খবরের কাগজগুলোও ব্যাপারটাকে নিয়ে মাতামাতি জুড়ে দিল।
কোয়ার্টারলি পত্রিকার পাতায় ছাপা হল–কী আশ্চর্য প্রতিভা।
ওয়েস্ট মিস্টার লিখল–উন্নত মানের শরীরতত্ত্ববিদ।
ফরেনার পত্রিকা লিখল–সাহসি লোক সন্দেহ নেই।
এডিনবরা পত্রিকার পাতায় ছাপা হল–ভালো, ভালো লেখক বটে!
ডাবলিন পত্রিকা লিখল–গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তি বটে।
বেস্টলি পত্রিকা মন্তব্য করল মহামানব! মহামানব!
ফ্রেজার পত্রিকার পাতায় ছাপা হলো ঈশ্বরপ্রেরিত মহামানব!
ব্লাউড পত্রিকার পাতা ছাপা হল–আমাদেরই এক ব্যক্তি! মিসেস বাস-ব্লু মন্তব্য করল–কে? কে লোকটি? মিস ব্লাস ব্লু মন্তব্য করল–লোকটির পেশা কী?
আমি কিন্তু এসব মন্তব্যে কর্ণপাতই করলাম না। আমি এ-ব্যাপারে কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে, কোনোরকম মন্তব্য না করেই এক শিল্পীর দোকানে ঢুকে। গেলাম।
শিল্পীর স্টুডিওতে পা দিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, দেশের আত্মসুখ ছাড়া কিছু বোঝে না এমন রাণী নিজের প্রতিকৃতি আঁকাবার জন্য শিল্পীর সামনে একটা চেয়ারে ঠায় বসে রয়েছেন।
আর? আর রাণীরই কাছাকাছি অমুক দেশের জমিদার মশাই একটা চেয়ার দখল করে বসে। তার কোলে বসে রাণীর পোষা প্রিয় কুকুরটা কুঁৎ-কুঁৎ আওয়াজ করছে।
এ দেশ ও দেশের বাবু সাহেবটি তার মুখোমুখি চেয়ারে বসে প্রভাব-প্রতিপত্তির সঙ্গে মৌজ করে গল্প জমিয়েছেন। আর দেশের রাজা মশাই রাণীর চেয়ারের কাছে, তার ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
আমি দুপা এগিয়ে শিল্পীর কাছাকাছি, মুখোমুখি দাঁড়ালাম। তাঁর দিকে নাকটাকে বাড়িয়ে দিলাম।
রাণী আমার নাকটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে সবিস্ময়ে বলে উঠলেন–চমৎকার! আহা, কী চমৎকার!
জমিদার মশাই ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন–আহা! আহা!
বাবু সাহেবটি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন–উফ্! ভয়ানক! ভয়ানক!
রাজা মশাইও মুখ বুজে থাকতে পারলেন না। তিনি মুখ বিকৃত করে উচ্চারণ করলেন–ইস্, ঘেন্নায় বাঁচি না!
শিল্পী ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-এর জন্য কী পরিমাণ অর্থ নেব?
রাণী গলা ছেড়ে বলে উঠলেন–নাক, নাকের জন্য!
আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। তারপর বললাম—
এক হাজার পাউন্ড, কী বলেন?
চমৎকার! চমৎকার! শিল্পী ভাবালুতকণ্ঠে বলে উঠলেন।
এক হাজার পাউন্ড, কী বলেন? আমি আবারও বললাম। শিল্পী এবার আমার খাড়া ও চোখা নাকটাকে আলোর দিকে ফিরিয়ে ভালোভাবে দেখে নিয়ে বললেন– এক হাজার পাউন্ড? আপনি কথা দিচ্ছেন তো মশাই?
আমি আচ্ছা করে নাকটাকে ঝেড়ে নিয়ে বললাম–হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি এক হাজার পাউন্ড।
শিল্পী নাকটার দিকে তার হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তারপর নাকটার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন–এটা পুরোপুরি আসল তো?
