বড় বড় শহরে সারাদিনে বহুবার খবরের কাগজ বের হয়, অর্থাৎ ঘণ্টাখানেক পরপর। তঞ্চক মহাপ্রভু তার নকল বিজ্ঞাপনটা বের করেছিল আসল বিজ্ঞাপনটা সে খবরের কাগজে, যে সময়ে বেরিয়েছে তার কিছু সময় পর যে খবরের কাগজে বেরোবে তার পাতায়।
যথাসময়ে নকল বিজ্ঞাপনটা বুকে নিয়ে নির্দিষ্ট খবরের কাগজটা বেরল। এদিকে তঞ্চক বাবাজী নকল ঠিকানার সদর দরজার কাছাকাছি একটা গোপন জায়গায় শিকারি বিড়ালের মতো ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল, শিকার ধরার প্রত্যাশা নিয়ে।
একটু পরেই একজনকে ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে নির্দিষ্ট বাড়িটার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখেই তঞ্চক ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
প্রাপকের হাত থেকে টাকার ব্যাগটা নিয়ে তঞ্চক প্রথম বিজ্ঞাপনে দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মিলিয়ে নিল। সে সন্তুষ্ট হয়ে টাকার ব্যাগটা নিয়ে তার হাতে পুরস্কার গুঁজে দিল।
ব্যস, টাকার ব্যাগটা পাওয়ামাত্র তঞ্চক আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে চোখের পলকে সেখান থেকে চম্পট দিল।
এদিকে বহু বিজ্ঞাপন যখন একই দিনে বহু কাগজে ছাপা হয়ে বের হয়, তখন প্রাপক বড় বিজ্ঞাপনের কথার ফুলঝুরি কথা ভুলে যায়। ঘুলিয়ে ফেলে। ছোট বিজ্ঞাপনের ঠিকানা অনুযায়ী চলে যায় বলেই তঞ্চককের ভাগ্য খুলে যায়। ফলে সহজেই তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়।
ঠিক একই রকম আর একটা তঞ্চকতার নমুনা তুলে ধরছি–এক ভদ্রমহিলা বহুমুল্য হীরার আংটি হারিয়েছেন। আংটিটা যেমন দেখতে চমৎকার দামও তেমনি আকাশ ছোঁয়া।
বহু খোঁজাখুঁজি করে হতাশ হয়ে ভদ্রমহিলা শেষপর্যন্ত খবরের কাগজের শরণাপন্ন হলেন। কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনে আংটিটার যথাযথ বিবরণ দেওয়া হলো।
যথাসময়ে আংটিটার বিবরণ এবং পুরস্কারের কথাসহ খবরের কাগজ বেরল। ভদ্রমহিলা বিজ্ঞাপনে এও উল্লেখ করলেন, হিরার আংটির প্রাপককে কোনোরকম জেরা না করেই পুরস্কারস্বরূপ মোটা টাকা দেওয়া হবে। আর সে সঙ্গে আংটির মালিক ভদ্রমহিলার পুরো ঠিকানা তো দিলেনই।
বিজ্ঞাপনটা প্রকাশিত হবার কয়েকদিন পরে বিজ্ঞাপনের বর্ণনা অনুযায়ী ভদ্রমহিলার বাড়িতে একজন হাজির হলো। লোকটা এমনই সময়ে আংটিটা নিয়ে এলো যখন আংটির মালিক ভদ্রমহিলা বাড়িতে নেই। জরুরি দরকারে কোথায় যেন গেছেন। বাড়ির পরিচারক দরজা খুলে আগন্তুকের প্রয়োজনের কথা জানতে চাইল।
আগন্তুক খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের কথা পাড়ল। পরািরক আংটিটা দেখতে চাইল।
