এবার সুইডেনের রাজা দ্বাদশ চার্লসের কথা বলছি–তার মগজটায় আয়তন আর ওজন যদি আর একটু বেশি হতো তবে তঞ্চকদের তালিকার শীর্ষে নিজের নামটাকে রাখতে পারতেন। অতএব এ-কথা অবশ্য স্বীকার্য যে, পয়লা নম্বরের তঞ্চক হতে হলে তার মধ্যে ধৃষ্টতামূলক গুণ যথেষ্টই থাকা চাই।
ধৃষ্টতার মতোই তঞ্চকের আর একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বেপরোয়া মনোভাব। রীতিমত বেপরোয়া অর্থাৎ কাউকে তোয়াক্কা না করা কৃতী তঞ্চকের একটা বড় গুণ। সে কারো ধার ধারবে না। কোনো পরিস্থিতিতেই তাকে স্নায়ুবিক বল হারালে চলবে না। তাকে মনে করতে হবে স্নায়ু নামক কোনো বস্তুর অস্তিত্ব তার মধ্যে কোনোদিন ছিল না, আজও নেই। তঞ্চকতা করতে নেমে পিছপাও হওয়ার পাত্র সে নয়। উত্তম মধ্যম না দিয়ে তাকে ঘায়েল না করা অবধি সে তার কর্তব্যকর্ম থেকে এক তিলও সরতে নারাজ। কার্যসিদ্ধি করতে হলে তাকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে একের পর এক ধাপ অগ্রসর হতে হবে। তাকে মাথা এমন ঠাণ্ডা রাখতে হবে যেন শশারও হার মেনে যায়। যত বড় সমস্যার সম্মুখীনই হতে হোক না কেন তঞ্চককে কোনোকিছু গায়ে না মেখে ঠাণ্ডা মাথায় সাফল্যের দিকে ধীর-স্থিরভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
তঞ্চকতায় সাফল্যের আর এক চাবিকাঠি হচ্ছে, তাকে উদ্ধত প্রকৃতির হতে হবে। ঔদ্ধত্য ছাড়া সে এক পা-ও অগ্রসর হতে পারবে না। কথায় কথায় তাকে বুক ফুলিয়ে বড়াই করতে জানতে হবে। এতে সামান্য শৈথিল্য দেখা দিলেই তার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে এবং সাফল্যের পরিবর্তে ব্যর্থতার গ্লানি গায়ে মেখে নেওয়া ছাড়া তার আর কোনো গতিই থাকবে না। হাতের পেশীর ওপরেই তাকে নির্ভর করতে হবে খুব বেশি করে। যার সঙ্গে তঞ্চকতায় প্রবৃত্ত হবে তার সামনে বার বার হাতের পেশী ফুলিয়ে তার মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে হবে। প্যান্টের দু পকেটে হাত ঢুকিয়ে রেখে মস্তানির ভাব সর্বদা প্রকট করে রাখতে হয়। সে নিজের খাদ্যবস্তু মুহূর্তের মধ্যে গোগ্রাসে গিলে ফেলবে, ঢকঢক করে মদের বোতল খালি করে দেবে, লম্বা লম্বা টানে মুহূর্তে সিগারেট খতম করে দিয়ে ঔদ্ধত্যকে প্রকট করে তুলতে তার জুড়ি নেই। এমন ভাব দেখাত তঞ্চককে ওস্তাদ হতে হবে। আর গুণের বল সম্বল করেই তঞ্চক শিরোমণি আপনার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করা টাকা ধারের নামে ছি নিয়ে নেয়। আপনার নাক-কান নির্ভয় ও নিঃসঙ্কোচে মলে দেয়। আপনার পোষা ছোট্ট কুকুরটাকে জুতোর ডগা দিয়ে টুক করে লাথি হাঁকায় আর মওকা বুঝে আপনার বউকে সবেগে চুম্বন করে সোহাগ দেখায়। উদ্ধত আচরণ ছাড়া কে কোন কালে পয়লা