সত্যিকথা বলতে কি, তঞ্চকতাই মানুষের ভাগ্য। কবি তো বলেছেনই হা পিত্যেশ করবার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
আমি কিন্তু বলব, তঞ্চকতা করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জীবনের লক্ষ্যই তো তঞ্চকতা–জীবনে শেষ।
তাই তো কেউ তঞ্চকতা করেছে শুনলেই আমারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠি ব্যস, সব খতম হয়ে গেল! অর্থাৎ সব শেষ!
এবার বলা যেতে পারে তঞ্চকতা আসলে একটা যৌগিক পদার্থ। বহু উপাদানের সমন্বয়ে এটি গঠিত। সামান্য ব্যাপারে অসামান্যতা, স্বার্থপরতা, মৌলিকতা, ধৃষ্টতা প্রদর্শন, আঠার মতো লেগে থাকা, বেপরোয়া হওয়া, উদ্ধত প্রকৃতি হওয়া, দাঁতাল হাসি মুখে অক্ষুণ্ণ রাখা, উদ্ভাবনী শক্তি ধারণা করা প্রভৃতিই হচ্ছে তঞ্চকতার উপাদান।
এবার তঞ্চকতার উপাদানগুলো সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করা যাক।
গোড়াতেই সামান্য ব্যাপারে অসামান্যতা সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক-তঞ্চক সামান্য ব্যাপার থেকে অসামান্য কিছুর সন্ধান পেতে পারে। তার চোখের দৃষ্টি খুবই তীক্ষ্ণ। সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়কেও সে দেখতে পায়, উপলব্ধি করতে সক্ষম। তার কারবার ছোটখাট ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে। সে খুচরা ব্যাপারী। নগদ অর্থ বা মূল্যবান কোনো কাগজ চোখে পড়ামাত্র তার ছোঁকছোঁকানি শুরু হয়ে যায়। যে কোনো উপায়ে সেটাকে হাফিস করে না দেওয়া অবধি সে স্বস্তি পায় না। এই একই লোক যখন কোনো আড়ম্বর ও জৌলুসপূর্ণ ব্যাপারের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তখন সে নিজের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে, মহাজনে পরিণত হয়। এতেও কিন্তু তঞ্চকতা পুরোদস্তুর কাজ করে। আর ছোটখাটো আকারে নয় কিন্তু ব্যাপক ও বিশালরূপেই।
মহাজন আর তঞ্চকের মধ্যে পার্থক্য কিছু-না-কিছু তো আছেই। কিন্তু কতটুকু সে পার্থক্য? ম্যামথ হাতির সঙ্গে ইঁদুরের পার্থক্যের মতোই। আবার ধূমকেতুর ল্যাজের সঙ্গে শুয়োরের পার্থক্যের সমানও বলা চলতে পারে।
এবার স্বার্থতার কথা বলছি, শুনুন–তঞ্চক প্রধানত স্বার্থের দ্বারাই পরিচালিত হয়। কোন ও কেমন স্বার্থ? অবশ্যই সম্পূর্ণরূপে নিজের স্বার্থ। আর পকেট পূর্ণ করাই তার একমাত্র লক্ষ্য। আর সে পকেট একান্তই নিজের। আর আপনারও বটে। প্রথম পকেটটা তার নিজের আর দ্বিতীয় পকেটটা অবশ্যই আপনার। তার সর্বদা লক্ষ্য থাকে প্রথম পকেটের দিকে।
