আমাদের নাবিকরা আনন্দে এমনই মাতোয়ারা হয়ে উঠল যে, তারা ঠোঁট থেকে জেনেভার নামাতেই চায় না। আর তারা সে মুহূর্তে এমনই বেপরোয়া হয়ে উঠল যেন কাণ্ডজ্ঞানই হারিয়ে বসেছে।
ব্যাপারটার শেষপর্যন্ত তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করল। চারদিকের জাহাজগুলো থেকে ঘন ঘন বন্দুকের গুলির আওয়াজ করে আমাদের উৎসাহ দিতে লাগল। আর চিৎকার চ্যাঁচামেচি আর হৈ হুল্লুড়ের মাধ্যমে জাহাজের কর্মীরা আমাদের উৎসাহ দিতে মেতে গেল। আবার কেউ কেউ টুপি খুলে বার বার নাড়িয়ে আমাদের অভিবাদন জানাতেও বাদ দিল না। রুমালও নাড়াল কেউ কেউ।
আমাদের চিন্তা কিন্তু অন্যদিকে। আমরা ইতিমধ্যে কতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি তার মোটামুটি একটা হিসাব করে ফেললাম।
হিসাব নিকাশের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারলাম আমরা পঁচিশ মাইলের কম পথ তো অবশ্যই নয়, বরং কিছু বেশি হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
প্রপেলারটাকে মেরামতের পর সর্বদাই কাজে লাগানো হলো। সেটা সক্রিয় থাকার ফলে আমাদের অগ্রগতিতে ছেদ তো পড়লই না বরং তীব্র গতিতেই আমরা প্রতিনিয়ত এগিয়ে যেতে লাগলাম।
সূর্য পটে বসল। সমুদ্রের বুকে আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেল।
ইতিমধ্যে ঝড়ের উন্মাদনা অনেকাংশে স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার বাড়তে বাড়তে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিল। ঝড়ের কী যে উন্মাদনা শুরু হয়ে গেল–তা আর বলার নয়। বুক শুকিয়ে ওঠার মতো প্রলয়ঙ্কর ঝড় আমাদের ওপর যেন দারুণ আক্রোশে বার বার ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল।
আর সমুদ্র। রাতভর পূবের হাওয়া বয়ে চলল। সমুদ্রও কম উত্তাল উদ্দাম হয়ে উঠল না। তার ওপর ফসফরাসের দ্যুতি সমুদ্রের সর্বত্র জোনাকি পোকার মতো পর্যায়ক্রমে জ্বলতে আর নিভতে লাগল। স্পষ্টই মনে হলো লক্ষ-কোটি জোনাকি পোকা যেন সমুদ্রের বুকে দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে।
রাতভর পূর্বদিক থেকে বাতাস বয়ে আসায় আমাদের যাত্রার যথেষ্ট সুবিধাই করে দিল। দমকা বাতাস পেয়ে আমাদের বেলুনটার গতি অনেকাংশে বেড়ে যাওয়ায় আমরা দ্রুত এগিয়ে চললাম।
ঠাণ্ডা কনকনে ঠাণ্ডা! ঠাণ্ডায় গায়ে রক্ত হিম হয়ে আসার উপক্রম হলো। আর বরফ-শীতল বাতাস যেন হাড়ে গিয়ে আঘাত হানতে লাগল। তার ওপর আবহাওয়া আর্দ্র থাকায় আমাদের হাল যেন বেহাল হয়ে পড়ল।
ভাগ্য ভালো যে, বেলুনের ভেতরে জায়গার অভাব নেই। ফলে আমাদের কম্বল মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতে কোনো অসুবিধাই পড়তে হলো না। আমরা করলামও তাই। কম্বল আর জোব্বা জড়িয়ে পাশাপাশি গাদাগাদি হয়ে শুয়ে পড়লাম।
পুনশ্চঃ (এ প্রতিবেদনটা মি. আইন্সওয়ার্থ লিখেছেন।) আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও মনে গেঁথে রাখার মতো সময় নয়টা ঘণ্টা। অজ্ঞাত বিপদ আর রোমাঞ্চকর অভিযানের নতুনত্ব আমার চোখে এক কল্পনাতীত মহত্বরূপে দেখা দিল। সত্যি বলছি, এমন একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার কথা মন থেকে মুছে যাবে না, কিছুতেই না।
পরম পিতার কাছে একটাই প্রার্থনা, আমাদের যাত্রা যেন শুভ হয়, সাফল্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সাফল্য প্রার্থনার পিছনে কোন অন্তনিহিত কারণ রয়েছে? আমার জীবন রক্ষার জন্যই কি পরমেশ্বরের কাছে এমন সনির্বন্ধ প্রার্থনা করছি? না, অবশ্যই না। আমার মতো অতি নগণ্য একটা জীবন রক্ষার জন্য অবশ্যই না। তবে? আমি প্রার্থনা করছি, মানুষের জ্ঞান-ভাণ্ডার যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, আর এ জয় যেন বিরাটত্ব লাভ করতে পারে।
আমি অবাক হচ্ছি, অতীতের মানুষের অনাগ্রহ আর অক্ষমতার কথা ভেবে। কই, কাজটা তো এমনকিছু কঠিন ও সমস্যা সৃষ্টিকারী তো নয়, বরং সহজসাধ্যই বটে। অথচ অকারণ ভীতির জন্যই এর প্রতি মানুষের মধ্যে অনিহা জেগেছে। এটা সত্যি আমার কাছে বিস্ময়েরই উদ্রেক করছে।
যে তুফানটা আমাদের সমুদ্রযাত্রার সহায়তা করেছে, অত্যল্প সময়ের মধ্যে আশাতীত পথ পাড়ি দেবার সুযোগ করে দিয়েছে, ঠিক সেরকমই আর একটা দমকা ঝড় উঠল। বেলুনটার গায়ে বাতাসের তীব্র চাপ লেগে ক্রমাগত চার পাঁচদিন আমাদের উল্কার বেগে ছুটিয়ে নিয়ে চলুক। আর সে সময়ের মধ্যেই যাত্রীরা এক উপকূল থেকে অন্য আর এক উপকূলে অনায়াসে পৌঁছে যাক। তবে এও সত্য যে, এরকম ঝড় কেবল চার-পাঁচ দিনই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশিদিন স্থায়ীত্ব লাভ করে। এরকমই একটা ঝড়ের কল্যাণে যাত্রীরা সুবিস্তীর্ণ আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে একটামাত্র হৃদে হাজির হয়ে যায়।
সমুদ্র এখন উত্তাল উদ্দাম। আকাশ-ছোঁয়া এক-একটা ঢেউ তীব্র আক্রোশে যেন অন্যটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আর সে সঙ্গে সমুদ্র জুড়ে ফেণার ছড়াছড়ি তো রয়েছেই। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার, সমুদ্র মোটামুটিনিস্তব্ধ। বুক-কাঁপানো তর্জন গর্জন এখানে অনুপস্থিত দেখে আমি একেবারে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ার যোগাড় হলাম। পানি থেকে কোনো শব্দ উত্থিত হয়ে আকাশের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে না। সুদীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে সমুদ্র অবস্থান করায় উত্তাল সমুদ্রের যন্ত্রণা যেন মুচড়ে মুচড়ে উঠলেও যাবতীয় যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করছে। আকাশছোঁয়া ঢেউগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন, অগণিত বিশালদেহি মূক দৈত্য বুঝি অসহ্য ও প্রতিকারহীন যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত ছটফট করছে। তীব্র আক্রোশে বার বার আছড়ে পড়ছে।
