কি বলছেন, অসম্ভব? গাঁজাখুরি? যে, যা বলেন।
লিওনাইসিং
আমি?
আমি একজন, মানে আমি ছিলাম, মহামানব।
তবে আমি কিন্তু জুলিয়াস নামক গ্রন্থের রচয়িতা নই, আবার আমি একজন মুখোশধারীও নই। কেন? কারণ এটাই যে, আমার নাম রবাট জোন্স।
আর আমার জন্মস্থল? ফু-ফুজ নগরের কোনো একস্থানে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম। অতএব সে স্থানটাকেই তো আমার জন্মস্থান বলে ধরতে হবে।
আমি জীবনে যত কাজ করেছি তার মধ্যে প্রথম ও সবচেয়ে বড় কাজটার কথা বলছি, সে কাজটা হচ্ছে, নিজের নাকটাকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরে রাখা।
আমার নাক চেপে ধরার কাজ দেখে আমার মা বলতেন, আমি বাস্তবিকই একটা প্রতিভা।
আমার মায়ের কথা তো বললাম, এবার বলছি আমার বাবার কথা। আমাকে সর্বদা দুহাত দিয়ে নাকটা চেপে ধরে রাখতে দেখে আমার বাবা আনন্দ উচ্ছ্বাসে চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে একটা নসলজি বই উপহারস্বরূপ দিয়েছিলেন।
আমার যখন জাঙ্গিয়া পরার বয়স হয়নি তখনই আমি সে বিদ্যা; অভ্যাসও বা চলে আমি রপ্ত করে নেই।
এদিকে বিজ্ঞানচর্চা অব্যাহতই রইল। আমি কদিনের মধ্যেই নাকের ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা করে নিতে পারলাম। আমি বুঝতে পারলাম, খুব খাড়া আর চোখা একটা নাকের মালিক হলে তার জন্যই কোনো একজন সিংহের মর্যাদায় উন্নীত হয়ে যেতে পারবে, অর্থাৎ পশুরাজের সমান মর্যাদার অধিকারী হতে সক্ষম হবে।
তবে এও খুবই সত্য যে, আমার মনোযোগ কেবলমাত্র বইপত্রের জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকল না।
আমি অধিবিদ্যাকে কাজে লাগাতে এতটুকুও ত্রুটি রাখিনি। প্রতিদিন সকালে দু-দুবার করে আমার লম্বা নাকের ডগাটাকে আচ্ছা করে টেনে দিতে আরম্ভ করলাম। শুধু কি এই? নাকের ডগাটাকে টানার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি সকালে দু ঢোক করে মদ উদরস্থ করতে লাগলাম।
এভাবে আমার দিন কাটতে লাগল।
বয়স বাড়তে বাড়তে এক সময় বড় হলাম, মানে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষে পরিণত হলাম।
আমি বড় হলে একদিন বাবা আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে যেতেই তিনি আমাকে নিয়ে তার পড়ার ঘরে গেলেন।
আমি তার সঙ্গে পড়ার ঘরে হাজির হলে, উভয়ে মুখোমুখি চেয়ারে বসলাম।
বাবা তার চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, বাছা, তোমার কাছ থেকে একটা কথা শোনার জন্য এখানে নিয়ে এখানে তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।
আমি বললাম বলুন–কি জানতে চাইছেন?
তোমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য কী?
আমি তার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বললাম–নসলজি।
নসলজি?
হ্যাঁ।
নসলজিটা কী রবার্ট?
না, নসলজি, মানে নাসিকা-বিজ্ঞান
আমি আর একটা কথা তোমার কাছ থেকে জানতে চাইছি।
বলুন, আপনার এবারের জিজ্ঞাস্য কী?
বল তো, নাক বলতে কী বোঝায়?
শুনুন বাবা, প্রায় হাজার খানেক লেখক নাকের আলাদা আলাদা সংজ্ঞার অবতারণা করেছেন।
কথা বলতে বলতে আমি কোটের পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। তারপর আবার বলতে আরম্ভ করলাম এখন দুপুর বা তার কাছাকাছি।
আমার বাবা প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলেন হুম।
আমি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বললাম–এখন প্রায় দুপুর। এখন যদি আমি সব লেখকের সংজ্ঞা এক-এক করে বলতে শুরু করি তবে রাত দুপুর হয়ে যাবে।
হুম।
শুনুন তবে, লেখক বার্থোলিনাস যা বলেছেন তা হচ্ছে, নাক হচ্ছে মুখের সে স্ফীত অংশ, সে আঁব, সে অতিকায় আঁচিল আর সে
আমার বাবা থামিয়ে দিয়ে বললেন–থাক, থাক। রবার্ট, আর বলতে হবে না, ঢের হয়েছে। তোমার জ্ঞানের গভীরতার পরিচয় পেয়ে আমি স্তম্ভিত। মাথায় বাজ পড়ার জোগাড়। আমার বুকের ভেতরে ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেছে।
কথা বলতে বলতে তিনি বুকের ওপর হাত দুটো রেখে চোখ দুটো বন্ধ করলেন। তারপর আবার মুখ খুললেন–
এসো, চলে এসো।
পরমুহূর্তেই তিনি খপ করে আমার হাত দুটো চেপে ধরে বললেন–শোন, আমি মনে করছি, তোমার শিক্ষালাভ সমাপ্ত হয়েছে। তোমাকে এবার নিজের রাস্তা বেছে। নিতে হবে। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বাবার মুখের দিকে তাকালাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলতে লাগলেন–তোমাকে নিজের পথ দেখতে হবে। নাক বরাবর এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তোমার অন্য কোনো গতি নেই।
আমি সবিস্ময়ে তার দিকে তাকালাম। কিছু বলার জন্য সবে মুখ খুলতে যাব, কিন্তু আমাকে সে সুযোগ না দিয়েই তিনিই তোতলাতে আরম্ভ করলেন–তাই, তাই বলছি কী, বলছি কী, কথা বলতে বলতে তিনি আমাকে এক লাথি মেরে সিঁড়ি থেকে একেবারে বাইরে বের করে দিলেন। তিনি তর্জন-গর্জন করতে করতে বললেন অতএব হতচ্ছাড়া! বেরিয়ে যাও; পরম পিতা তোমার সহায় হোন!
আমি এবার লাথির চোটে সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে একেবারে শেষ ধাপটা অতিক্রম করে তবে নামতে পারলাম।
ঠিক তখনই আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে পরমপিতার প্রত্যাদেশ পেলাম।
এ আকস্মিক দুর্ঘটনাটাই আমার কাছে অভিসম্পাত থেকে আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে দাঁড়াল।
আমি সিঁড়ির কাছে বসেই মনস্থির করে বসলাম, বাবারনিদের্শ মাথা পেতে নিয়েই কাজ করব। হ্যাঁ, আমি নাক বরাবরই এগিয়ে যাব। সেখানে দাঁড়িয়েই আমি হাত দিয়ে বার দুই নাকটাকে টানলাম।
ব্যস, আর দেরি না করে আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়লাম। নাসিকা-বিজ্ঞান সম্বন্ধে একটা বই লিখে ফেললাম।
আমার লিখিত বইটকে নিয়ে সারা ফু-ফুজ নগরে রীতিমত হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড শুরু হয়ে গেল।
