অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে হন্যে হয়ে যার খোঁজ করছিলাম তার হদিস পেলাম না। কোনো জায়গাই তো তল্লাসি চালাতে বাদ দেইনি। একের পর এক আলমারি আর যতগুলো ড্রয়ার ছিল সবই পাত পাত করে খুঁজেছি। এমনকি কোনো আনাচ-কানাচও খুঁজতে বাদ দেইনি। আর সম্ভাব্য যত জায়গা ছিল, সাধ্যমত খোঁজাখুঁজি করলাম। সব চেষ্টাই বিফলে গেল। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতেই হলো।
শেষমেশ প্রসাধনের একটা বাক্স অবশ্য পেয়েছিলাম। ব্যস্তভাবে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে একটা শিশি ভেঙে ফেললাম। আতরের শিশি। মেঝেতে আতর ছড়িয়ে পড়ল। ঘরটা গন্ধে ভরে গেল। বলিহারি শখ বটে আমার স্ত্রীর! এতকিছুর পরও আতর মাখতে মন চায়!
আমি হতাশ হয়ে বিষণ্ণমুখে ভাবতে লাগলাম। মন-প্রাণ জুড়ে রইল জমাটবাধা বিষণ্ণতা। অতিকায় একটা পাথর যেন আমার বুকে স্থায়ীভাবে চেপে বসে রয়েছে। সে
যে কী দুঃসহ অস্বস্তিকর মর্মান্তিক অবস্থা তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়, বললেও কে যে কতটুকু বিশ্বাস করতে উৎসাহি হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নিদারুণ অস্থিরতার শিকার হয়ে আর একটা মুহূর্তেও যেন আমার কাটানো সম্ভব নয়। উপায়ন্তর না দেখে শেষপর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিতেই হলো। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, বিবাগী হয়ে মনের দুঃখে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াব। তারপর বরাতে যা আছে দেখা যাবে।
বাড়ি ছেড়ে না পালিয়ে আত্মরক্ষার কোনো উপায়ও তো দেখছি না। যে স্বামী স্ত্রীর আতরের শিশি ভেঙে ফেলেছে তার পক্ষে বাড়িতে, স্ত্রীর কাছাকাছি থাকা তো অবশ্যই নিরাপদ নয়।
আমি আতরের শিশি ভেঙে ফেলেছি, স্ত্রীর নজরে যখন পড়বে, ততক্ষণে আমি পগার পার–অন্য দেশে পাড়ি জমিয়ে ফেলেছি।
অন্য কোনো দেশে, বাড়ি থেকে দূরে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন করে জীবন আরম্ভ করব।
কথাটা তো মিথ্যা নয়, যে লোকের কণ্ঠনালী দিয়ে কথা বেরোয় না। যা বেরোয়। তা নিছকই ফাস ফাস শব্দ ছাড়া কিছু নয়। এমন একটা লোককে নতুন দেশের মানুষ অদ্ভুত এক জীব হিসেবেই ভাববে। অতএব, মানুষ হিসেবে ঘৃণা-অশ্রদ্ধা বা শ্রদ্ধা কোনোটাই করবে না। মানুষ হিসেবেই যাকে গণ্য করবে তখন এসবের তো প্রশ্নই ওঠে না।
আমি যখন অস্থিরভাবে কর্তব্য স্থির করার জন্য ভাবনা চিন্তায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই হঠাৎ একট নাটকের নাম আমার স্মৃতির পটে জেগে উঠল। নায়কের গলা ছিল ভাঙা। গলা দিয়ে ফাস ফাস আওয়াজ ছাড়া কোনো শব্দ বেরোত না, কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। তার গলা দিয়ে যা বেরোত তাকে চাপা ও বিকট ঘড় ঘড় আওয়াজ ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। কিছুতেই না। এমন একটা ম্যাড় ম্যাড়ে গলা নিয়েই নায়ক গোড়া থেকে শেষ অবধি নাটকটাকে রীতিমত জমিয়ে দিয়েছিল। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শেষ দৃশ্য পর্যন্ত নাটকটা দেখল। আর আমি পারব না? অবশ্যই পারব। আমার যে না পেরে কোনো উপায়ই নেই।
