আরও আছে, তার সমুন্নত ললাটও কম দৃষ্টিনন্দন ছিল না। সে দিকে মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরালেই মনে হত সম্পূর্ণ নিখুঁত।
সত্যি স্বীকার না করে পারা যায় না, এমন দেবীসুলভ রূপ লাবণ্য আর মহত্বকে বুঝি ভাষার মাধ্যমে যথাযথভাবে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। তার ত্বকের গাত্রবর্ণের বর্ণনা যদি দিতেই হয় তবে আমি প্রথমেই বলব, তার শুভ্রতা হাতির দাঁতের শুভ্রতাকেও দূরে ঠেলে দিত। আর মাথায় সুনিবিড় কৃষ্ণমেঘের মতো একগোছা কেশ তার ঘাড়ে এলিয়ে পড়ত। তারই দু-চারটা উন্নত ললাটের ওপর যখন আলতোভাবে দোল খেত তখন সে শোভা কী মনোলোভা দৃশ্যেরই না সঞ্চার করত! মহাকবি হোমার যাকে ‘হায়াসিন্থসম’ আখ্যা দিয়েছেন।
তার সুডৌল নাসিকার দিকে চোখ ফেরালে মনে হত এর সঙ্গে একমাত্র হিব্রুদের পদকের সৌন্দর্যের সঙ্গেই তুলনা চলতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি বাঁশির মতো এমন সুন্দর নাক অন্য কেউ দেখে থাকলেও আমার চোখে অন্তত পড়েনি।
আর তার সৌন্দর্যে ভরপুর মনোলোভা মুখমণ্ডলের দিকে মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়, স্বর্গের যাবতীয় সৌন্দর্যরাশি যেন তার মুখে একত্রে পুঞ্জীভূত করা হয়েছে। আহা! তার ওপরের ঠোঁটের সে অতুলনীয় বাকটা নিচের ঠোঁটের সে মনোলোভা সুপ্তি–সে তিলের স্বপ্নময় নীলা ও ছন্দময় বর্ণেও ভাষা, সুপবিত্র তুষারশুভ্র অত্যুজ্জ্বল দাঁতের পাটি দুটো আর ফুটন্ত ফুলের মতো প্রশান্ত হাসি বাস্তবিকই চমত্ত্বারিত্বের দাবি রাখে।
আর? হ্যাঁ, আরও আছে। তার চপল চাপল হরিণীর মতো আয়ত চোখ দুটো যথার্থই দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে। সব মিলিয়ে রূপসি তন্বী কুমারি তরুণি লিজিয়া ছিল আমার স্বপ্নরাজ্যের রাণী।
লিজিয়ার রূপ-সৌন্দর্যের কথা তো একটু-আধটু বললামই। এবার সে বিবরণ থেকে সরে এসে তার জ্ঞানের কথা যৎকিঞ্চিৎ বলছি। তার জ্ঞানের গভীরতার কথা সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়–তার পাণ্ডিত্য ছিল যথার্থই অগাধ। পাণ্ডিত্যের এমন ব্যাপ্তি, এমন গভীরতা অন্য কোনো নারীর মধ্যে আজ পর্যন্ত লক্ষিত হয়নি। প্রাচীন ভাষার ওপর তার দখল ছিল অপরিসীম।
ইউরোপীয় আধুনিক ভাষা সম্বন্ধে আমার যতদূর জানা আছে তার ওপর নির্ভর করে বলতে পারি, কথাবার্তা বলতে গিয়ে সে কোথাও, কোনোদিন এতটুকুও ভুল করেছিল এমন কথা আমার কানে অন্তত লাগেনি। মিষ্টি মধুর সুরেলাকণ্ঠে সে যখন, যে ভাষাতেই কথা বলত আমি শুনে যারপর নাই মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। মোদ্ধা কথা, সে যতদিন আমার সান্নিধ্যে কাটিয়েছে ততদিন আমি সহধর্মিনীর বিদ্যা-বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, তার বিদ্যা-বুদ্ধির কথা মনে পড়লে আরও আমি ভাবাপ্লুত হয়ে পড়ি।
কিন্তু হায়! বছর কয়েক কাটতেই দেখলাম আমাকে আশাহত করে, হতাশা আর হাহাকারের সমুদ্রে ভাসিয়ে সে জীবনের ওপাড়ে চলে গেল। তখন কী যে অন্তহীন ব্যথা-বেদনা আমার বুকটাকে ভেঙে টুকরো করে দিল তা আমার পক্ষে ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়।
সত্যি বলছি, আমার প্রেয়সী লিজিয়ার অবর্তমানে আমি অন্ধকারে পথ-হারিয়ে ফেলা শিশুর মতো হয়ে গেলাম। আমি যেন তার সজীব উপস্থিতি, তার সুপরিচিত সুরেলা কণ্ঠস্বর নতুন করে বার বার অনুভব করতে আরম্ভ করলাম।
চোখের সামনে যখনই আমি কোনো পুস্তিকা ধরি, তার পাতায় অলস চোখের মণি দুটোকে ভুলাতে চেষ্টা করি তখন প্রতিটা ছত্রে ছত্রে তার অনিন্দ্য সুন্দর অনাবিল হাসিমাখা মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
লিজিয়া ব্যাধির শিকার হয়ে বিছানা আশ্রয় করল। তার চোখের মণি দুটো আগের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে পড়ল।
এসেই তার চেহারার পরিবর্তন ঘটতে লাগল। ফ্যাকাশে বিবর্ণ আঙুলগুলোতে কোনো অদৃশ্য তুলির টান যেন মোম রঙের প্রলেপ দিয়ে ছিল। সমুন্নত ললাটের নীলচে শিরাগুলো প্রতিটা আবেগের সঙ্গে যেন বার বার ওঠা নামা করতে লাগল।
আমি তার বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকা দ্রুত পরিবর্তনশীল শরীরটার দিকে নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে থেকে বারবার ফুসফুস নিঙড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার পরিণতির কথা উপলব্ধি করতে পারলাম, মৃত্যু তার শিয়রে দাঁড়িয়ে।
খুবই সত্যি যে, তার সান্নিধ্যে নিতান্ত ঘনিষ্ঠভাবে বছর কয়েক কাটিয়ে যতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, মৃত্যুর প্রতি তার ভীতি নেই। মৃত্যুকে সে তিলমাত্রও ভয় কওে
। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এ ব্যাপারে তার সম্বন্ধে যে ধারণা আমি এতদিন অন্তরে পোষণ করেছি তা আদৌ সত্যি নয়, বরং সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আজ সে মৃত্যুর ছায়ার সঙ্গে যে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তা ভাষায় বর্ণনা করা বাস্তবিকই সাধ্যাতীত। চোখের সামনে যে করুণ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরে ফুসফুস কুঁকড়ে যাবার জোগাড় হত। আমি আর্তনাদ করে উঠতাম। আমি একটু অনুকূল মুহূর্ত পেলেই সমবেদনা প্রকাশ করতাম, তাকে সান্তনা দিতাম, বহুভাবে বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করতাম।
আমার প্রবোধ-বাক্যকে তিলমাত্র মূল্য না দিয়েই সে জীবনের জন্য বেঁচে থাকার জন্য এমন তীব্র আকাঙ্খ প্রকাশ করত, যা কানে যাবার আমার প্রবোধ বাক্য এবং যুক্তিগুলো উভয়কেই সমান মূর্খতা বোধ হত। আর এও মনে হত, এতক্ষণ আমি যা কিছু বলে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছি তা নিছকই ছেদো কথা ছাড়া কিছু নয়।
