কফিনগুলোতে কি দেখলাম? একটা কফিনে দেখতে পেলাম, হাতির দেহের মতো ইয়া বড় একটা দশাসই চেহারা। কোনো মানুষ যে এমন দীর্ঘ আর স্থূল দেহের অধিকারী হতে পারে, আগে জানা ছিল না। ব্যস, তার হাতির মতো বিশাল দেহটার অসহায়তার কথা উল্লেখ করে আমি ফাস ফাঁসে গলায় দীর্ঘ একটা ভাষণ দিয়ে দিলাম। ধারে কাছে কেউ থাকল আর না-ই বা থাকল, শ্রোতারই বা দরকার কি? ভাষণে একটা কথাই আমি বারবার বললাম–বাপধন, জীবদ্দশায় ইয়া পেল্লাই দেহটা নিয়ে কী কষ্টই না তোমাকে পোহাতে হয়েছে। আজ তোমার বিশ্রাম–স্বস্তি।
এবার দুপা এগিয়ে অন্য আর একটা কফিনের ডালা ভেঙে দেখলাম, তালগাছের মতো ধিঙ্গি আর তেমনই মোটাসোটা একটা মড়া এলিয়ে পড়ে রয়েছে। তার নাকের ছিদ্র দুটোয় আঙুল সিঁধিয়ে দিলাম। তারপর সজোরে একটা হ্যাঁচকা টান মেরে বেচারা মড়াটাকে বসিয়ে দিলাম। হতচ্ছাড়াটা বার বার কলাগাছের মতো কাৎ হয়ে পড়ে যেতে চাইল। কফিনের গায়ে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিলাম।
এবার ভাষণের পালা। আগের মতোই ফ্যাসফ্যাসে গলায় তার কিম্ভুতকিমাকার চেহারাটা নিয়ে জুতসই একটা ভাষণ দেবার চেষ্টা করতে অত্যাশ্চর্য একটা কাণ্ড ঘটে গেল–
হতচ্ছাড়া মড়াই দুম করে হাত দুটো তুলে এনে যন্ত্রচালিতের মতো মুখের বাধন আলগা করে ফেলল। এক ঝটকায় পটিটা খুলে ফেলল।
ব্যস, আর যাবে কোথায়! তারপরই আমার কাছা খুলে দেবার–চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে আরম্ভ করল।
ভাই, কি আর বলব, ফাঁসফেঁসে গলায় আমি যতবার, যতভাবে প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করছি, ততবারই খেঁকিয়ে, জোরসে ধমক দিয়ে আমার মুখ বন্ধ কওে দিয়েছে। আজব কাণ্ড! আমাকে টু-শব্দটিও করতে দিল না।
তার সবচেয়ে বড় আপত্তি, আমি কেন তার নাকের ছিদ্রের মধ্যে আঙুল সিঁধিয়ে দিয়েছি। বাজখাই গলায় খেঁকিয়ে উঠল–আর কত অত্যাচার আমার ওপর চালানো হবে, জানতে চাই। পরমুহূর্তেই যখন আমাকে মি. নিশ্বাস বলে মস্করা করতে লাগল, তখনই আমার মধ্যে প্রবল সন্দেহের উদ্রেক ঘটল।
সে জোরদার বক্তৃতা শুরু করল। আমি উকর্ণ হয়ে তার বক্তৃতার পরবর্তীঅংশ শুনতে লাগলাম। এখানে বলে রাখা দরকার, যদিও আমার কান দুটো অনেক আগেই কেটে হেঁটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে তবু শল্য চিকিৎসকের অপার করুণায়, তার লকলকে ছুরিটার কল্যাণে আমার শ্রবণেন্দ্রিয় অনেক, অনেক বেশি কর্মক্ষম হয়ে পড়েছিল।
তার কথাবার্তায় কি বুঝতে পারলাম, বলুন তো? পারলেন না তো? আমার গিন্নির মন পাওয়ার জন্য সোহাগ করে যে নচ্ছারটা জিনিসপত্র দিয়েছিল–এ হচ্ছে সেই উদারহৃদয় মহাপ্রভু মি. উইনডেনান্ড! রাগে আমার সর্বাঙ্গ রি রি করে করে উঠল।
আমি যখন অভিধান বহির্ভূত বাছাবাছা শব্দ ব্যবহার করে আদরের বউটাকে মুখঝামটা দিচ্ছিলাম, শয়তানটা তখন খোলা-জানালার আড়ালে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে সবকিছু শুনছিল আর রাগে আমার ওপর অগ্নিশর্মা হয়ে উঠছিল।
ফুসফুস নিঙড়ে আমার সবটুকু দম বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোটাই গলগল করে তার ফুসফুসে ঢুকে আটকে রয়েছে!
