উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দিনভর এক নাগাড়ে দমকা বাতাস বয়ে চলল। বাতাসের বেগ খুবই বেশি। ফলে বাতাস আমাদের অগ্রগতিতে যথেষ্ট সহায়তাই করতে লাগল।
ভোরের আগে, পরিবেশ পুরোপুরি পরিষ্কার হবার পূর্ব মুহূর্তে বেলুন থেকে একটা অভাবনীয় ঠুঠা আওয়াজ হতে থাকায় আমরা খুবই ঘাবড়ে গেলাম। অস্বীকার করব না, অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতরে ঝুকপুকানি শুরু হয়ে গেল।
ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা করতেই অবাঞ্ছিত আওয়াজটার কারণ বের করা সম্ভব হলো। আবহাওয়ার তাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গ্যাসের আয়তন বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ এমন একটা আওয়াজের সৃষ্টি হয়েছে।
অবাঞ্ছিত ও বিরক্তিকর আওয়াজটা বন্ধ করা দরকার। উপায় বের করতেও। আমাদের বেশি মাথা ঘামাতে হলো না।
কয়েকটা খালি বোতল জড়ো করে ফেললাম। এবার সেগুলোকে একটা-একটা করে নিচের একটা জাহাজে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলাম। হ্যাঁ, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে বটে। বোতলগুলো অক্ষত অবস্থাতেই পানিতে পড়েছে।
এবার বেলুন থেকে তলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বুঝতে পারলাম, সেটা নিউইয়র্ক অঞ্চলের কোনো একটা জাহাজ। দেখলাম, জাহাজের নাবিকরা কায়দা কৌশল করে পানি থেকে বোতলগুলো তুলতে আরম্ভ করল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই তারা সব কয়টা বোতল তুলে নিতে পারল।
আমি বারবার এদিক-ওদিক কাৎ হয়ে জাহাজটার নাম দেখার চেষ্টা করলাম। লেখাটা দেখতে পেলাম বটে, কিন্তু নামটা পড়া সম্ভব হলো না। কারণ, হরফগুলো এতই ছোট যে, এত উঁচু থেকে ঠিকঠাক নজরে পড়ল না–যাতে পাঠোদ্ধার করা যেতে পারে। উপায়ান্তর না দেখে মি. অসবোর্ণের থলেটা হাতিয়ে দূরবীণটা বের করে চোখের সামনে ধরলাম। এবার লেখাটাকে আটলান্টা বলেই মনে হলো।
এখন রাত বারোটা। আমাদের পক্ষীরাজ বেলুনটা দুর্বার গতিতে প্রায় পশ্চিম দিকে ধেয়ে চলল। আমার চোখের মণি দুটো প্রায় অন্ধকার সমুদ্রের বুকে অনবরত চক্কর মারতে লাগল। অন্ধকার সমুদ্রের বুকে অনবরত ফসফরাসের ঝকমকি চলতে লাগল। সে যে কী মনোরম চোখে চমকলাগানো দৃশ্য তা চাক্ষুষ না করলে, কারো মুখ। থেকে শুনে বা লিখিত বিবরণীয় পড়ে সম্যক ধারণা করা সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়।
পুনশ্চঃ এবার মি. আইন্সওয়ার্থের লিখিত বিবরণী উল্লেখ করছি–এখন রাত দুটো।
বেলুনের পরিস্থিতি এবং বেলুনের বাইরে অবস্থা দেখে বুঝতে পারলাম–চারদিক মোটামুটি শান্তই। কিন্তু এবারটা সম্বন্ধে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, আমরা সম্পূর্ণ বাতাসের অনুকূলে অগ্রসর হচ্ছি।
একটা কথা খুবই সত্য যে, হুইল ডের ছাড়বার পর থেকে আমি নির্ঘুম অবস্থাতেই কাটিয়ে দিয়েছি। এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাইনি। ঘুমানো তো দূরের কথা, দুচোখের পাতা এক করাই আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অতন্দ্র প্রহরীর মতো চারদিক সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে লাগলাম।
