আমি যখন জানালা দিয়ে বাইরে লাফ দিলাম, ঠিক সে মুহূর্তেই জানালারটা গা ঘেঁষে একটা কয়েদি-গাড়ি ধীরমন্থর গতিতে পথ পাড়ি দিচ্ছিল। কুখ্যাত এক চোর গাড়িতে শুয়ে অনবরত গুঙিয়ে চলেছে। শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। বুড়ো। খুবই দুর্বল। যমদূত এসে নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রতিটা মুহূর্ত গুণে চলেছে। গাড়ি থেকে সটকে পড়ার মতো কোনো ক্ষমতাই তার নেই।
কয়েদিকে নিয়ে কোনো চিন্তা না থাকায় রক্ষীরা গলা পর্যন্ত মদ গিলে বেহেড মাতাল বনে গাড়ির এক কোণে শরীর এলিয়ে দিয়ে পরমানন্দে ঝিমাচ্ছে।
গাড়ির চালক জেগে রয়েছে সত্য। কিন্তু তাকেও প্রায় গিলেই ফেলেছে। আধ ঘুমন্ত অবস্থায় কোনোরকমে গাড়িটাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে চলেছে। ফলে গাড়ির ভেতরে কি হচ্ছে, কি হতে পারে, এ-নিয়ে কারোই নজর নেই, থাকার কথাও নয়।
গাড়িটায় ছাদ নেই। পুরোপুরি ভোলা। ফলে জানালা দিয়ে লাফিয়ে আমি সরাসরি গাড়িটার ভেতরে দুম্ করে পড়ে গেলাম। পড়লাম একেবারে আধ-মরা কয়েদিটার পাশে।
আরে ব্যস! হতচ্ছাড়া বুড়োটা কী সাংঘাতিক ফেরেকবাজ! আমি গাড়িতে আছাড় খেয়ে পড়ামাত্র সে তড়াক করে লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে পড়ল। নিস্তেজ চোখের মণি দুটোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গাড়ির চালক আর রক্ষীদের বেহাল অবস্থাটা দেখে নিশ্চিন্ত হল, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। পরমুহূর্তেই কোলাব্যাঙের মতো লম্বা একটা লাফ দিয়ে একেবারে গাড়ির বাইরে চলে গেল। এবার উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে পাশের একটা গলির ভেতরে ঢুকে চোখের পলকে একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেল। কী ধড়িবাজ বুড়ো রে বাবা! এতক্ষণ তবে মড়ার ভান করে ঘাপটি মেরে পড়েছিল!
বুড়োটা গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার সময় গাড়িটা যে অস্বাভাবিক বেজে উঠেছিল, আর পরমুহূর্তে পথে দুঁপ করে আওয়াজ হয় তাতে রক্ষীরা যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল।
তারপর উঁকি ঝুঁকি মেরে যখন দেখল কয়েদি দাঁড়িয়ে রয়েছে তখন তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে ঘা-কতক দমাদম বসিয়ে দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। আসলে ডাক্তাররা লাশ কাটা টেবিলে তোলার সময় আমাকে যে বিশেষ পোশাকটা পরিয়ে দিয়েছিল তা অবিকল কয়েদিটার পোশাকের মতো। অতএব নেশার ঘোরে আমাকেই কয়েদি ভাববে, আশ্চর্য কি?
যাক, আমি বন্দুকের কুঁদোর ঘা খেয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম।
আরও কিছুটা পথ পাড়ি দেওয়ার পর গাড়িটা বধ্যভূমির গায়ে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমাকে অনবরত গুঁতোগাতা দিতে দিতে গাড়ি থেকে নামিয়ে বধ্যভূমিতে নিয়ে গেল। আমি ব্যাপার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্যস্তহাতে আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়িয়ে দেওয়া হলো। পরমুহূর্তেই রক্ষীরা হৈ-হল্লা করতে করতে আমাকে লটকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করল।
একেই বলে শাপেবর হওয়া। গলায় ফাঁসির দড়ি পড়িয়ে লটকে দেওয়ায় আমার কিন্তু উপকারই হলো। বাঁকা ঘাড়টা টান-টান মানে সিধে হয়ে গেল।
আর আমার ফাঁসিতে মৃত্যু? দম আটকে মৃত্যু? হায় ঈশ্বর আগে থেকেই যার দম আটকে রয়েছে তার আবার নতুন করে দম আটকাবার প্রশ্ন ওঠে কি করে? মরা কবার মরবে? তবে এটা খুবই সত্য যে, লটকে দেবার মুহূর্তে আমি খুবই পা ছোঁড়াছুঁড়ি করছিলাম। আর পুরো শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে সার্কাস খেলা দেখাচ্ছিলাম।
আমার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখে উপস্থিত সবাই এতই মজা পাচ্ছিল যে, জোরে জোরে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল–আবার! আবার হোক! আবার হোক!
সেখানে রক্ষীরা ছাড়া জনা কয়েক মহিলাও ফাঁসি দেখার জন্য জড়ো হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন তো আমার ভেল্কিবাজি দেখে চোখ উলটে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে দড়াম করে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়েই সম্বিৎ হারিয়ে ফেলল। আর জনা কয়েকের। ফিটের ব্যামো ছিল। তাদেরও মূচ্ছা যেতে সময় লাগল না।
আর একজন চিত্রশিল্পী সেখানে উপস্থিত ছিল। ছবি আঁকা তার পেশা নয়, নেশা। সে ফাঁসির মড়া ছবিটায় রং-তুলি দিয়ে শেষ পোচ দিতে দিতে খুশিতে ডগমগ হয়ে হয়ে পড়েছিল। তার খুশির বিবরণ কাগজ-কলমের সাহায্যে দেওয়া সম্ভব নয়।
ফাঁসির মঞ্চে আমাকে কিন্তু বেশিক্ষণ রাখা হয়নি। কেল্লা ফতে হয়ে গেছে ভেবে ব্যস্ত-হাতে দড়ি খুলে আমার লাশটাকে নামিয়ে নিয়ে আসা হলো। একজনকে যমের দুয়ারে পাঠাতে এর বেশি সময় তো আর নষ্ট করা যায় না। কারণ, ইতিমধ্যেই আরও জনাকয়েক কয়েদি এনে জড়া করা হয়েছে। তাদেরর কথাও তো জানা দরকার।
আমার গলা থেকে দড়িদাঁড়া খুলে কবরখানায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাকে কবরস্থ করা হলো।
আমাকে মাটিচাপা দিয়ে হৈ-হল্লা করতে করতে সবাই কবরখানা ছেড়ে দূরে চলে যেতেই আমি কাজে লেগে গেলাম। ক্রোধে প্রায় ফেটে পড়ে লাথি মেরে কফিনের ডালা ভেঙে পাতালপুরী থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
এবার আমি মুক্ত, সম্পূর্ণ স্বাধীন। কারো তোয়াক্কাই আমি করি না।
পাতালপুরী থেকে উঠে এসে আমি এক অদ্ভুত খেলায় মেতে গেলাম। মাটি খুঁড়ে সারি সারি কফিনের প্রত্যেকটার ডালা ভেঙে ভেঙে ভেতরে হাত চালিয়ে দিতে লাগলাম। আর হাতিয়ে হাতিয়ে দেখতে লাগলাম, সেগুলোর ভেতরে কি ধরনের মড়া। রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা লাভ করে ফেললাম, কম কথা!
