নিজের সুখ-ভোগ ছাড়া বোঝেন না এমন চরিত্রের রাণী পরদিন আমার বাসার দরজার এলেন। উদ্দেশ্য, আমার সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তা বলবেন।
আমি সাদর অভ্যর্থনার সঙ্গে রাণীকে বসতে দিলাম। লক্ষ্য করলাম, রানি ভাবাবেগে আপ্লুত।
এক সময় তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার থুতনিতে আলতোভাবে একটা টোকা দিয়ে আবেগ মধুর স্বরে বলে উঠলেন–ওহে সুন্দর যুবা পুরুষ, আমার একটা অনুরোধ রাখবে?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম। তিনি বললেন–তুমি কী একবারটি আলমাক-এ যাবে? আমি বললাম–যাব, অবশ্যই যাব।
তিনি উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে না পেরে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন– ওগো সুন্দর, যাবে–তুমি যাবে?
যাব, অবশ্যই যাব।
যাবে? ওই নাকটাসহ যাবে তো?
আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলাম–ঠিক যেমন আছি, সে ভাবেই যাব।
কথা দিচ্ছ?
হ্যাঁ, কথা দিলাম।
তবে এই আমার কার্ড ধর।
আমি হাত বাড়িয়ে তার কাছ থেকে কার্ডটা নিলাম।
রাণী এবার তার আয়ত চোখ দুটো তুলে আমার নাকটার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললেন–ওগো সুন্দর, আমি কি তবে বলতে পারি তুমি যাবে?
মাননীয়া রাণী, আমি কথা দিচ্ছি, আমি সারা অন্তর নিয়ে সেখানে উপস্থিত হব।
আরে না না, সেটি হচ্ছে না।
আমি বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তার মুখের দিকে তাকালাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বললেন–না সুন্দর, সারা অন্তর নিয়ে গেলে তো চলবে না।
তবে?
তোমাকে যেতে হবে সম্পূর্ণ নাক নিয়ে, বুঝলে সুন্দর?
প্রিয়তমা আমার, কথা দিচ্ছি, নাকের প্রতিটা অংশ নিয়েই আমি সেখানে উপস্থিত হব।
আমি নাকটাকে ধরে দু-একবার মোচড় দিয়েই আমাক-এ রাণী সাহেবের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে তার বাড়ির সদর দরজায় হাজির হয়ে গেলাম।
বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে বৈঠকখানা পর্যন্ত লোক গিজগিজ করছে। কার বাপের সাধ্য বৈঠকখানার দিকে এক পা এগোয়।
বাড়ির সিঁড়ি থেকে একজন আমাকে দেখতে পেয়েই চেঁচিয়ে বলে উঠল–ওই, ওই যে, তিনি আসছেন। ওই, ওই তো, তিনি এসে গেছেন।
তিনি এসে গেছেন, সিঁড়ির আর এক ধাপ উঠেই অন্য আর একজন গলা ছেড়ে বলে উঠল। তারও ওপরের ধাপ থেকে আর একজন চেঁচিয়ে উঠল–ওই তো তিনি এসে গেছেন। আসছেন নয়? এসেই গেছেন।
এবার ভিড়ের মধ্য থেকে রানির উল্লাস-ধ্বনি শোনা গেল–এসেছে! ওই, ওই তো, আমার ভালোলাগা মানুষটা এসে গেছেন। ওই তো।
রাণীর পরের কথাগুলো আর শোনা গেল না, সমবেত জনতার কণ্ঠস্বরে চাপা পড়ে গেল।
রাণী এবার ভিড় ঠেলে উভ্রান্তের মতো এগিয়ে এসে আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে আমার খাড়া চোখা নাকটায় পর পর তিনবার চুমু খেলেন। আমাকে সাধ্যমত দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে নিয়ে আবেগ মধুর স্বরে বলতে লাগলে আমার মনের মানুষ, প্রিয়তম আমার!
ব্যস, এবার হৈ হট্টগোল আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল। এক একজন গলা ছেড়ে নানারকম মন্তব্য করতে লাগল। মন্তব্য বলতে কটুক্তি। পি, পি আর পি না।
শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে, ব্লাডনলারের নির্বাচক পর্যন্ত সংযত থাকতে পারল না। নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে অশ্লীল অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে গালমন্দ করতেও দ্বিধা করল না।
আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না। সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলাম। চিৎকার চ্যাঁচামেচি জুড়ে দিলাম।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেল যে, নিজেকে সামলে রাখাই আমার পক্ষে দায় হয়ে পড়ল। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি ব্লাডেনাফ-এর নির্বাচকের দিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেলাম। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে তর্জন গর্জন শুরু করলাম–দ্যুৎ ভাই! আপনি একটা অপদার্থ! একটা বাঁদর ছাড়া আপনাকে সম্বোধন করা যায় না।
শেষমেশ যা হবার তাই হলো। আমরা উভয়ে পরস্পরের মধ্যে কার্ড বিনিময়। করলাম। কারো পক্ষেই ক্রোধ সম্বরণ করা সম্ভব হলো না। উভয়ের মাথায়ই খুন চেপেই রইল।
স্থির হল, পরের সকালে চক-গোলাবাড়িতে আমরা পরস্পরের মুখোমুখি হব। সেখানেই আমাদের মোকাবেলা হবে। আমরা পরস্পরের প্রতি গায়ের ঝাল মিটিয়ে। ছাড়ব; মোদ্দা কথা, বদলা নেব।
পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা পরস্পরের প্রতি প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চক গোলাবাড়িতে হাজির হলাম।
আমি তার মুখোমুখি হওয়ামাত্র এমন মোক্ষম এক ঘুষি মারলাম, যার ফলে তার নাকটা থেঁতলে গেল। উচিত শিক্ষা দেওয়া যাকে বলে।
চক গোলাবাড়ি থেকে বেরিয়ে আমি বন্ধুদের কাছে হাজির হলাম।
আমাকে দেখেই প্রথম বন্ধু বলে উঠল–আহাম্মক কাঁহাকার।
দ্বিতীয় বন্ধু বলল–বোকা! নিরেট বোকা!
তৃতীয় বন্ধু বলল–একটা আস্ত অপদার্থ!
চতুর্থ বন্ধু বলল–গাধা! গাধা কোথাকার!
পঞ্চম বন্ধু রাগে গম গম করতে করতে বলল–একটা ক্যাবলা!
ষষ্ঠ বন্ধু বলল–মাথায় গোবর ভর্তি!
সপ্তম বন্ধু গর্জে উঠল–দূর হয়ে যা!
বন্ধুদের কথাগুলো শুনে রীতিমত থ বনে গেলাম। মর্মাহতও কম হলাম না। আমি রীতিমত মুষড়ে পড়লাম।
মনমরা হয়ে আমি গুটিগুটি বাবার কাছে হাজির হলাম। আমাকে গোমড়া মুখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাবা বেশ নরম সুরেই বললেন–কী বুঝলে বাছা?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে ফ্যা ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
