উফ্! কী বিচিত্র অভিজ্ঞতা! এরকম একটা ভয়ঙ্কর রাতের অভিজ্ঞতা যে লাভ করেছে সে-ই সত্যিকারে বেঁচে থাকে। আর এ জীবনটা রাতটা তো একটা শতাব্দীব্যাপী জীবনের সমতুল্য।
আজকের এরকম একটা রোমাঞ্চকর রাতের বিনিময়ে অনাস্বাদিত আনন্দের বিনিময়ে আমাকে যদি একশো বছর পরমায়ু দান করতে উৎসাহি হয় তবু আমি সম্মত হব না।
এবার মি. ম্যাসনের পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যাক। তাতে দেখা গেল, লেখা রয়েছে–রবিবার, সাতই। আজ ভোরের দিকে ঝড়ের তাণ্ডব অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছিল। একটু আগেও যে ঝড় আমাদের বেলুনটাকে উথাল-পাথাল করেছিল এমন তা-ই ক্রমে স্তিমিত হতে হতে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।
আমরা তখন ক্রামগত উত্তরদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আর আমরা হয়তো ঘণ্টায় ত্রিশ মাইল গতিতে উত্তর দিক বরাবরই এগোচ্ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে? আমাদের গতি পশ্চিমদিকে। হানস্ আর প্রধান স্কুর দৌলতেই আমরা অনবরত পশ্চিমদিক বরাবর ছুটে চলেছি। অন্যথায় আমাদের হয়তো বা এমন উত্তর দিকেই ধেয়ে যেতে হতো। আমার বিশ্বাস, আমার দ্ধমূল ধারণা আমাদের এ অভিযান শতকরা একশো ভাগই সফল হয়েছে, আমরা যে চিন্তা করে পা বাড়িয়েছিলাম সেদিক থেকে পূর্ব সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ব্যর্থতা বা হতাশার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের সাফল্য এটাই প্রমাণ করেছে যে, আকাশ-পথে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া কিছুমাত্রও সমস্যার ব্যাপার নয়।
গতকালের প্রবল বাতাসের বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই করার ছিল না,নিজেদের ইচ্ছামত যে কোন দিকে বেলুনটাকে চালিত করতে পারতাম না। তবে হয়তো বা বহু
পরিশ্রম ও বুদ্ধি খরচ করে সে বাতাসের দাপটকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ একটা প্রপেলারকে ব্যবহারের মাধ্যমে মোটামুটি তেজি বাতাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইচ্ছামত দিকে বেলুনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চলে।
আজ দুপুরে…ভার হ্রাস করে, বেলুনটার ওপন অনেকাংশে লাঘব করে আমরা তর তর করে আকাশের দিকে অনেকখানি ওপরে উঠে যেতে পেরেছিলাম। আমরা তখন ভূমি থেকে পঁচিশ হাজার ফুট ওপরে উঠে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের গতি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের দ্রুত।
আমি মনে মনে হিসাব করে মোটামুটি সিদ্ধান্তে পৌঁছিলাম, আমার যাত্রা যদি এভাবে আরও তিন সপ্তাহও অনবরত চলে তবুও এ পুকুরের মতো ছোট্ট এ জলাশয়টাকে পাড়ি দেবার জন্য যে পরিমাণ গ্যাস আমাদের দরকার সে তুলনায় প্রচুর গ্যাসই আমাদের ট্যাঙ্কে মজুদ আছে।
এখন বুঝছি, অহেতুক ভুলগুলোকে আমরা খুব বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমি প্রয়োজনে নিজের ইচ্ছামত স্রোত বেছে নিয়ে যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারি। আর যত স্রোত আছে সবগুলোও যদি আমার বিরুদ্ধাচরণ করে তবুও আমি প্রপেলারের সাহায্যে নির্বিপরেই অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে পারব।
না, উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনাই ঘটেনি। পুরোপুরি নিরাপদেই আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম।
দিনটা তো নির্বিঘ্নেই কাটল। এখন চিন্তা হচ্ছে রাতটা নিয়ে। রাতটা যে কিভাবে কাটবে সেটাই ভাববার বিষয়। তবু আমার ধারণা, দিনের মতো রাতটাও ভালোভাবেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
পুনশ্চঃ মি. আইন্সস্যান্ডের ডায়রির পাতায় উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু নেই বটে। তবে একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়ে আমি যারপরনাই স্তম্ভিত হয়েছি। ব্যাপারটা আমার কাছে অবাক হবার মতোই মনে হয়েছে। অবাক হবার মতো ব্যাপারটা ছিল, তাই না? কটোপাবিসর মতো সমান উচ্চতায় উঠে যাওয়ার পরও আমার মোটেই ঠাণ্ডা লাগেনি, কষ্ট হয়নি, মাথাও ধরেনি–মোদ্দাকথা, কোনোরকম বিপরীত প্রতিক্রিয়াই আমার মধ্যে প্রকাশ পায়নি। আর কষ্টবোধও করিনি এতটুকুও।
কেবলমাত্র আমার নিজের কথাই বা বলি কেন? মি. হল্যান্ড, মি. ম্যাসন বা স্যার এভারার্ড কেউ এতটুকুও শারীরিক কষ্টবোধ করেন নি।
তবে এটা কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মি. অসবোর্ণ মাঝে মধ্যে বুকের সংকোচনের কথা বলে ছিলেন। কিন্তু সে আর কতক্ষণ। অচিরেই তা নিরাময় হয়ে গিয়েছিল–স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়েছিলেন।
আমরা দিনভর তীব্রগতিতে উড়ে চলেছি। অতএব নিঃসন্দেহ হওয়া যেতে পারে, আটলান্টিক অতিক্রম করার মোট পথের একটা বড় অংশই আমরা পিছনে ফেলে এসেছি।
আটলান্টিকের জলরাশির ওপর দিয়ে উল্কার বেগে ধেয়ে চলার সময় আমাদের বেলুনটা বিভিন্ন রকমের একটা-একটা করে বেশ কয়েকটা বিশ-ত্রিশটা জাহাজকে পিছনে ফেরে দুর্বার গতিতে অগ্রসর হয়েছে। আর আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে অন্যান্য জাহাজের কর্মীও যাত্রীরা বিস্মিত হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে।
যা-ই হোক, মোদ্দা কথা, বেলুনে চেপে মহাসাগর পাড়ি তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কথায় বলে যা-কিছু অজানা-অচেনা তাকেই আমরা অনেক বড় কিছু বলে। মনে করে থাকি।
আমরা ভূমি থেকে পঁচিশ হাজার ফুট ওপরে উঠার পর মনে হলো আকাশটা নীল নয় প্রায় কালো। সমুদ্রকে কচ্ছপের পিঠের মতো নয় সম্পূর্ণ অবতল দেখায়। আর? তারাগুলো অনেক, বেশি পরিষ্কার দেখায়। সব মিলিয়ে আমাদের এ পৃথিবীটাকে অত্যাশ্চর্য বোধ হয়।
মি. ম্যাসনের পাণ্ডুলিপি থেকে গৃহীত বক্তব্য সোমবার সকাল হতেই প্রপেলারের দণ্ডটা বিগড়ে গেছে। ফলে কিছু সমস্যা পার হতে হলো। দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালাবার পর হতাশ সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। ওটাকে বাতিল করে নতুন একটা দণ্ড ব্যবহার না করে উপায় নেই। আর ওটাকে একেবারে নতুন করেই গড়তে হবে।
