এক ভোর রাতে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এক ডাক গাড়িতে চেপে বসলাম।
রাস্তা ফাঁকা পেয়ে গাড়িটা উল্কার বেগে ধেয়ে চলল। কিন্তু আমি কোন্ দিকে আর কোথায় চলেছি, বলব না। দয়া করে এ-প্রশ্নটা করবেন না। আমার পক্ষে অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়।
আমি আগেভাগেই আমার স্ত্রী-বাড়ির সবাইকে আর পরিচিতজনদের বলে রেখেছিলাম, একটা জরুরি কাজের তাগিদে অমুক শহরে যেতে হচ্ছে। ব্যাপারটা নিয়ে কেউ-ই মাথা ঘামায়নি।
ডাক গাড়ির সে কামরাটায় লোক একেবারে ঠাসা। মুরগি চালান গাড়িও বুঝি এর চেয়ে হালকা থাকে।
তখনও প্রকৃতির বুকে ভোরের আলো ফুটে ওঠেনি। ফলে গাড়ির কামরাটার ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা চলছিল। একে আবছা অন্ধকার, তার ওপর মুরগি গাদাগাদি অবস্থা দম বন্ধ হয়ে আসার যোগাড় হয়ে পড়েছিল। তার ওপর গাড়ির ঘরের ভেতরের অন্ধকারের সমস্যা তো কম-বেশি ছিলই। ফলে কারো মুখ দেখা সম্ভব হয়নি। কি করেই বা তা সম্ভব হবে? নিজের হাতটাই যে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছিল না। আবছা অন্ধকারে আমি যে কেবল কারো মুখ দেখতে পাইনি তাই নয়, আমার মুখও কারো পক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। সহযাত্রীদের কাউকেই আমি চিনতে পারিনি।
কাউকে ঠেলে আর কাউকে গোত্তা মেরে আমি বেঞ্চে কোনোরকমে কুকুর-কুণ্ডুলি। হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।
আমার দুদিকে দশাশই চেহারাধারী দুজন অনেক আগেই শুয়ে পড়েছে। তারা মানুষ, নাকি হাতি বোঝার উপায় ছিল না।
ধুমসো লোক দুটোর ফাঁকে আমি কোনোরকমে নিজেকে খুঁজে দিতে না দিতেই, শোয়াতে না শোয়াতেই আর অনেক বেশি মোটাসোটা, একেবারে শালগাছের গুঁড়ির মতো একটা হোঁতকা লোক আমার ওপরে দুম্ করে শুয়ে পড়ল। তিনজনের চাপে আমার দশা যে কী খারাপ হয়ে দাঁড়াল তা আর বলার নয়। আমি তো পৌণে-মরা হয়ে প্রায় দম বন্ধ করে পড়ে রইলাম।
আমার তো আবার চিৎকার চ্যাঁচামেচি করার উপায়ও নেই। গলা দিয়ে অনবরত সাধ্যমত জোরেই ফাঁস ফাঁস আওয়াজ করে চললাম। কাকস্য-পরিবেদনা–কে, কার কথা শোনে!
ইয়া পেল্লাই চেহারাধারী লোক তিনটি শুতে না শুতেই দিব্যি ঘোৎ ঘোৎ করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে আরম্ভ করল। আর আমি তিনটি বিশালায়তন পাথরের মাঝখানে শক্ত কাঠ হয়ে মড়ার মতো পড়ে রইলাম।
অস্বাভাবিক চাপে আমার ঘাড়টা বেঁকে যায় আর হাত-পা, এমনকি আঙুলগুলো নাড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললাম।
হোঁতকা লোকটানির্ঘাৎ আমাকে দেখতে পায়নি, একটা লোকের ওপর যে সে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েছে, এটাও বুঝতে পারেনি। যদি বুঝতেই পারত তবে অবশ্যই এ কাজ করত না–মানুষ তো বটে!
