রাইন নদীর তীরবর্তী অবক্ষয়ের পথে ধেয়ে যাওয়া নির্জন-নিরালা বাড়িটা আমার পক্ষে বেশিদিন আঁকড়ে পড়ে থাকা সম্ভব হলো না। অসহ্য! আমার কাছে বাড়িটা। একেবারেই অসহ্য হয়ে দাঁড়াল।
বিষয় আশয় ধন-সম্পদ বলতে যা বোঝায় তার কিছুমাত্র অভাবও আমার ছিল না। সাধারণ মানুষ ভাগ্যগুণে যা লাভ করতে পারে তার চেয়ে ঢের বেশি লিজিয়া আমাকে দিয়েছিল।
অতএব আর একটা দিনও দেরি না করে নির্জন সে বাড়িটা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে দিশেহারা উদ্দেশ্যে এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে এক সময় হাঁপিয়ে উঠলাম। শেষপর্যন্ত ইংল্যান্ডের এক নির্জন বনাঞ্চলের একটা পুরনো মঠ খরিদ করে নিলাম। কিছু অর্থ ব্যয় করে তার কিছু কিছু অংশ মেরামত করে ব্যবহার উপাযযাগি করে নিলাম।
জীর্ণ যে বাড়িটার বিষণ্ণ ও ভয়ঙ্কর নির্জনতা আর গাম্ভীর্য, আর জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশ, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত বহু দুঃখ যন্ত্রণাময় প্রাচীন স্মৃতি যেন আমার মন-প্রাণের বিবাগীসুলভ মনোভাবের সঙ্গে হুবহু মিলে গেল। বাড়িটার মধ্যে আমি একটা ভালোলাগার পুরোপুরি ভাব খুঁজে পেলাম। আমার মধ্যে একটা চঞ্চল শিশু যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শিশুদের মতোই মন দিয়ে, শিশুদের মতোই উম্মাদনার শিকার হয়ে আমি অদ্ভুত অদ্ভুত খেলনা দিয়ে বাড়িটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে নিলাম।
কী একটা অদ্ভুত খেয়াল, পাগলামিও যাকে বলা চলে আমার মাথায় ভর করল। বাড়িটাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলার জন্য অত্যাশ্চর্য জমকালো বেশ কয়েকটা পর্দা, মিশরের খোদাই করা দৃষ্টিনন্দন বহুমূল্য মূর্তি, বিচিত্র ধরনের কার্নিশ আর চোখ ধাঁধানো কারুকার্যমণ্ডিত আসবাবপত্র আর সে সঙ্গে জরির কাজ করা গালিচ প্রভৃতি আরও কত কি যে বেছে বেছে ফরিদ করে আনলাম বলে শেষ করা যাবে না ।
যাক, উপরোক্ত প্রসঙ্গ আপাতত চাপা যাক। এখন আমি কেবলমাত্র এক অভিশপ্ত ঘরের কথাই বলব।
এক সামরিক উত্তেজনার শিকার হয়ে সোঁ-র শকুন্তলা এবং নীলাক্ষী লেডি রোয়েনা ত্রিভেনিয়নকে নিয়ে গীর্জায় গেলাম। উদ্দেশ্য বিয়ে করে ঘর বাঁধা। করলামও তা-ই। পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে বিয়ের পাট চুকিয়ে আমার স্মৃতির পটে চিরজাগরুক লিজিয়ার উত্তরাধিকারিনীর মর্যাদা দিয়ে তাকে গীর্জা থেকে নিয়ে পথে নামলাম। আর স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে তাকে সে বিশেষ ঘরটায় এনে তুললাম।
সদ্য বিবাহিতা স্বামী-স্ত্রীর সে বিশেষ ঘরটার কথা আমার স্মৃতিতে আজও জ্বল জ্বল করছে। সে কথা আমার মন থেকে মুছে যাওয়া তো দূরের কথা, এতটুকুও ম্লান পর্যন্ত হয়নি।
প্রায় দুর্গের মতো দেখতে মঠটার উঁচু গম্বুজের মধ্যে অবস্থিত ঘরটা ছিল গম্বুজের মতোই। আর সেটা ছিল খুবই বড়। পাঁচটা ভুজযুক্ত ঘরটার দক্ষিণ দিককার ভুজটায় ছিল একটামাত্র জানালা। সেটাও বেশ বড়সড়ও বটে। আর তাতে কাঁচ লাগানো ছিল। কাঁচ ছিল উৎকৃষ্ট কারুকার্য মণ্ডিত এবং অখণ্ড একটামাত্র কাঁচ। ভেনিস থেকে সেটাকে আনানো হয়েছিল।
