কেবলমাত্র বাক্সটার কথাই বা বলি কেন? আমার নিজের কি হাল হলো বলছি। দু-দুটো আছাড়, একবার নিজে পড়লাম আছাড় খেয়ে শান-বাঁধানো পথের ওপর আর পর মুহূর্তেই মালপত্র বোঝাই টিনের ইয়া বড় বাক্সটা সরাসরি একেবারে আমার মাথার ওপর পড়ায় মাথার খুলিটা ভেঙেচুড়ে একাকার হয়ে গেল, আর হাত দুটো তো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে অনেক আগেই। সব মিলিয়ে আমি প্রায় একটা মাংস আর হাড়ের পিণ্ডে পরিণত হয়ে গেলাম।
পথচারীরা কোনোরকমে আমার লাশটাকে হাসপাতালের সিটের ওপর তুলে দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিল। ডাক্তাররা সেখান থেকে আমাকে মর্গেই চালান দিত, কিন্তু কি ভেবে মর্গে না নিয়ে আমাকে নিয়ে ফেলল ঘরের টেবিলের ওপর।
ডাক্তাররা কাটা ছেঁড়া শুরু করে গোড়াতেই আমার কান দুটোকে কেটে ছেটে বাদ দিয়ে দিল। কানকাটা গেলে একটু আধটু সজীবতা না দেখালে চলবে কেন? আমিও সাধ্যতীত চেষ্টার মাধ্যমে তা একটু দেখলাম বটে।
সার্জেন লোকটা নিজে কৃতবিদ্য হলেও আমার পরিস্থিতি দেখে ভড়কে গেলেন। তাই শহরের এক বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসককে তলব করে আনলেন।
জরুরি তলব পেয়ে শল্য চিকিৎসক ভদ্রলোক হন্তদন্ত ছুটে এলেন। তিনি প্রথমে রোগীর পরিস্থিতি সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করে সবকিছু শুনে নিলেন। তারপর বাস্তব ক্ষেত্রে যখন দেখলেন, ছুরির আঁচড় পড়ামাত্র লাশটা চিংড়িমাছের মতো দারুণভাবে তিড়িং তিড়িং করে পা ছুঁড়ছে, ভাঙা হাত দুটোকে নাড়াচ্ছে আর শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে–তখন তিনি নির্দিধায় মতামত ব্যক্ত করলেন–এর কারণ অবশ্যই আছে।
ডাক্তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালেন।
তার জিজ্ঞাসা নিরসনের জন্য শল্য চিকিৎসক মুচকি হেসে বললেন–হ্যাঁ ভাই, বিশেষ কারণ ছাড়া রোগীর মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া কী কখনও সম্ভব বলুন?
কিন্তু কী সে কারণ? আপনাদের এ-বিশেষ চিকিৎসা-পদ্ধতির সঙ্গে আমার তেমন পরিচয় না থাকার জন্যই এমন ধন্দে পড়ে গেছি।
মুখের মুচকি হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই শল্যচিকিৎসক এবার রোগীর মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তন ঘটার কারণ সম্বন্ধে বললেন–আসলে এ-ক্ষেত্রে যে ব্যাটারিটা ব্যবহার করা হয়েছে।
নতুন ধরনের ব্যাটারি বলতে আপনি কী বুঝাতে চাইছেন?
গ্যালভানিক ব্যাটারি। খুবই তেজস্ক্রিয় এটা। এ ব্যাটারি ব্যবহার করলে কাটা পাঁঠার মাংসপেশীও রীতিমত থরথর করে কেঁপে ওঠে।
ডাক্তার ভদ্রলোক বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখ দুটো মেলে তার মুখের দিকে নীরব চাহনি মেলে তাকিয়ে রইলেন।
শল্য চিকিৎসক বলে চললেন–কাটা পাঁঠার মাংসপেশী যখন লাফায় তখন কান কাটা মানুষ তো পা ছুঁড়বেই। আর ভাঙা-হাত যে নড়ছে, সে তো আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, ঠিক কি না? তার শরীরটা কেমন বার বার দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে, চেয়ে দেখুন একবারটি।
কথা কটা শেষ করেই তিনি ঝটপট জামার হাত দুটো গুটিয়ে নিলেন।
তারপর যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুততার সঙ্গে ইয়া বড় আর চকচকে ঝকঝকে ছুরি কাঁচি হাতে তুলে নিলেন।
আমি তার পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে লাগলাম।
এবার শল্যচিকিৎসক নিতান্ত নির্মমতার সঙ্গে আচমকা ফ্যাচ করে আমার পেটে ছুরির ফলাটা গেঁথে দিয়ে, মারলেন একটা টান। ব্যস, পেটটা দু-টুকরো হয়ে গেল।
দুই আঙুলের চাপে পেটের চামড়া ফাঁক করে আমার পেটের নাড়িভুড়ি বের করে টেবিলের ওপরে রাখা একটা বড়সড় ট্রের ওপর আলতোভাবে রেখে দিলেন। উদ্দেশ্য, পরবর্তীকালে সময়-সুযোগ মতো এগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন–ব্যক্তিগত গবেষণাও বলা যেতে পারে।
নাড়িভুড়ির ব্যবস্থা করার পর ছুরির একটানে আমার নাকটা কেটে নামিয়ে দিলেন।
আমাকে অসম্ভব রকম নড়ানড়ি আর পা ছোঁড়াছুড়ি করতে দেখেও তিনি কিন্তু মোটেই অবাক হলেন না।
তিনি এবার ধীরস্থিরভাবেই আমার হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললেন। তারপর দরজায় ইয়া বড় একটা তালা লটকে দিলেন। আরও বড় বড় ঊড় বড় চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের এনে জড়ো করার জন্য, তার নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির ঘাটতিটুকু তাদের দিয়ে পূরণ করানোই তার সে মুহূর্তের উদ্দেশ্য ছিল।
ইতিমধ্যে দুটো বিড়াল গুটি গুটি কখন যে ঘরে ঢুকে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল কেউ টেরও পায়নি। ঘর খালি পেয়ে তারা এবার কেরামতি দেখাতে মেতে গেল। ঝট করে আমার কাটা নাকটার ওপর দিয়ে হাইজাম্পের খেলা দেখিয়ে ফেলল।
পরমুহূর্তেই আচমকা আমার মুখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো দিয়ে খানিকটা মাংস গলা থেকে খুবলে তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তিতে খেতে আরম্ভ করল।
এখন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটলে কোনো মড়ার পক্ষেও স্থির থাকা সম্ভব নয়। হঠাৎ বার কয়েক মোচড়া মুচড়ি দিতেই বাধন আলগা হয়ে গেল। তারপর এক ঝটকা মারতেই দড়িদড়া ছিটকে হাত কয়েক দূরে গিয়ে পড়ল।
আমার শরীরটা অস্বাভাবিক দাপাদাপি শুরু করে দিল। অতর্কিতে আমি ছিটকে গিয়ে জানালার কাছে দুম করে আছাড় খেয়ে পড়লাম। জানালাটা খোলাই রয়েছে। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে এমন জোরে এক লাফ দিলাম যে একেবারে জানালার বাইরে চলে গেলাম। দরজার তালাটা আগের মতোই ঝুলতে লাগল। আর যার জন্য এত বড় তালা ব্যবহার করা হয়েছে, সে এখন নির্বিবাদে ঘরের বাইরে। আজব কাণ্ডই বটে।
