তারা বেলুনটাকে ঘিড়ে দাঁড়িয়ে অতুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বেলুনটাকে দেখতে লাগল। তারা যত দেখছে ততই যেন বেলুনটার প্রতি কৌতূহল চড়চড় করে বেড়ে যেতে লাগল।
কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল বেলুনটার কার্যকরী ক্ষমতার কথা দ্বীপবাসীদের বোঝাতে গিয়ে। ব্যাপারটা হচ্ছে, আটলান্টিক মহাসাগরে বেলুনটায় চেপে পাড়ি দেবার মতো এত বড় অভিযানের কথা, বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যাপার-স্যাপার তাদের বোঝাতে গিয়ে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হলো, আর মাথার ঘাম পায়ে নামার যোগাড় হলো।
আমাদের বেলুনের নোঙরটা সমুদ্রসৈকতের শক্ত বালি স্পর্শ করেছিল ঠিক দুইটায়।
হিসাব করে দেখা গেল নোঙর তুলে বেলুনটা যাত্রা করার উপায় করে দেওয়ার পর থেকে যাত্রা শেষ করতে সময় লেগেছিল মোট পঁচাত্তর ঘণ্টা বা তার কিছু কম।
পথে খুঁটিনাটি সমস্যা কিছু দেখা দিলেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো দুর্ঘটনারই মুখোমুখি আমাদের হতে হয়নি। এমনকি পথ পাড়ি দেবার সময় আমাদের মনে সামান্যতম বিপদের আশঙ্কাও দেখা দেয়নি।
মোদ্দাকথা, বেলুনটা নির্বিঘ্নেই সমুদ্র সৈকতে অবতরণ করেছিল। ভাটার সময় থাকায় সৈকতভূমি এমন শক্ত ছিল, যাতে নোঙর ফেলতেও কিছুমাত্র সমস্যা হয়নি। আমাদের অভিযানের বিবরণটাকে যে পাণ্ডুলিপি থেকে সংগৃহীত হয়েছে সেটাকে যখন চার্লস্টন থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো দলটা তখন ফোর্ট মুলট্রিতেই অবস্থান করছিল।
ফোর্ট মুলট্রিতে অবস্থানকালে বেলুনচারীদের মনে আর কোনো বাসনা ছিল কি না, থাকলে তা যে কি কিছুই জানা সম্ভব হয়নি।
তবে পাঠক-পাঠিকাদের হতাশ হবার মতো কোনো কারণই দেখছি না। একটা কথা বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি যে, আগামী সোমবার বা বড়জোর তার পরের দিন আরও কিছু খবর তাদের দরবারে শে করতে পারব।
একটা কথা কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, আজঅবধি যেখানে, যত অভিযান সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মধ্যে বর্তমান অভিযানটা যে সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে-বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশও নেই। তাই আরও কিছু বিচিত্র ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকতে পারে এরকম আশঙ্কা করা নিতান্তই যুক্তিহীন। অতএব ধৈর্য ধরে ভবিষ্যতের পথ চেয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায়ই তো দেখছি না।
ডিডলিং
সেই আদিকালে অর্থাৎ সৃষ্টির গোড়াতেই দুটো ব্যাপার পণ্ডিতদের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। তারা সচকিত হয়ে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে উৎসাহি হয়েছেন। উৎসাহি বলা ঠিক হবে না, বরং বা উচিত ভাবনা চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছেন।
কি সে বিষয় দুটো–তাই না? একটা অবৈধ সুদ আদায়, আর দ্বিতীয়টা তঞ্চকতা।
তঞ্চকতা বলতে বোঝায়, কায়দা কৌশলের মাধ্যমে লোকের সঙ্গে প্রবঞ্চণা করা বা লোক ঠকানো।
আপনারা যে, যা-ই বলুন না কেন, তঞ্চকতা যে বিজ্ঞানেরই একটা শাখা, অর্থাৎ বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত আর এ-বিজ্ঞানবিদ্যা নিয়ে শাস্ত্রগ্রন্থ রচনা করে পৃথিবীতে বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া সম্ভব তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই।
প্রাচ্যদেশে হয়তো বা এ-তঞ্চকতা-বিদ্যাকেই চৌষট্টি কলার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিদ্যা আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
অভিধানের পাতা ঘাটাঘাটি করলে চোখে পড়বে, তঞ্চ শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রবঞ্চণা, চাতুর্য, কৌশল প্রভৃতি। আর তঞ্চক কথার অর্থ প্রবঞ্চক, ফাঁকি, ধোঁকা আর সত্যগোপন।
আবার যদি কয়েকপাতা পিছিয়ে যাওয়া যায় তবে দেখা যাবে তঞ্চন শব্দটার অর্থ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকৃতির। এর অর্থ জমে যাওয়া বা জমাটবাঁধা।
এবার আপনিই বিচার করুন ধাপ্পাবাজি কতটা গাঢ় হলে, জমাট বাঁধলে একটা মানুষ প্রবঞ্চক বা তঞ্চকে পরিণত হয়ে প্রবঞ্চণার বা তঞ্চকতায় পারদর্শিতা দেখাতে পারে! অতএব এ-কথা তো বা যেতেই পারে। প্রবঞ্চণা বা তঞ্চকতায় সাধনায় সিদ্ধিলাভের মাধ্যমে প্রবঞ্চক বা তঞ্চক বৈজ্ঞানিক আখ্যা করা যে-সেকথা নয়! মোদ্দা কথা, নামকরা প্রবঞ্চক বা শ্রেষ্ঠ-প্রবঞ্চক হতে হলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তবেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করা সম্ভব।
কিন্তু তঞ্চকতা অর্থ সম্বন্ধে ধারণা করা গেলেও যথাযথভাবে তার সংজ্ঞা লিখতে বসলে নাস্তানাবুদ হতে হয়, বসে বসে অসহায়ভাবে মাথা চুলকানো ছাড়া উপায় থাকে না।
তবে একটা কথা কিন্তু খুবই সত্য যে, প্রবঞ্চণা বা তঞ্চতা-র সংখ্যা লেখা মহাসমস্যা হলেও তঞ্চকের সংজ্ঞা লেখা কিন্তু সহজ ব্যাপার। আমি এটাই বুঝতে চাইছি–বিজ্ঞানের বিশেষ কোনো শাখার সংজ্ঞা লেখা অনেক কষ্টসাধ্য হলেও কিছু বলে বৈজ্ঞানিকটিকে বুঝানো অনেক, অনেক সহজ ব্যাপার।
বৈজ্ঞানিক প্লেটোর কথাই ধরা যাক না কেন। তিনি যদি এ-ধারণাটাকে মাথায় আনতে পারতেন তবে দ্বি-পথ প্রাণী হিসেবে মুরগিকে কেন মানুষের পর্যায়ে ফেলা যাবে না, মানুষ গণ্য করা যাবে না, এ-কথা বলতে দুঃসাহসী হতেন না।
আমার কিন্তু এসব বিতর্কে ঝুট-ঝামেলায় আদৌ ইচ্ছা নেই। আমি কেবলমাত্র এটুকুই বলতে চাচ্ছি, একমাত্র মানুষই তঞ্চক হতে পারে, অন্য কোন জন্তু জানোয়ারের পক্ষে সম্ভব নয়।
কেবলমাত্র পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত প্রাণীরাই তঞ্চকতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে। শেয়াল ধূর্ত–সে অন্যকে ঠকায়, কাক চুরি বিদ্যায় অভ্যস্ত, বেজি অন্যের মাথায় দিব্যি হাত বুলায় আর মানুষ করে তঞ্চকতা।