নম্বরের তঞ্চক হতে পেরেছে, বলতে পারেন? সবশেষে বলছি তঞ্চকতায় সাফল্য লাভ করাকে হলে মুখে সর্বদা সেঁতো হাসি বজায় রাখতে হয়। যেমন বুকে সুতীক্ষ ছুরির ফলা পুষে রাখতে হয় ঠিক তেমনি মুখে প্রতিনিয়ত সেঁতো হাসি ফুটিয়ে রেখে বাঞ্ছিত ব্যক্তির মন জয়ের চেষ্টায় লেগে থাকতে হয়। তবে হাসির প্রয়োজন কখন সবচেয়ে বেশি হয়? কাজ হাসিল করার পর। কর্ম যাতে করে দিয়ে ফিক ফিক করে সেঁতো হাসি হেসে আত্মতুষ্টি লাভ করতে হয়। তবে একটা কথা, এটা এমনই এক বিশেষ ধরনের হাসি যার বেশি ঘটে না, অন্যের চোখে ধরা পড়ে না বললেই চলে।
কাজ সাঙ্গ করে তঞ্চক পরমানন্দে নিজের আশ্রয়স্থল খোপটায় ঢুকে আপন মনে দাঁত বের করে হেসে আত্মতুষ্টি লাভ করে। কেউ দেখবে না, কেউ মানবে না, বুঝবেও না কেউ, অথচ সে নিঃশব্দে হা-হা করে হাসতে আরম্ভ করে।
আর? কাজ হাসিল করে বাড়ি ফিরে পোশাক পাল্টে সে টুক করে মোমবাতিটা জ্বেলে দেয়। বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে মাথার তলায় বালিসটাকে দিয়ে নেয়। তারপর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। এবার হ্যাঁ, এবারই অঞ্চলের দেতো হাসি শুরু হয়ে যায়। সে এমন করে দাঁত বের করে হাসে না। তাকে কিছুতেই পয়লা নম্বরের তঞ্চক বলা যাবে না। নিঃশব্দে অট্টহাসিতে তাকে মাততেই হয়।
আরও আছে, তঞ্চককে পুরনো বস্তাপচা তঞ্চকতা-পদ্ধতি আঁকড়ে পড়ে থাকলে চলবে না। তার উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হতেই হয়। অন্যের কায়দা-কৌশল নকল করে কাজ করতে গেলে তার প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। সে যে পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করবে তা একেবারেই নতুন হওয়া চাই-ই চাই।
কৃতী তঞ্চকের চিন্তা-ভাবনা হয়ে পুরোপুরি নতুন, নিতান্তই নিজস্ব–কারো অনুকরণ করা অবশ্যই নয়। অনুকরণপ্রিয়তা দোষ যার মধ্যে থাকে তার পক্ষে নতুনতর কোনোকিছু করার ঝোঁক থাকতে পারে না। সেনিজেই কাজের পরিকল্পনা তৈরি করে। পরিকল্পনাকে কিভাবে বাস্তবায়িত করবে তা তাকেই মাথা খাঁটিয়ে বের করতে হয়। পয়লা নম্বরের তঞ্চক সে হবে সে তঞ্চকতার পরিকল্পনা চুরি করা, নকল করে কাজ হাসিলের চেষ্টা করাকে সে মনে-প্রাণে ঘৃণা করবে। অন্যের পদ্ধতি প্রয়োগ করে সে যদি কোনোক্রমে কারো টাকার থলি গায়েব করে ফেলে, পরমুহূর্তেই তার মাথায় যদি আসে যে, পদ্ধতিটা মৌলিক নয়, অজান্তে হলেও অন্যের মস্তিষ্ক প্রসূত পদ্ধতি প্রয়োগ করে ফেলেছে তবে সে তৎক্ষণাৎ টুটে গিয়ে যেন-তেন প্রকারে মালিককে চুরি-করা টাকার থলেটা ফিরিয়ে দিতে আসতেও সে কুণ্ঠিত হয় না। অতএব উদ্ভাবনীয় শক্তি প্রথম শ্রেণির তঞ্চকের একটা বড় হাতিয়ার স্বীকার না করে উপায় নেই।