এবার মৌলিকতার প্রসঙ্গে কিছু বলা যাক-প্রত্যেক তঞ্চকই ভয়ানক রকমের মৌলিক চিন্তাধারার অধিকারী হয়। সে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জালের ফাঁদ বিছিয়ে দেয়। ষড়যন্ত্র কী বস্তু–কীভাবে চক্রান্তর জাল বুনতে হয় তা সে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা শক্তি দিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে তৈরি করে নেয়। এ-বুদ্ধির জন্য অন্যের প্রত্যাশী তাকে হতে হয় না। আর তা যদি হয় তবে তা সব কাজ ভেস্তে যাবে। সে সর্বদা নিত্য-নতুন মতলব আঁটে। প্রয়োজনে নিষ্ফল মতলব বাতিল করে দিয়ে আবার নতুন মতলব ভাজার জন্য তৎপর হয়। নতুন মতলবকে কাজে লাগিয়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধি করে। গ্রীক দিঘীজয়ী বীর আলেকজান্ডার হওয়ার হিম্মৎ তার যদি নাও থাকে তবে সে গ্রীক দার্শনিক ডায়োজিনিস তো হতে পারত। সে যদি তঞ্চকে পরিণত না হতো তবে ইঁদুর ধরা ফাঁদ নইলে বঁড়শি আর ছিপ হতে পারত। কিন্তু তঞ্চকতার মৌলিক চিন্তাধারা যে তার মধ্যে গিজ গিজ করছে। তঞ্চকতার প্রতি প্রবণতা তার মধ্যে জাগতে বাধ্য।
আঠার মতো লেগে থাকার ব্যাপারটা এবার বলছি শুনুন ইচ্ছাশক্তি আর আগ্রহ প্রবল না থাকলে তঞ্চকতায় সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। যার সঙ্গে সে তঞ্চকতা করতে আগ্রহি তার পিছনে প্রবল ইচ্ছাশক্তি সম্বল করে দিনের পর দিন লেগে থাকার মানসিকতা ও ধৈর্য তাকে প্রতিনিয়ত প্রেরণা যোগাবে। আর তারই ফলে সেনিজেকে কর্তব্য সম্পাদনে লিপ্ত রাখবে।
এবার ধৃষ্টতা প্রদর্শন সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ আভাস দিচ্ছি, শুনুন–অসীম ধৃষ্টতা ছাড়া তঞ্চকতায় পরিপূর্ণ সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। সে ভয়ঙ্কর রকমের দুঃসাহসী না হলে সাফল্য লাভ তো দূরের ব্যাপার তঞ্চকতা করার ব্যাপারে এক পা-ও অগ্রসর হতে পারবে না। তাকে এমনই বুকের পাটা রাখতে হবে যাতে আফ্রিকার গভীর বনেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। যুদ্ধ জয়লাভ করতে হলে তাকে একটা বীজমন্ত্রই জপ করতে হবে–আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ার দুঃসাহস যাতে তার মধ্যে সর্বদা বিরাজ করে।
তরবারি দেবার আঁচড় লাগার ভয়-ডরের লেশমাত্রও তার মধ্যে থাকবে না। আর তা যদি থাকে তবে গোড়াতেই তাকে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। আর এ-কাজে দুঃসাহসের তুলনায় বিচক্ষণতার প্রয়োজনও কম নয়। সাহস আর বিচক্ষণতাই তঞ্চককে সাফল্য দান করে গলায় জয়মাল্য পরিয়ে দিতে সক্ষম।
ইংরেজ ঘোড়সওয়ার ডাকাত ডিক টারপিনের কথা আশা করি অবশ্যই জানা আছে? সে যদি আর একটু বেশিমাত্রায় বিচক্ষণ হতো তবে পয়লা নম্বরের তঞ্চক সে হতে পারত এতে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই।
আর আইরিশ জাতীয় নেতা দা নিয়েল ওকোনেল? তোষামুদে বলে তার যথেষ্ট অখ্যাতি রয়েছে। চাটুকার-শক্তিতে তার মতো পারদর্শী সচরাচর দ্বিতীয় আর একজন চোখে পড়ে না। কিন্তু তিনি যদি তোষামোদ করার সময় জায়গামতো লাগাম টেনেনিজেকে সংযত রাখতে পারতেন, অর্থাৎ একটু কম তোষামুদে হতেন তবে তঞ্চকতায় অভাবনীয় সাফল্য লাভ করতে পারত।