আগন্তুক কোটের পকেট থেকে আংটিটা বের করে পরিচারকের সামনে ধরল।
সেটাকে দেখামাত্রই পরিচারক চিনতে বলল। খবরটা প্রকাশ হতেই ভদ্রমহিলার ভাই এবং অন্য কয়েকজন ছুটে এলেন। সবাই আংটিটা চিনতে পেরে একবাক্যে বলল–হ্যাঁ, এটাই হারিয়ে যাওয়া আংটি।
কিন্তু আংটির মালিক ভদ্রমহিলা বাড়িতে নেই শুনেই আগন্তুকের মুখ শুকিয়ে গেল। মনে মনে বিরক্তও হলো খুবই। পরিশ্রম ও সময় নষ্ট করে এতটা পথ আসার পর বাঞ্ছিত ব্যক্তি বাড়ি নেই শুনলে যে কোনো লোকই বিরক্ত হবার কথা। সে বিষণ্ণ মনে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিল।
এমন সময় বাড়ির সবাই তাকে অনুরোধ করে বসতে বলল। তারপর পুরস্কারের টাকা মিটিয়ে দিয়ে তার কাছ থেকে আংটিটা নিল।
প্রাপ্য পুরস্কার বুঝে পেয়ে আগন্তুক খুশি মনে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো। একটু পরেই আংটির মালিক ভদ্রমহিলা বাড়ি ফিরলেন।
ব্যস, আর যাবে কোথায়, আংটিটা দেখেই ভদ্রমহিলার তো মাথায় রক্ত ওঠার যোগাড়। কেবল তারই নয় বাড়িসুদ্ধ লোকের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। আরে ব্যস, এ যে রীতিমত দিনে ডাকাতি! লোকটা এতগুলো লোককে মুহূর্তের মধ্যে ঘোল খাইয়ে দিয়ে চলে গেল!
অনুশোচনা হবার মতো কথাই তো বটে। কারণ, আংটিটা যে নকল। একটা নকল আংটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে লোকটা এতগুলো টাকা নিয়ে চলে গেল। এ কী কেলেঙ্কারি ব্যাপার।
এবার খবরের কাগজটা এনে বিজ্ঞাপনটা বের করা হলো। হ্যাঁ, আংটিটা অবিকল বিজ্ঞাপনের বিবরণ অনুযায়ী তৈরি বটে। কোথাও এতটুকু অমিল নেই। অতএব খুঁত ধরার সাধ্য কার? একমাত্র মালিক, যার হাতে সর্বক্ষণ সেটা থাকে, চোখে দেখে সে ছাড়া কারো পক্ষে তফাতটুকু ধরতে পারা তো সম্ভবও নয়। তাই তো তক্কে তক্কে থেকে, মালিকের অনুপস্থিতিতেই তঞ্চক মহাপ্রভু বাড়িতে হাজির হয়েছিল।
তঞ্চকতার শেষ? না, শেষ নেই। তঞ্চকতার কথা বলতে বসলেও শেষ করা যাবে না। একের পর এক ঘটনা স্মৃতির পটে ভেসে উঠবে। পাতার পর পাতা ভরবে। রাত কেটে যাবে, তবুও মনে হবে কাহিনী কতই না বাকি রয়ে গেছে। রাত ভর বললেও বুঝি তঞ্চকতার অর্ধেকও বলা হয়ে ওঠেনি।
যাক গে, শেষ যখন করাই যাবে না তবে এ-মুহূর্তে একটা পথই বেছে নেওয়া যেতে পারে সভ্যতার মোড়কে মোড়া একটা খুবই সুসভ্য সুপরিকল্পিত তঞ্চতার কাহিনী দিয়ে এ-নিবন্ধের যবনিকাপাত টানছি।
আর কেবলমাত্র সম্প্রতিকালেই না। এর পরবর্তীকালেও একের পর এক তঞ্চতার ঘটনা পৃথিবীর বুকে, পৃথিবীর প্রতিটা আনাচে কানাচে প্রতিদিন ঘটে চলেছে। আর পৃথিবীর বড় বড় শহরের বুকে তো তঞ্চকদের কারবার খুবই রমরমা। তবু আজ অবধি আমরা কেউ এ-ব্যাপারটা নিয়ে তেমন করে মাথা ঘামাইনি।
