মানুষের মধ্যে বিচিত্র একটা স্বভাব স্থায়ীভাবে–একেবারে রক্তের সঙ্গে মিশে থাকে, যা অবশ্যম্ভাবী আর হাতের কাছেই থাকে, সে পথ বর্জন করে ছুটে চলে দূরের পানে। হন্যে হয়ে উদ্রান্তের মতো ছুটে যায়, সে কিন্তু নিশ্চিত জানে, কিছুতেই তার ইচ্ছা পূরণ হবার নয়, তবুও আগুন দেখে পতঙ্গ যেমন ধেয়ে যায় ঠিক তেমনি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে সে অনবরত সেদিকেই ধেয়ে যায়। পরিণামের কথা ভাববার ইচ্ছা, সুযোগ বা মানসিকতা কোনোটাই তার সে মুহূর্তে থাকে না।
ঠিক একই রকম হাল আমারও হলো। যাক, যে কথা বলছিলাম, আত্মহত্যার না। পরিকল্পনাটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম।
এদিকে আর এক অসহ্য ব্যাপার ঘরের মধ্যে ঘটে চলেছে। দুটো প্রাণী আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে অনবরত গলার কেরামতি দেখিয়ে চলেছে। আমার আকস্মিক বেহাল অবস্থার সুযোগ নিয়েনির্ঘাৎ আমাকে নিয়ে মস্করা করে চলেছে। অসহ্য! গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেবার মতো বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার।
কথায় বলে না, হাতি ফাঁদে পড়লে চামচিকেও তাকে লাথি হাঁকাতে দ্বিধা করে না। তারা কারা, যারা আমার আকস্মিম বেহাল অবস্থার সুযোগ নিয়ে আমাকে নিয়ে রঙ্গ-তামাশায় মেতেছে? তাদের একটা হচ্ছে আমারই বাড়ির হুলো বিড়াল। নচ্ছাড়টা কার্পেটের ওপর মৌজ করে বসে অনবরত গোঁফ ফোলাচ্ছে আর তড়পে চলেছে। আর দ্বিতীয়টা হতচ্ছাড়াটা? আমারই দশাসই চেহারাধারী হোঁতহকা কুকুর। মহাপ্রভু। টেবিলের তলায় বসে দিব্যি ল্যাজ নাড়াচ্ছে আর বিশিস্বরে কে কে করছে।
আমি হতাশায় রীতিমত মুষড়ে পড়ার যোগাড় হলাম। যখন সিঁড়ি থেকে পায়ের শব্দ কানে এলো।
উৎকর্ণ হয়ে শব্দটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, অনুমান অভ্রান্তই মনে হলো। আমার আদরের বউটা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। যার কাছে গলার কেরামতি দেখাতে গিয়ে আমার এ-হাল হয়েছে। কেবল হাল বললে ঠিক বলা হবে না, মর্মান্তিক হাল বলাই উচিত।
পায়ের আওয়াজটা নিচে নেমে এক সময় মিলিয়ে যেতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।
যাক, আমার বউটা দূরে চলে যাওয়ায় আমি নিসঙ্গ হতে পারলাম। এখন আমি একা, একেবারেই একা। যদিও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে আমার বুক অনবরত ধুকপুক করছিল, এবার জোর করে মনকে ফিরিয়ে এনে শক্ত করে বাঁধলাম। এমন। বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিটাকে কাটাবার যা হোক একটা ব্যবস্থা তো করা দরকার, করতেই হবে।
শিকারি বিড়ালের মতো সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে গিয়ে দরজায় তালা লটকে দিলাম। এতটুকুও শব্দ যাতে না হয় সে দিকে কড়া নজর রেখেছিলাম।
ব্যস, এবার মাথা ঠাণ্ডা করে যারপরনাই উৎসাহ-উদ্যমের সঙ্গে ঘরটা তল্লাশি চালাতে মেতে গেলাম। আমি যার তল্লাশ করছি,নির্ঘাৎ, সেটাকে আলমারি বা ড্রয়ারের কোণে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা বাষ্পীভূত অবস্থায় থাকতে পারে, এমনকি কঠিন আকার নিয়ে থাকাও অসম্ভব নয়।