ব্যস, তারপর থেকেই সে তড়পাতে শুরু করেছে। কিন্তু হায়! আটকে যাওয়া বাতাস আর ফুসফুস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে না।
সে অনবরত বক বক করেই চলল। মুখ দিয়ে যেন খই ফুটছে। প্রতিবেশিদের পক্ষে আর কাহাতক ধৈর্য রাখা সম্ভব। তারা টিকতে না পেয়ে শেষমেশ জোর করে ঠেসে ধরে মুখে পট্টি বেঁধে দিয়ে তবেনিস্কৃতি পেল। তারপর কবরখানায় নিয়ে এসে মাটির তলায় পুঁতে দিয়ে তারা স্বস্তির নিকাস ফেলল।
আমি হ্যাঁ, একমাত্র আমার দ্বারাই তার পিতৃদত্ত জীবনটা রক্ষা পেতে পারে। উপায়? হ্যাঁ, চমৎকার একটা উপায় অবশ্যই আছে। উপায়টা হচ্ছে–আমার ফুসফুস থেকে খোয়া-যাওয়া দম তার ফুসফুস থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যদি আবার আমার ফুসফুসে চালান করে দেই, তবে মি. উইনডেনান্ডর ফুসফুস হালকা হয়ে যাবে। ব্যস, বাজিমাৎ।
আমি সম্মত হয়ে গেলাম। সে মুহূর্তেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত–না সিদ্ধান্ত বললে ঠিক বলা হবে না–শর্ত হয়ে গেল, আমি অর্থাৎ মি. বন্ধ হওয়া নিশ্বাস কী ভয়ঙ্কর প্রকৃতির তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে বাতাসখেকো শয়তান মি. ইউনডেনান্ড। এতেই তার চরম শিক্ষা অবশ্যই হয়ে গেছে। এরপর আর কোনোদিন ভুলেও আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না।
আমি নিতান্ত করুণাবশত তার ফুসফুসে আটকে থাকা আমার দমটুকু ফিরিয়ে নিলাম। ফিরে পেলাম আমার গলার আগেকার সে ধার–তীক্ষতা।
আমাদের উভয়ের তখন সে কী উল্লাস! উভয়ে মিলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে অনবরত চিৎকার চাঁচামেচি করে গেলাম। অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে চেঁচিয়ে যাওয়া যাকে বলে। আর তখন আমাদের গায়ে গতরে সে কী জোর। হাতির শক্তি যেন আমাদের উভয়ের দেহে ভর করেছে। সমাধিক্ষেত্রের সদর দরজাটার গায়ে দমাদম লাথি হাঁকাতে লাগলাম। লোহার দরজাটার পক্ষে দীর্ঘসময় আমাদের লাথির মোকাবেলা। করা সম্ভব হলো না। অচিরেই সেটা হুড়মুড় করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
আর লাথির সে কী আওয়াজ! চারদিক কাঁপানো বিকট আওয়াজ শুনে খবরের কাগজের লোকগুলো রীতিমত ভড়কে গেল। শুরু হয়ে গেল স্থানীয় খবরের কাগজের পাতায় জোর লেখালেখি।
ভল্টের চাবি নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল চাবির গোছার জিম্মাদার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। খোলা হলো পেল্লাই দরজাটা। দরজার পাল্লা খুলেই এই দুই মূর্তিমানকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের আত্মারাম তো খাঁচাছাড়া হয়ে যাবার জোগাড় হলো।