আমার ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা লোকটা ভোরের আলো ফোঁটার পর ব্যাপারটা বুঝল–আমাকে দেখতে পেল।
ঘুম ভাঙার পর ধীরে ধীরে উঠে বার কয়েক হাই তুলে, আড়ামোড়া ভেঙে বেহুদা লোকটা যখন দেখতে পেল, সে আমার ওপর শুয়ে নিশ্চিন্তে রাত কাটিয়েছে, আর আমি মরার মতো কাঠ হয়ে সারাটা রাত অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে কাটিয়েছি।
নির্ঘুম অবস্থায় তো অবশ্যই তখন বহুভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করল। কতবার যে ইস্ আর আহা-উঁহু করে নিজের কৃতকর্মের জন্য মার্জনা ভিক্ষা করল, তা বলে শেষ করা যাবে না।
সে তৎক্ষণাৎ এক লাফে মার ওপর থেকে নেমে গেল। সহৃদয়তার সঙ্গে শালগাছের গুঁড়ির মতো ওই ধুমসো লোক দুটোর ফাঁক থেকে আমার প্রায় অসাড় দেহটাকে এক হেঁচকা টানে তুলে নিয়ে সারা গা হাতিয়ে টা নিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার জন্য সাধ্যতীত প্রয়াস চালাতে লাগল। তারপরও যখন দেখল, আমার বেঁকে যাওয়া ঘাড়টা কিছুতেই সোজা হচ্ছে না, মুখে ফাস ফাঁস আওয়াজ ছাড়া রা বেরোচ্ছে না–তখন চলন্ত গাড়ির ঘরের সবাইকে ডাকাডাকি করে তুলে আমার গলার ফুলে-থাকা শিরাটার দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাল–চলন্ত গাড়িতে মরা পাচার হচ্ছে।
লোকটা গলা-ছেড়ে চিল্লাচিল্লি করে গাড়ির মালিকের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে লাগল। যাত্রীবোঝাই গাড়িতে মড়া পাচারের ব্যাপারটাকে তো আর কারো পক্ষেই বরদাস্ত করা সম্ভব নয়। রেগেমেগে আগুন হবার মতো ব্যাপারই তো বটে।
আমি যে নেহাৎ মড়া। আমার দেহ থেকে আত্মারাম অনেক আগেই ইহলোক ছেড়ে অন্য লোকের উদ্দেশ্য পাড়ি জমিয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্য হোঁকা লোকটা গদার মতো হাত দিয়ে আমার মুখে, একেবারে ডান চোখের ওপর শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে দুম করে একটা ঘুষি-হাঁকিয়ে দিল।
ঘুষি মেরে লোকটা আমাকে মড়া প্রমাণ করতে চাইল বটে। কিন্তু কাজের কাজ কী হল? আমি তো তখন শক্ত একটা কাঠের গুঁড়ি ছাড়া কিছু নই। শরীর এতটুকুও নড়ানড়ি করছে না, গলা দিয়ে রা-ও বেরোচ্ছে না। তাই ঘরের যাত্রীরা একে একে আমার কান ধরে জোরে জোরে টেনে এটাই প্রমাণ করল হোঁকা লোকটার কথাই সত্যি, আমি মড়া ছাড়া কিছুই না–অনেক আগেই আত্মারাম খাঁচা-ছাড়া হয়ে গেছে।
নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছবার পর সবাই মিলে হরেকরকম কথাবার্তা, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত পথ বের করে ফেলল। হতচ্ছাড়া মরাটাকে এ-মুহূর্তেই চলন্ত গাড়ি থেকে ছুঁড়ে বাইর ফেলে দিতে হবে।
দাঁড়কাক নামক পন্থশালার গায়ের রাস্তাটা দিয়ে গাড়িটা তখন উল্কার বেগে ধেয়ে যাচ্ছিল। আমার সহযাত্রীরা আমাকে ধরাধরি করে নিমর্মভাবে চলন্ত গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে একেবারে রাস্তার ওপর দুম করে ফেলে দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে আমার ঠিক ওপরেই আছাড় খেয়ে পড়ল আমার সবচেয়ে ভারী বাক্সটা। পথের ওপরে এত জোরে আছড়ে পড়ায় সেটার যে কী হাল হয়েছিল, তা না বললেও সহজেই অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে।
