তাকে সদর দরজায় পৌঁছে দিয়ে সে বিদায় নিতে গেল।
মহিলাটি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন–আপনি যে কষ্ট করে আমাকে পৌঁছে দেবার জন্য এতটা পথ এলেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
তঞ্চক লোকটা ফিরে যাবার জন্য পিছন ফিরতেই মহিলাটি বি বিনয়ে বললেন–ভাই, আপনি যখন কষ্ট করে আমার জন্য এতই করলেন, দয়া করে ভেতরে আসুন।
তঞ্চক দরজায় দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করতে লাগল।
মহিলাটি আগের মতোই কাকতি-মিনতি জানাতে গিয়ে বললেন–দয়া করে একবারটি ভেতরে আসুন। বাড়িতে আমার বাবা আর ভাইরা রয়েছেন, আলাপ করে যাবেন না?
তঞ্চক এবার কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–কিন্তু মহাশয়া, আমার পক্ষে যে দেরি করা সম্ভব নয়–দুঃখিত।
মহিলাটি অধিকতর মোলায়েম স্বরে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বললেন–কিন্তু–কিন্তু আপনি এতটা করলেন
দেখুন, আপনি যদি আমার কাছে সত্যি কৃতজ্ঞ–
এ কী বলছেন ভাই! কৃতজ্ঞতার কথা মুখে না বললেও–
ভালো কথা, তঞ্চকতার নিদর্শনস্বরূপ আপনি আমার একটা উপকার করতে পারেন।
উপকার?
হ্যা! দশটা টাকা ধারস্বরূপ দিতে পারেন?
এ তো সামান্য ব্যাপার মশায়! দশটা তো মাত্র টাকা; এর জন্য এমন অনুনয় বিনয়–কথা বলতে বলতে মহিলাটি তার বান্ডিলটা খুলে একটা নোট বের করে তার হাতে গুঁজে দিলেন।
তঞ্চক হাত বাড়িয়ে প্রায় ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে নিল। এ-তঞ্চতার ক্ষেত্রে একটা মাত্র ফাঁক থেকে গেছে, খুঁতও বলা চলে। নোটটার অর্ধেক, অর্থাৎ পাঁচ টাকা বিনা প্রতিবাদে তার অংশীদারের হাতে তুলে দিতে হয়। অংশীদার বলতে যে লোকটাকে মুখ বুজে বেধড়ক পিটুনি খেতে হয়েছে।
এবার খুবই ছোট্ট হলেও অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক তঞ্চকতার একটা নমুনা পেশ করছি–দশাসই চেহারাধারী এক ব্যক্তি এক রেস্তোরাঁয় হাজির হলেন পানাহার করতে। গায়ে বহুমূল্য জমাকালো পোশাক।
টেবিলে বসেই ভদ্রলোক দামি চুরুট অর্ডার দিলেন। এক পরিবেশক সঙ্গে সঙ্গে তার বাঞ্ছিত চুরুট টেবিলে পৌঁছে দিল। ভদ্রলোক চুরুটটাকে হাতে তুলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। তারপর চোখে-মুখে বিতৃষ্ণার ছাপ এঁকে সেটাকে পরিবেশককে ফেরৎ দিলেন।
পরিবেশক পরবর্তী অর্ডারের জন্য টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
খদ্দের ভদ্রলোক এবার বললেন–ঠাণ্ডা পানি আর ব্র্যান্ডি নিয়ে এসো।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশক তাঁর বাঞ্ছিত বস্তু দুটো নিয়ে আবার টেবিলে ফিরে এলো। খদ্দের ভদ্রলোক পরম তৃপ্তিতে বস্তু দুটোই নিঃশেষে উদরস্থ করলেন।
হাত থেকে ব্র্যান্ডির খালি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
চেয়ারটাকে পিছনের দিকে ঠেলে দিয়ে তিনি রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়ালে পরিবেশক বলল–স্যার, আপনি চলে যাচ্ছেন নাকি?
