা। তুমি একটা গোয়াড়গোবিন্দ, বদমেজাজি, বস্তাপচা তোমার বুদ্ধি বিবেচনা আর সেকেলে একটা বুড়ো হাবড়া! আমার পরম পুজ্যাস্পদ খুল্লতাত ক্যাবলাকান্তর সামনে ঘুষি বাগিয়ে কল্পনার মাধ্যমে আমি এ-কথাগুলো উচ্চারণ করলাম।
হ্যাঁ, কল্পনা। কল্পনার মাধ্যমেই আমি কথাগুলো বললাম।
আসল ব্যাপারটা হল, আমি যা-কিছু করতাম আর যা-কিছু করতে ইচ্ছা হত উভয়ের মধ্যে সামান্য হেরফের তো থাকতই থাকত।
আমি বৈঠকখানার দরজা খুলেই দেখতে পেলাম, চুল্লির তাকটার ওপরে পা দুটো তুলে দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বুড়ো হাবড়াটা বসে রয়েছে। আর তার হাতে মদ-ভর্তি একটা বোতল।
আমি দরজাটা খুলে গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। আস্তে আস্তে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললাম-পূজনীয় কাকা, তুমি এত বেশি মাত্রায় হৃদয়বান, দয়ার অবতার, সুবিচেক।
তিনি প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলেন–‘হ্যাঁ, বুঝলাম বাছা, তোমার যা বক্তব্য আছে বল।’
আমি আবার মুখ খুললাম–‘কাকা, আমি নিঃসন্দেহ যে, আমার পূজনীয় কাকা, কেটের সঙ্গে আমার মিলনের ব্যাপারে বাধা দেবার মতো কোনোরকম ইচ্ছা তোমার নেই। তুমি যা-কিছু বলছ তা নিছকই একটা রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। আম নিশ্চিত। আমি জানি, আমি এটা খুব ভালোই জানি। সত্যি বলছি, মাঝে মধ্যে তুমি কী সুন্দর মানুষই না হয়ে ওঠ।