কিন্তু আর নয়, চোখের পাতা খোলা রাখাই সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। ঘুমে চোখ বুজে আসতে লাগল। কিছুক্ষণ অন্তত ঘুমিয়ে নিতে না পারলে আর চলতে পারব না।
অনুমানে বোঝালাম, আমেরিকার উপকূলে পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যেমন উল্কার বেগে ধেয়ে চলেছি তাতে এরকম ধারণাই আমার মধ্যে বদ্ধমূল হলো।
মি. আইন্সওয়ার্থের পাণ্ডুলিপির পাতা থেকে গৃহীত–মঙ্গরবার নয়, তখন রাত একটা। বেলুন থেকে দক্ষিণ আমেরিকার তটরেখা স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে উঠল। মনটা আনন্দে নেচে উঠল।
বড় একটা সমস্যা আমাদের সামনে থেকে সরে গেল।
আমি আপন মনে বলে উঠলাম–ঈশ্বরের অপার করুণা না থাকলে এমন একটা অভাবনীয় সাফল্য কিছুতেই সম্ভব নয়। আমরা আতলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ফেলেছি। অনায়াসে আর একেবারে নির্বিবাদেই আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। ঈশ্বর সহায়! ঈশ্বরের জয় হোক!এরপর কে বলতে পারবে, পৃথিবীতে কোন কাজ অসম্ভব? আমরা যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছি তা দেখে কেউ-ই এ-কথা বলতে উৎসাহি হবে না।
ডায়েরির বক্তব্য এখানেই শেষ করা হলো। তবে ডাইরির বক্তব্য ছাড়াও মি. আইন্সওয়ার্থ কিছু কথা মি. ফরসাইথকে বলে দিলেন।
বেলুনের অভিযাত্রীরা প্রথম সমুদ্রের তটরেখা দেখতে পেয়েছিলেন। তখন চারদিকে মৃত্যুর–কবরখানার স্তব্ধতা বিরাজ করছিল।
অনুসন্ধিৎসু চোখে দীর্ঘসময় ধরে তাকিয়ে থাকার পর দুজন নাবিক আর মি. অসওয়ার্থ প্রথম তটরেখাটা দেখতে পেয়েছিলেন।
মি. অসওয়ার্থের ফোর্থ মুলট্রিতে কিছু পরিচিত লোকজন ছিল। তাই তারা সবাই আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধঅন্ত নিয়েছিলেন। সে জায়গাটার কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায় তারা নামার চেষ্টা করবেন।
শেষপর্যন্ত তারা করলেনও তাই। ফোর্ট মুলট্রির অদূরবর্তী এক জায়গায় বেলুনটাকে সমুদ্রের তীরের কাছাকাছি নিয়ে চলে এলেন। এতে তাদের কোনো সমস্যার মুখোমুখিও হতে হলো না। কারণ, তখন ভাটা চলছিল। আর ভাটাও শেষ হয়ে এসেছিল। ফলে বালি ছিল শক্ত আর মসৃণ। বেলুন অবতরণের পক্ষে অনুকূল ছিল সমুদ্রসৈকতটা।
বেলুনটাকে উপকূলের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে সজোরে নোঙরটাকে ছুঁড়ে মারতেই সেটা উড়ে গিয়ে শক্ত বালির স্তূপে গেঁথে গেল। ব্যস, নিশ্চিন্ত।
সমুদ্র উপকূলে বেলুন অবতরণের খবরটা বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে দ্বীপের সর্বত্র একেবারে আনাচে কানাচে পর্যন্ত পৌঁছে গেল। খবরটা চাউর হতে না হতেই অসভ্য দ্বীপবাসী আর দূর্গের অবস্থানরত লোকজন ছুটাছুটি করে সমুদ্রসৈকতে ছুটে এলো। কৌতূহলবশত সবাই বেলুনটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়ল।
