আমাকে নীরব দেখে তিনি এবার ম্লান হেসে বললেন–শোন বাবা, নাসিকা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা ও জ্ঞানার্জনই এখনও তোমার জীবনের লক্ষ্য।
হুম! আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম।
বাবা এবার একটু বেশ রাগত স্বরেই বললেন–কিন্তু তুমি নির্বাচকের নাকে আঘাতের মাধ্যমে তোমার জীবনের লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে গেছ।
আমি নীরব চাহনি ঠেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তিনি বলে চললেন–আমি স্বীকার করছি, তোমার একটা চমৎকার নাক আছে। কিন্তু ব্লাডেননাফ-এর কথাটা একবার ভেবে দেখ তো, তার তো নাক বলে কোনো বস্তুই নেই। তার নাকটা কী দাঁড়াল? সবাই তোমার কাজের জন্য সমস্বরে ছিঃ! ছিঃ! করল। আর ব্লাডেননাফ দুম করে আজকের নায়ক বনে গেল, ঠিক কি না?
হুম!
তিনি এবার বললেন- বাছা, আমি স্বীকার করছি, ফু-ফুজ নগরে একটা সিংহের শ্রেষ্ঠত্বও মহত্বের বিচারের মাপকাঠি হচ্ছে তার নাক। অর্থাৎ তার নাকটা কতখানি খাড়া আর চোখা তাই হচ্ছে বিচারের মাপকাঠি,হায় ভগবান!
আমি কি বলব সহসা স্থির করতে না পেরে মুখে কুলুপ এঁটেই দাঁড়িয়ে রইলাম।
বাবা পূর্বপ্রসঙ্গের জের টেনে বললেন–শোন বাছা, আমি বলতে চাইছি, যে সিংহের নাকই নেই তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা চলে কী?
আমি তার মুখের দিকে বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
লিজিয়া
শতকরা একশো ভাগ সত্যি বলছি, একটা বর্ণও বা নিয়ে বলছি না, ঠিক কোথায় বা কখন লেডি লিজিয়া-র সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয় হয়েছিল তা এখন আর আমি মনে করতে পারছি না।
তারপর এক দুই করে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। ইতিমধ্যে অনেক দুঃখ যন্ত্রণায় আমার স্মৃতিশক্তি স্তিমিত হয়ে গেছে। কোনো কথাই আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে না।
অথবা হয়তো এসব কথা যে আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে না তার প্রকৃত কারণ আমার মনের মানব প্রেয়সীর চরিত্র, তার অতুলনীয় পাণ্ডিত্য, তার শান্ত, মনোলোভা রূপ সৌন্দর্য এবং তারনিচু অথচ সুরেলা কণ্ঠের ভাষার যাদু এমনই ধীরে মন্থর গতিতে আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করেছিল যে, সে সবকিছুই গোপন অন্তরালে এবং অজানা-অচেনাই রয়ে গেছে। আজ আমি একটা বর্ণও স্মৃতির পাতায় টেনে আনতে পারছি না।
তবুও আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি তার সঙ্গে আমার প্রথম আর তারপর থেকেই রাইন নদীর অদূরবর্তী একটা বড়, পুরনো ও দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চালা নগরে দেখা সাক্ষাৎ হত।
আমাদের মধ্যে বহু কথাই হত কিন্তু তার পরিবার সম্বন্ধে কোনো কথাই আমি তার মুখ থেকে কোনোদিনই শুনতে পাইনি। তবে সে যে বহু প্রাচীন এক বংশদ্ভুতা এ বিষয়ে আমার অন্তরে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই।
লিজিয়া। আমার লিজিয়া! আমার প্রাণ-প্রেয়সী লিজিয়া!