আমার মাথায় ব্যাপারটা স্থায়ীভাবে চেপে বসল। যারপরনাই উৎসাহিত করল আমাকে। কণ্ঠস্বরের ফ্যাসফ্যাসানিও একটা দারুণ আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে। স্বদেশে যদি না-ই হয়, বিদেশে হওয়াটা কোনো অসম্ভব কথা নয়। বিদেশে এমন একটা ফ্যাঁসফ্যাঁসে আওয়াজযুক্ত কণ্ঠস্বর যথেষ্ট সমাদর পেতে পারে।
ব্যস, আমি দেশত্যাগী হয়ে বিদেশের মাটিতে গিয়ে ঘাঁটি গাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। আর একটা দিনও দেরি করতে মন চাইল না। ঘরের দরজা বন্ধ করে নাটকের মহড়া দিতে মেতে গেলাম। দুদিন কষে মহড়া দেওয়ার পর আমার উৎসাহ হাজার গুণ বেড়ে গেল। বুঝলাম, নাটক রীতিমত জমে উঠেছে।
স্ত্রী? স্ত্রীকে ধাপ্পা দিতে বেগ পেতে হবে না। এটা একটা সমস্যাই নয়। আমি যে নাটকের নায়ক বনে গিয়ে এক নাগাড়ে মহড়া দিয়ে চলেছি, স্ত্রীর তা না বোঝার কথা নয়। আমার বোকা হাঁদা স্ত্রী সহজেই ব্যাপারটাকে বুঝে নেবে।
আরে ভাই নাটক মঞ্চের কদর-টদর তো কিছু কম নয়। নাটকের নামে যে কোনো মানুষের মনই নেচে ওঠে। আর আমার স্ত্রী যার মাথায় গোবর ঠাসা সে তো আমি নাটক করতে নামছি শুনলে আহ্লাদে একেবারে গদগদ হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। ব্যাপারটা কোনোরকমে তার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারলেই বাজিমাৎ।
বাজি মারতে গিয়ে আমাকে যে হরেকরকম কায়দা-কৌশলের সাহায্য নিতে হয়, তা তো আর মিথ্যা নয়। অস্বীকারও করতে পারব না।
আমার কাণ্ডকারখানা দেখে স্ত্রী যতবার, যতরকম প্রশ্ন করেছে ততবারই আমি নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করে তাকে ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করেছি।
স্ত্রীর মনে বিশ্বাস আনতে গিয়ে তার প্রশ্নের জবাবে আমি ব্যাঙের মতো ঘোৎ ঘোঁৎ করে অনবরত বিড় বিড় করে বিয়োগান্তক নাটকের সংলাপ বলে গেছি। তারই ফাঁকে কখনও দাঁত-মুখ বিকৃত করেছি, চেঁচিয়েছি, কখনও কোমর নাচিয়েছি, কখনও হাঁটুর নাচ দেখিয়েছি আবার কখনও মেঝেতে পা ঘষে ঘষে কায়দা কৌশল করতেও বাদ দেইনি।
নাটকের সে নায়কের অভিনয় অনুকরণ করতে গিয়ে যা-কিছু করা দরকার কিছুই করতে বাদ দেইনি। অবকিল তার মতো অভিনয় করে হাততালি ও বাহাবা কুড়িয়েছি। তাই তো কেউ ধরতেই পারেনি যে, আমার কণ্ঠ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, বাকশক্তি রহিত হয়ে গেছে।
এভাবে সংসারের অত্যাবশ্যক কাজকর্মের ফাঁকে নিষ্ঠার সঙ্গে মহড়া দিয়ে দিয়ে আমি অভিনয়ের কলাকৌশল রপ্ত করে ঝানু অভিনেতা বনে গেছি।