হ্যাঁ। আর মিছে এখানে বসে সময় নষ্ট করতে যাব কেন?
ঠাণ্ডা পানি আর ব্যান্ডির দামটা মেটাতে হয়তো আপনি ভুলে গেছেন।
ভ্রু কুঁচকে খদ্দের ভদ্রলোক বলে উঠলেন–ভুলে গেছি? ভুলে গেছি মানে?
আমতা আমতা করে পরিবেশক এবার বলল–স্যার, ওই যে ঠাণ্ডা পানি আর ব্রান্ডি পান করলেন।
ব্যস, আর যাবে কোথায়! খদ্দের ভদ্রলোক বাজখাই গলায় বলে উঠলেন–সে কী হে! ঠাণ্ডা পানি আর ব্রান্ডির দাম-স্বরূপ তোমাকে তো আগেই চুরুট দিয়ে রেখেছি–দিইনি বলতে চাও?
পরিশেক তো একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। সে এর কী জবাব দেবে ভেবে না পেয়ে অথর্বের মতো নীরবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
খদ্দের ভদ্রলোক ধরতে গেলে তার ওপর মারমুখি হয়ে আগের মতো তড়পাতে লাগল–চালাকি করার জায়গা পাওনি! টেবিলের ওপর পড়ে থাকা চুরুটটার দিকে আঙুলনির্দেশ করে তিনি এবার বললেন–তোমার সামনেই তো চুরুটটা পড়ে রয়েছে, দেখতে পাচ্ছ না?
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু চুরুটের দাম তো আপনি শোধ করেননি।
যা আমি মুখেও তুলিনি তার জন্য দাম দিতে যাব? এমন আহাম্মক আমাকে পেয়েছ! বাজে ধান্ধা ছাড়, আমাকে যেতে দাও।
কিন্তু, কিন্তু–
এর মধ্যে কোনো কিন্তু টিন্তু নেই।
খদ্দের ভদ্রলোক রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দেবার পূর্ব মুহূর্তে উপস্থিত অন্যসব খদ্দেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন–শোন হে, মদের নেশা ধরিয়ে দিয়ে খদ্দেরের সঙ্গে ঠকবাজি করার ধান্দা ছাড় বাছাধন! কথাটা বলেই সে লম্বা-লম্বা পায়ে রেস্তোরাঁ ছেড়ে পথে নেমে গেল। আর এদিকে পরিবেশক বেচারা নিতান্ত অপরাধীর মতো তাঁর ফেলে যাওয়া পথের দিকে নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
খুবই সাধারণ প্রকৃতির তঞ্চকতার একটা উদাহরণ এবার বলছি শুনুন–এক ভদ্রলোকের টাকার ব্যাগ খোয়া গেছে। খোয়া গেছে ঠিক বলা যাচ্ছে না, হারিয়ে ফেলতেও পারেন।
তিনি টাকার ব্যাগটা ফিরে পাবার আশায় খবরের কাগজে জিজ্ঞাপন দিলেন যে টাকার ব্যাগটা ফিরিয়ে দেবেন তাকে নগদ এত হাজার টাকা পুরস্কারস্বরূপ দেওয়া হবে।
খবরের কাগজের পাতার বিজ্ঞাপনটা এক তঞ্চকের চোখে পড়ল। তৎক্ষণাৎ সেটাকে নিজের পকেট বইয়ে টুকে নিল।
আসল বিজ্ঞাপনে কথার ফুলঝুরি ছিল, কিন্তু নকল কপিতে তা টোকা হলো না, বাদ দিয়ে জরুরি কথাগুলোই সে কেবলমাত্র টুকে নিল। এমনকি ঠিকানাটাও একটু আধটু রদবদল হয়ে গেল। প্রকৃত মালিকের পল্লিরই প্রতিবেশী অমুকের ঠিকানায় হারানো টাকার থলেটা ফেরৎ দিলেই প্রাপ্য পুরস্কার মিলে যাবে।