আমি নাকটাকে একদিকে বাঁকিয়ে নিয়ে বলাম–হ্যাঁ।
শিল্পী এবার চোখের সামনে অনুবীক্ষণ যন্ত্রটাকে ধরে, নাকটাকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিরীক্ষণ করে নিয়ে বলেন–একটা কথা–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম–বলুন, কী জানতে চাইছেন?
জানতে চাইছি, নাকটার কোনো অনুকৃতি নেই তো?
অনুকৃতি?
হ্যাঁ, কোনো অনুকৃতি নেই তো?
ধুৎ ভাই! কি যে বলেন, একটাও না।
শিল্পী এবার চোখ দুটো কপালে তুলে সবিস্ময়ে বলে উঠলেন–বাঃ! কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য!
এক হাজার–এক হাজার পাউন্ড। আমি বললাম।
এক হাজার পাউন্ড? শিল্পী বলল।
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। এক হাজার পাউন্ড বটে।
এক হাজার পাউন্ড? শিল্পী আবারও বললেন।
হ্যাঁ, পুরোপুরি ঠিক। আমি তার কথার জবাবে বললাম।
বহুৎ আচ্ছা! তা-ই পাবেন। কী আশ্চর্য! কী অভূতপূর্ব বিস্ময়কর কলাকৌশল!
ব্যস, আর এক মুহূর্তও দেরি না করে শিল্পী দেরাজ থেকে একটা চেকবই বের করলেন। একটা পাতায় খসখস করে লিখে ফেললেন। এবার বই থেকে চেকটা ছিঁড়ে আমার হাতে তুলে দিলেন। তারপর ইজেলে সাঁটা ক্যাম্পাসের গায়ে আমার নাকের একটা রেখাচিত্র এঁকে নিলেন।
আমি জেরমিন স্ট্রিটে একটা বাসা ভাড়া করলাম। তারপর নাসিকা-বিজ্ঞান-এর নিরানব্বইতম সংস্করণটাকে লোক মারফৎ রাণীর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। কেবলমাত্র বইটাই নয়, সে সঙ্গে নাকের ডগার একটা প্রতিকৃতি পাঠাতেও ভুললাম না।
ওয়েলসের যুবরাজের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেলাম। তিনি বিভিন্নভাবে অনুরোধ করে আমাকে একবারটি তার বাড়িতে যেতে বলেছেন।
আমি যুবরাজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে তার বাড়ি হাজির হলাম। তার বৈঠকখানায় পা দিয়ে দেখলাম, বিভিন্ন দিক আর বহু দেশ থেকে মহা মহা পণ্ডিত ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা তার বৈটকখানায় জড়ো হয়েছেন।
আমি উপস্থিত হবার পর গৃহকর্তা যুবরাজ সাদর অভ্যর্থনা করে আমাকে বসতে দিলেন। উপস্থিত জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা নিজ নিজ বিষয়ের ওপর জ্ঞানবুদ্ধি অনুযায়ী জ্ঞান-গম্ভীর রোমহর্ষক বক্তব্য পেশ করলেন।
আর আমি? আমি নিজের কথা, নিজের কথা, নিজের কথা, আমার নাসিকা বিজ্ঞানে আলোচিত বিষয়ের কথা আমার নিজের মতামত আর বইয়ের বক্তব্য।
তারপর আমার খাড়া ও চোখা নাকটাকে উঁচিয়ে আমি আবারও আমার নিজের বক্তব্যই বহুবার, বহুভাবে ব্যক্ত করলাম।
যুবরাজ উচ্ছ্বসিত আবেগে সঙ্গে বলে উঠলেন–আশ্চর্য পণ্ডিত ও বিচক্ষণ মানুষ বটে।
বাঃ! চমৎকার! চমৎকার! উপস্থিত অতিথি-অভ্যাগতরা সমস্বরে বলে উঠলেন।