বিভিন্ন পরিস্থিতি, বিভিন্ন স্থানে বহু দার্শনিককে দেখেছি দর্শনের বহু ব্যাপার স্যাপারে অ-দার্শনিক মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়েন। তাই ম্যানডিভিল বইয়ের পাতায় উইলিয়াম গডউইন তো স্পষ্টই বলেছেন–অদৃশ্য বস্তুই একমাত্র বাস্তবতায় পরিপূর্ণ।
আমি যে চক্করে পড়েছি, শেষপর্যন্ত তাঁর বক্তব্যই পরিপূর্ণ বাস্তবে পরিণত না হয়ে যায়। দোহাই, অবিশ্বাস্য একটা কথাকে বিশ্বাস করাতে চাচ্ছি বলে দোহাই পাঠক পাঠিকা অনুগ্রহ করে মুখ ফেরাবেন না, ঠোঁট দুটোকে বাঁকিয়ে পি প্রদর্শনের চেষ্টা করবেন না। আমার অসহায় অবস্থাটা একবারটি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করার চেষ্টা করুন।
কথাটা খুবই সত্য যে, গাড্ডায় না পড়লে দার্শনিকদের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।
দার্শনিক অ্যানাকসগোরাস তো বলেই রেখেছেন–সব বরফের রঙই সাদা সাদা। এটা একটা ঘটনাই বটে। পরবর্তীকালে তা জানতে পেরেছিলাম। সেও বহুবার বহুভাবে ঠেলাধাক্কা খাওয়ার পর।
দীর্ঘসময় ধরে তল্লাসি চালিয়েছিলাম। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিরবচ্ছিন্ন ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের বিনিময়ে এক জোড়া নকল নিতম্ব, নকল দাঁত, একটা নকল চোখ আর কয়েক বাক্স মিষ্টিদ্রব্য, মি. উইনডেনান্ড নামধারী এক ভদ্রলোক আমার সহধর্মিনীকে উপহারস্বরূপ দান করেছিলেন।
এবার ব্যাপারটা আমার কাছে খোলসা হয়ে গেল, ভদ্রলোকটির ওপর আমার স্ত্রীর পক্ষপাতিত্বের আসল কারণ কি? গূঢ় রহস্য না থাকলে তো এমনটা কিছুতেই হবার নয়। আমি নিদারুণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। অসহ্য! আমার মধ্যে ছটফটানি শুরু হয়ে গেল।
আমি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারলাম, যে বস্তুর সামান্যতম সাদৃশ্যও আমার সঙ্গে নেই, আমার স্ত্রী পঞ্চমুখে তারই প্রশংসা করতে আরম্ভ করে, রীতিমত অভাবনীয় ব্যাপার!
অসহ্য! এমন একটা ব্যাপার যে কিছুতেই বরদাস্ত করা যায় না। আমার স্ত্রীর আচার আচরণের চেয়ে জঘন্য কাজ আর কিছু থাকতে পারে না।
কার না জানা আছে, আমি মোটাসোটা গাট্টাগোট্টা চেহারার অধিকারী হলেও লম্বা-চওড়া কিছুটা কিম্ভুতকিমাকার তো অবশ্যই।
আর মি. ইউনজেন্ডর চেহারা ছবি? তার চেহারার আর পোশাক পরিচ্ছদের চাকচিক্য আর চালবাজির কথা তো এখন সবার মুখে মুখে সর্বক্ষণ ঘুরে বেড়ায়। জপমন্ত্রের মতো হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কারণে অকারণে পরিচিতজনরা তার উপমা দেয়। দিনের মধ্যে অন্তত বারকয়েক তার নামটা যে কোনো উপলক্ষে মুখ দিয়ে উচ্চারণ না করতে পারলে যেন অনেকেরই অনেক কিছু বাদ রয়ে যায়। মনটা বিষিয়ে থাকে। আমার সতীলক্ষ্মী স্ত্রী-ও একই পথে হাঁটছে তা-তো অবিশ্বাস করার মতো কথা নয়। আর অবাক হবারও কিছু নেই। যাক, সে প্যাচাল পেরে ফায়দাও তো কিছু দেখছি না। অতএব তার কথা ছাড়ান দেওয়া যাক।
