তা স্বত্ত্বেও এত অন্তর্দাহ, এত ব্যথা বেদনার মধ্যেও একেবারে শেষ মুহূর্তটার পূর্ব পর্যন্ত তার মনোবল ভেঙে পড়েনি।
তার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ আর শান্ত হতে হতে এক সময় একেবারেই মিইয়ে গেল। আরও অনেক বেশি খাদে নেমে গেল। এত কিছু সত্ত্বেও তার মুখ নিঃসৃত শব্দগুলোর কথা আমি বলতে পারব না–কিছুতেই না। তার জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তার সুরেলা কণ্ঠস্বর আমি যত শুনেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি, অভিভূত হয়ে পড়েছি।
একটা কথা খুবই সত্য সে যে আমাকে ভালোবাসত এতে তিলমাত্র সন্দেহও আমার নেই, থাকা মোটেই সঙ্গতও নয়। তার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তেই আমি পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পেরেছি, তার মতো অন্তকরণের অধিকারী মানুষের বুকে যে প্রেমের সঞ্চার ঘটে তাকে কিছুতেই একটা সাধারণ অনুভূতি বলে মনে করা যায় না, আর তা হতে পারেও না। সংক্ষেপে বললে, তার ভালোবাসা ছিল গভীর আর শতকরা একশো ভাগই নিখাদ।
সবকিছু বুঝেও আমি তাকে আরও ভালোভাবে বুঝলাম, চিনতে পারলাম তার মৃত্যুর পর। তার জীবদ্দশায় তার প্রেমের যে গভীরতা সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি তা পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হল–সে ইহলোক ত্যাগ করে যাবার পর।
আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, তার হাত দুটোর মুঠোর মধ্যে আমার হাতটাকে রেখে, জড়িয়ে ধরে সে যে এক নিশ্বাসে তার মনের কথাগুলো বলে যেত তা স্বর্গের দেবীদের ভাবানুরাগকেও হার মানাত।
হায় ঈশ্বর! আমার অদৃষ্টে কি এত সুখ, এত আনন্দও ছিল? আমার জীবনে যখন পরম সুখ-শান্তি নেমে এলো তখনই চুপিচুপি আমার প্রাণ প্রেয়সীকে হারাবার অভিশাপ আমার মাথায় নেমে এলো। একে বজ্রপাতের সঙ্গে তুলনা করলেও বুঝি কম করেই বলা হবে। কেন আমি অভিশাপ-জ্বালায় জর্জরিত হচ্ছি? কেন? কেন?
না, এ আলোচনা আমার পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়? আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। বুকের ভেতরটা অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে থাকে।
আজ আমি কেবলমাত্র এটুকুই বলতে পারি, প্রেমের বেদীমূলে আমার প্রেয়সী লিজিয়ার এই যে আত্মনিবেদন, তা কি যোগ্য পাত্রে? হায়! না, যে বুকের ভালোবাসা নিঙড়ে নিতান্তই অপাত্রে দান করেছিল।
লিজিয়া, আমার প্রেয়সী–আমার কাছে ধরা দেয় অত্যুগ্র এক জীবনতৃষ্ণারূপে। অফুরন্ত, অনন্ত ছিল যে তৃষ্ণা, যে জীবন দ্রুত পদচারণার মাধ্যমে উড়ে চলে যাচ্ছে তার কাছ থেকে তাকেই আঁকড়ে ধরে কাছে কাছে রাখার অতুলনীয় ও পরম আকৃতি। তার বুকের অন্তরতম কোণে মহাতৃষ্ণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তার যে অনুভূতিকে তুলির টানে ফুটিয়ে তোলার মতো শিল্পজ্ঞান আমার মধ্যে অনুপস্থিত, লেখনীর মাধ্যমে বুঝিয়ে বলার মতো ভাষার একান্ত অভাব।
