এবার আমাদের আবিষ্কারের মূলনীতি একটা কাগজে বিস্তারিতভাবে লিখে ফেললাম। তারপর বিবরণ সম্বলিত কাগজটাকে একটা বোতলের মধ্যে ভরে ভালোভাবে ছিপি এঁটে দিলাম। এবার সেটাকে সফেন সমুদ্রের বুকে ছুঁড়ে দিলাম।
ব্যস, আনন্দ-উৎসাহ আর কতক্ষণ? বোতলটাকে সমুদ্রের বুকে ছুঁড়ে দিতে না দিতেই হঠাৎ এমন একটা অভূতপূর্ব, একেবারেই অভাবনীয় একটা ঘটনার মুখোমুখি আমাদের হতে হলো যাতে মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আমাদের উৎসাহেও কম ভাটা পড়ল না।
বেলুনের স্পিংটাকে প্রপেলারের সঙ্গে সে ইস্পাতের দণ্ডটা যুক্ত করে রেখেছিল সেটা আচমকা খুলে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে অদ্ভুতভাবে ঝুলতে আরম্ভ করল। একেবারেই এমন একটা অভাবনীয় কাণ্ড দেখে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড় হলো।
কিন্তু ক্রমশ চরম একটা বিপদের কপাল চাপড়ে হা পিত্যেশ করার অর্থ চূড়ান্ত সর্বনাশকে ত্বরান্বিত করা, আমার ভালোই জানা আছে। অতএব মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য তৎপর হলাম। সেটাকে টানাটানি করে আবার জায়গামত বসিয়ে দেবার জন্য আমরা প্রায় সবাই মিলে জোর চেষ্টা চালাতে লাগলাম।
আমরা যখন সে লোহার দণ্ডটার সাহায্যে আবার বেলুনের স্প্রিং আর প্রপেলারের সংযোগ সাধনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম ঠিক তখনই পূর্বদিক থেকে প্রবল বেগে বাতাস ধেয়ে এলো। আর তারই প্রচণ্ড ধাক্কায় বেলুনটা উল্কার বেগে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে ছুটতে লাগল।
মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমরা ঘণ্টায় পঞ্চাশ-ষাট মাইল বেগে ছুটে চলেছি।
আমি সামনের উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই স্বগতোক্তি করলাম–হায় ঈশ্বর! আমরা ঘণ্টায় পঞ্চাশ-ষাট মাইল বেগে ছুটে চলেছি।
কিন্তু যে মুহূর্তে পরিস্থিতি এমনই খারাপ যে, প্রকৃত অবস্থাটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার মতো অবকাশ আমাদের নেই। কারণ তখন আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ ম্প্রিং আর প্রপেলারের মধ্যে সংযোগ সাধন করে সমূহ ধ্বংসের কবল থেকে বেলুনটাকে রক্ষা করা, আমাদের নিজেদের জীবনও বটে।
প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে শেষপর্যন্ত এক সময় অবশ্য কর্তব্যটা সম্পাদন করা সম্ভব হলো। স্প্রিং আর প্রপেলারের ব্যবস্থা করার পর আমরা এবার প্রকৃত ঘটনাটা সম্বন্ধে আলোচনা করতে বসলাম। আলোচনার ফাঁকে, ঠিক সে মুহূর্তেই মি. আইন্সওয়ার্থ আচমকা একটা অসাধারণ প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। তার মুখ দিয়ে কথাটা বেরোতেই মি. হল্যান্ড তাকে সমর্থন করলেন। সমর্থনটা তিনি বেশ দৃঢ়স্বরেই করলেন।
মি. আইন্সওয়ার্থের প্রস্তাবটা হচ্ছে–প্যারিসের দিকে আবার ফিরে যাবার উদ্যোগ না নিয়ে এ প্রবল বাতাসটার সুযোগ আমাদের অবশ্যই নেওয়া উচিত। অর্থাৎ প্রবল বাতাসের বেগ সম্বল করে আমাদের উচিত হবে আমেরিকার উপকূলে পৌঁছে। যাবার ধান্ধা করা।
তার প্রস্তাবটা দুঃসাহসি, সন্দেহ নেই।
আমি কয়েকমুহূর্ত গুম্ হয়ে বসে তার প্রস্তাবটা নিয়ে চিন্তা ভাবনায় লিপ্ত হলাম। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম, তার মাথা দিয়ে পরিকল্পনাটা মন্দ বেরোয়নি। সাহসে ভর করে ঝুলে পড়লে পরিণতি ভালো ছাড়া মন্দ হবার তো কথা নয়। অতএব পরিকল্পনাটা দুঃসাহসি হলেও বাস্তবে পরিণত করলে আখেরে ফল ভালোই পাওয়া যাবে। শেষপর্যন্ত আমিও তার প্রস্তাবে সম্মতি না জানিয়ে পারলাম না।
কিন্তু হায়! এ কী অবাক কাণ্ড! আমরা সবাই একমত হলেও নাবিক দুজন কিন্তু মুখ ফিরিয়ে বসে থাকল। তারা কিছুতেই আমাদের আকস্মিক পরিকল্পনাটাকে মেনে নিতে রাজি হলো না।
কিন্তু নাবিক দুজন কেন যে আমাদের প্রস্তাবে কিছুতেই সময় দিল না, তার সুস্পষ্ট কারণ কিছুই বুঝতে পারলাম না, তারাও মুখ ফুটে কিছু বলল না ফলে ব্যাপারটা রহস্যের আড়ালেই রয়ে গেল। আমরাও তাদের বেশি ঘাটালাম না।
যা-ই হোক আমাদের দিকে পাল্লা ভারী হওয়ায় নাবিক দুজনের আপত্তি শেষপর্যন্ত গুরুত্ব পেল না–নস্যাৎ হয়ে গেল।
এবার আমরা সোজা পশ্চিমদিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। বাতাসের বেগ প্রবল থাকায় বেলুনটা সমুদ্রের বুক চিড়ে তর তর করে এগিয়ে চলল।
একটু পরেই বাতাসের গতিবেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হতে শুরু করল। আর বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে বেলুনটাও আমাদের নিয়ে রীতিমত উল্কার বেগে সোজা পশ্চিমদিকে এগিয়ে চলতে লাগল।
এবার নতুন করে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু হলো। বাতাসের সে কী বেগ! আমরা যেন বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে উড়ে চলতে লাগলাম।
আশা করি আর খোলসা করে বলার দরকার নেই। কল্পনাতীত অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের চোখের সামনে থেকে সমুদ্রতটরেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন আকৃতির জাহাজকে আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। আরও কয়েকটার সঙ্গে জোর পাল্লা দিয়ে চলেছি। তাদের মধ্যে কয়েকটা আমাদের সঙ্গে এমন তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো মনে হলো যেন আমাদের হারিয়ে দেবার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে। কিন্তু একটু পরেই তাদের অধিকাংশই রণেভঙ্গ দিতে বাধ্য হলো।
বাজপাখির তো আমাদের উড়ে যেতে দেখে সব জাহাজের কর্মীদের মধ্যেই দারুণ উত্তেজনা দেখা দিল। ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে খুবই আনন্দের সঞ্চার করল।