সত্যি কথা বলতে কি, আমি পুঁথিপত্রের পাতায়, পড়াশুনার মধ্যে এমন গভীরভাবে ডুবে গিয়েছিলাম যার ফলে বাইরের জগত্তার অস্তিত্বের কথা আমার মন ধুয়ে মুছে গিয়েছিল।
লিজিয়া। লিজিয়া’ এ মিষ্টি মধুর নামটার জন্যই সে আজ আর ইহলোকে নেই কল্পনার সাহায্যে তারই মুখটা আমার চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলি।
আর আজ, তার স্মৃতিচারণ করতে বসে, লেখা শুরু করতে গিয়ে বার বার একটা কথাই আমার স্মৃতির পটে ভেসে উঠছে, সে ছিল আমার অন্তরতমা, বন্ধু আর বাগদত্তা, যে আমার প্রতিদিনের পাঠসঙ্গিনী, আর শেষপর্যন্ত আমার প্রিয়তমা সহধর্মিনী। কিন্তু, কিন্তু তার পৈত্রিক নামটাই কোনোদিন আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। আমি নিজে কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি, আর সে-ও কোনোদিন মুখ ফুটে আমাকে বলেনি। কেন? এটাকে কি আমার প্রেয়সী লিজিয়ার খেয়াল বলেই মনে করব? অথবা এ ব্যাপারে তাকে আমি কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করি না, আমার প্রেমের গভীরতার পরীক্ষা করাই কি তার উদ্দেশ্য ছিল? তা যদি না-ই হয় তবে এটা নিছকই আমার একটা খেয়াল ছাড়া কিছু নয়–প্রেমের ব্যাপারে আমার এক নির্ভয় রোমাঞ্চকর আত্মনিবেদন?
আমার অন্তরের গভীরে একমাত্র সে ঘটনার কথাই মোমবাতির শিখার মতোই টিমটিম করে জ্বলছে–খুবই ঝাপসা মনে আছে, ব্যস। অস্পষ্টভাবে মনে আছে, এর বেশি কিছু শত চেষ্টা করেও স্মৃতিতে আনতে পারি না। প্রেমের প্রথম সূচনা কখন, কিভাবে যে ঘটেছিল তা আমার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুছে গেছে–তাতে অবাক হবার তো কিছু নেই। বরং এটাকেই স্বাভাবিক বলেই মনে নেওয়া যেতে পারে।
তবে একটা কথা, একটা প্রিয় ঘটনা কিন্তু আমার স্মৃতি থেকে আজও ধুয়ে মুছে যায়নি। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে আজও যা জাগরিত আছে, সেটা কী? তার চেহারাটা যেন আজও আমি চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পাই।
লিজিয়া ছিল দীর্ঘাঙ্গিনী আর একহারা। আর শেষের দিকে সামান্য ক্ষীণদেহী হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু তার শান্ত সৌম্য সরলতা আচরণের মাহাত্মের কথা অথবা তার ধীর-স্থির নমনীয় হাঁটা চলার বিবরণের ব্যর্থ প্রয়াস থেকে আমি বিরত থাকতে চাইছি। তবে এটুকু না বলে পারছি না, তার চলাফেরা-আসা-যাওয়া যেন নিতান্তই একটা ছায়া ছাড়া কিছু নয়।
তারনিটোল তুষার শুভ্র বাহুপল্লবটা আমার কাঁধের ওপর আলতোভাবে রেখে কোকিলের মতো মিষ্টি-মধুর স্বরে আমার নাম ধরে যতক্ষণ সমোধন না করত ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অনুভবই করতে পারতাম না আমার ঘরে তার আগমন ঘটেছে। তার মুখাবয়বের মনোলোভ রূপ লাবণ্য? এক কথায় তার ব্যাখ্যা করলে বলতে হয়, বাস্তবিকই অনন্য। অন্য কারো মুখের সঙ্গে তুলনাই চলে না। রূপ-সৌন্দর্যের আকর আমার প্রেয়সী যেন দেবীসুলভ অতুলনীয় মহিমা নিয়ে বিরাজ করত। তার আত্মিক সৌন্দর্যের মহিমা ছিল যথার্থই দেবীসুলভ।