অভিশপ্ত যে রাতে সে আমার কাছ থেকে চিরদিনের শোকান্তরে চলে গেল। যেদিন ক্ষীণ অথচ ভাবাপ্লুত কণ্ঠে আমাকে ডাকল।
আমি ধীর পায়ে তার রোগশয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। শিয়রে বসার জন্য হাতের ইশারা করল।
আমি তার মাথার কাছে বসলাম।
সে তার কাঁপা কাঁপা ক্ষীণ হাত দুটো দিয়ে আমার একটা হাত জড়িয়ে ধরল। দুর্বল কণ্ঠে আমাকে অনুরোধ করল, তারই সদ্যরচিত কয়েকটা কবিতা পাঠ করে শোনাতে।
আমি তার অনুরোধ ফেলতে পারলাম না, সে ইচ্ছাও ছিল না।
আমি তার কবিতার গোছো থেকে পরিবেশটার উপযোগি একটা কবিতা বেছে নিয়ে তাকে পাঠ করে শোনালাম।
আমি কবিতাটা পাঠ করে হাতের পাণ্ডুলিপিটা থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকালাম।
লিজিয়া দুর্বল হাত দুটোর ভর দিয়ে খাট থেকে নেমে এলো। মেঝেতে দাঁড়াল। বাহু দুটোকে উর্ধ্বে উত্থিত করে ক্ষীণ কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তস্বর উচ্চারণ করল–‘হে ঈশ্বর! হে পরম পিতা!
এই কথা তখন আমার কণ্ঠও বার বার উচ্চারণ করতে লাগল–‘হে ঈশ্বর! হে পরম পিতা!’ এ দৃশ্যটারই পুনরাবৃত্তিই কি চলতে থাকবে? এর কি সমাপ্তি ঘটবে না? এ বিজয়ীকে কি কিছুতেই জয় করা হবে না? জয় করা সম্ভব হবে না।
হে ঈশ্বর, আমরা কি তোমার সন্তান নই। মানুষের কামনা-বাসনার রহস্য কে-ইবা বলতে পারে? সে যে কী অন্তহীন তেজের অধিকারী? দেবদূতের কাছে মানুষ মাথা নত করে না, কিছুতেই পরাজয় স্বীকার করে না–কারো কাছেই নয়। এমনকি ভয়ঙ্কর মৃত্যুর কাছেও না। কিন্তু কেন? এর একমাত্র কারণই হচ্ছে কামনা-বাসনাই তার একমাত্র দুর্বলতা। আর এ দুর্বলতাটুকুর জন্যই মানুষ পরাজয় স্বীকার করতে উৎসাহি হয় না।
ঠিক সে মুহূর্তেই, হয়তো বা গভীর আবেগবশত হৃতশক্তি হয়ে বহু কষ্টে সে তারনিস্তেজ ছাইয়ের মতো বিবর্ণ হাত দুটো ধীরে ধীরে নামিয়ে বিছানায় পাতল।
সে ক্ষণিকের জন্য মৃত্যুশয্যায় নিস্তেজ শরীরটা নাড়াল। তার ফুসফুস নিঙড়ে শেষ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার সঙ্গে তার ঠোঁট দুটোর ফাঁক দিয়ে অস্পষ্ট একটা গুঞ্জনধ্বনি বেরিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
আমি তার নিঃসাড় দেহের ওপর সাধ্যমত ঝুঁকে কান পাতলাম। গ্লালভিল-এর শেষের কথাগুলো কানে বাজতে লাগল।–‘দেবদূতের কাছে মানুষ পরাজয় স্বীকার কওে না, এমনকি মৃত্যুর কাছেও না। মানুষের একমাত্র দুর্বলতা তার দুর্বল কামনা বাসনা।’
আমার প্রেয়সী, আমার লিজিয়া মারা গেল। তাকে হারিয়ে মর্মবেদনায় আমি একেবারে মিইয়ে, মাটির সঙ্গে মিশে গেলাম। বুকভরা হাহাকার আমার একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়াল।