আর কাঁচটার বিশেষত্ব ছিল, সেটার রং ছিল সিসার মতো। তাই সূর্য বা চাঁদের আলো একটু বেশি মাত্রায়ই ঘরে ঢুকত। আর তা কাঁচটার ভেতর দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে ঘরে যাবতীয় বস্তুর ওপর অত্যাশ্চর্য, যাকে বলে ভৌতিক দ্যুতিতে যাবতীয় বস্তুর ওপর ছড়িয়ে পড়ত।
জানালাটা ছিল সুবিশাল। তারও পরের অংশটা গম্বুজের শ্যাওলা ধরা দেওয়ালের সঙ্গে মিলেমিশে ছিল। সেটা বেয়ে একটা পুরনো দ্রাক্ষ্মালতা উঠে চারদিকে তুলির টানে আঁকা নকশার মতো সুন্দরভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আর দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে অবস্থান করায় ওক কাঠের সিলিংটাকে কেমন। ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছিল। আর গোলাকার সিলিংটা ছিল খুবই উঁচুতে। তার সঠিক শিল্পরীতি সমৃদ্ধ কারুকার্যও কম মনোলোভা ছিল না। এতে গণিত শিল্পরীতি এবং অর্ধেক ড্রইডিং শিল্পরীতি সমৃদ্ধ কারুকার্য ছিল যা যে কোনো শিল্পরসিকেরই মন জয় করতে বাধ্য।
বেলনাকার সে সিলিংটার ঠিক মাঝখানে থেকে নেমে আসা একটা সোনার চেনের সঙ্গে একটা সোনার ধূপদানি ঝুলিয়ে দেওয়া ছিল। তার গায়ে সারাসেনিক শিল্পরীতির কৌশলে অসংখ্য ছিদ্র করা ছিল যার ফলে সেগুলোর ভিতর দিয়ে বিভিন্ন রঙের আগুনের শিখা কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে বেরিয়ে আসত। তখন সব মিলিয়ে যে অপরূপ শোভা ধারণ করত তা বাস্তবিকই দৃষ্টি নন্দন।
ঘরটার ভেতরে রুচিসম্মতভাবে সাজানো ছিল প্রাচ্য শিল্পরীতি সমৃদ্ধ খান কতক ঘাট এবং সোনার বাতিদান। আরও আছে, ভারতীয় শিল্পরীতির অনুকরণে তৈরি একটা চেয়ার। এমনকি সুদৃশ্য একটা বিয়ের চেয়ারও সেখানে রক্ষিত ছিল। এ দুটোইনিরেট আবলুশ কাঠ দিয়ে তৈরি আর উভয়েরই মাথার ওপর চমৎকারভাবে একটা করে বহুমূল্য ও সুদৃশ্য চাঁদোয়া শোভা পাচ্ছিল।
আর হায়! দরজা-জানালায় যে সব পর্দা ঝুলিয়ে রাখা ছিল সেগুলোকেই তো দরাজ হাতে চরমনিদর্শন বলে মনে করা যেতে পারে।
কেবলমাত্র দরজা-জানালার পর্দাগুলোর কথাই বা বলি কেন? ঘরটার দেওয়ালগুলো বিশাল আর উচ্চতাও খুবই বেশি–বে-মানানও বটে। দেওয়ালগুলোর আগাগোড়া খুবই ভারি ও সুদৃশ্য শিল্পসমৃদ্ধ। যে সব জিনিসপত্র দিয়ে পর্দাগুলো তৈরি করা হয়েছে ঠিক একই জিনিস দিয়েই মেঝের গালিচাটাও তৈরি করা হয়েছে। আর একই মূল্যবান কাপড় দিয়ে গালিচাটাকে মোড়া হয়েছে তা দিয়েই বিছানার চাদোয়া, ঘাটের ঢাকনা আর পর্দার কুঁচি দেওয়ার কাজ সারা হয়েছে। আর এও বলে রাখা দরকার যে, বহুমূল্য জরির আর সুতো দিয়ে যে কাপড় বোনা হয়েছে। কেবলমাত্র জরি ব্যবহারের জন্যই নয়। কাপড়ের এখানে-ওখানে গাঢ় কালো রং দিয়ে আরবি শিল্পরীতির অনুকরণে বিভিন্ন নকশা ও ফুল-পাতা এঁকে অধিকতর দৃষ্টি নন্দন করে তোলা হয়েছে। আর নকশাগুলো বাস্তবিকই বৈচিত্র্যের দাবি করতে পারে। বিভিন্ন দিক ও কোণ থেকে দেখলে বিভিন্ন রকম দেখায়। ঘরে না পা দিয়েই সেগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে যেন বিচিত্র সব জীবজন্তুর ছবি। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, ঘরটার ভেতর দিকে যতই অগ্রসর হওয়া যাবে ততই যেন তাদের রূপ পরিবর্তিত হতে হতে ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে।
