আমি কেবলমাত্র গালাগালি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারলাম না। শেষমেশ খাট থেকে শিকারি কুকুরের মতো লাফিয়ে নেমে তার গলা টিপে ধরতেও বাদ দিলাম না।
তারপর? সাধ্যমত তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে খেঁকিয়ে উঠে সবে আরও বাদ পড়া মনের মতো গালাগাল দিতে যাব, যা কানে গেলে নিজের অপদার্থতা সম্বন্ধে বউয়ের বিন্দুমাত্র সন্দেহও থাকত না, এমন সময় আচমকা আমার দম বন্ধ হয়ে গেল। ব্যস, মনের রাগ ভেতরেই রয়ে গেল। তাকে শুনিয়ে নিজেকে সন্তুষ্ট করা আর হয়ে উঠল না।
শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়া, দম ফুরিয়ে যাওয়া, দম বন্ধ করে থাকা, নি…বের করতে পারা। এমন বহু ঘটনার কথা আগে শুনেছি বটে। কিন্তু বাস্তবে যে তা ঘটতে পারে, তা জানা তো দূরের ব্যাপার, এর আগে কল্পনাও করিনি কোনোদিন। হায়! একে, একেবারে পুরোদস্তুর ঘটে গেল, হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে গেলাম।
এবার আপনিই ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন, দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আমি কতখানি ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গিয়েছিলাম। আর হতাশও হয়েছিলাম কী পরিমাণ।
বিশ্বাস করুন, আমি একটা বিশেষ প্রতিভার অধিকারী, যা মহাসঙ্কটের মুহূর্তেও আমার কাছছাড়া হয় না। সেটা কি, জানতে ইচ্ছে করছে, তাই না? বলছি শুনুন, আমার মেজাজ মর্জি যখন তিরিক্কি হয়ে থাকে তখনও লক্ষ্য করেছি, আমার মাথা খুবই ঠাণ্ডা, স্বাভাবিক থাকে। আমি কিন্তু তিলমাত্রও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি না, মুহূর্তের জন্যও কিছুতেই না।
তবে এও সত্য যে, আমি এমন সতর্কতা অবলম্বন করলাম। সবে বিয়ে-করা বউকে টেরই পেতে দিলাম না, কী সঙ্কটময় পরিস্থিতিতেই না আমি পড়েছি। ব্যাপারটা সামলে সুমলে নেবার জন্য কেবলমাত্র চমৎকার একটা মুখভঙ্গি করলাম। তার এক গালে আলতো করে টোকা মেরে আর অন্য গালটায় ছোট্ট করে একটা চুমু খেয়ে তাকে সোহাগ জানালাম।
ব্যস, তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে লম্বা-লম্বা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিলাম। চোখের পলকে আমি আদরের বউটার নজরের বাইরে চলে গেলাম।
আমার তখন কী হাল হয়েছিল, একবারটি বিবেচনা করুন। আমি জীবিত পুরোদস্তুর বেঁচে আছি অথচ মরে যাওয়ার লক্ষণ আমার মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। একেবারেই মরে গেছি। কিন্তু অন্য পাঁচজন জ্যান্ত লোকের মতো হাঁটছি, চলাফেরা করছি, কথাবার্তাও বলছি পুরোদমে। আর মেজাজ-মর্জিও খুবই ঠাণ্ডা-স্বাভাবিকের চেয়েও মাটির মানুষ আমি। অথচ আমার শ্বাসক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ, দম আটকে গেছে। এরকম আর একটা বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার পৃথিবীতে আগে কোথাও, কোনোদিন ঘটেছে বলে কেউ শোনেনি, ঘটেনি।
হ্যাঁ, আমার দম পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। পুরোপুরি বলতে একেবারেই।
সে মুহূর্তে আমি লক্ষ্য করেছিলাম, আমার ঘ্রাণেন্দ্রীয়ের ছিদ্র দিয়ে ছিটেফোঁটা বাতাসও আর বইছিল না। এ-ব্যাপারে আমি পুরোপুরি শতকরা একশো ভাগই নিঃসন্দেহ ছিলাম।
সে মুহূর্তে কেউ যদি সবচেয়ে হালকা কোনো পাখির পালকও এনে আমরণ নাকের ছিদ্র দুটোর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রাখত তবুও নাকের বাতাসে তাকে এতটুকুও নাড়াতে পারতাম না–সত্যি বলছি। সে মুহূর্তে আমি যে কী ঝকমারিতেই পড়েছিলাম তা আপনাকে আর কী বলব।
আমার এ-মর্মান্তিক পরিস্থিতিতেও শুধুমাত্র একটা ব্যাপারে একটু-আধটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম। আমি আগের মতোই, অন্য পাঁচজনের মতো কথা বলতে পারছিলাম আর চলাফেরাও কিছুমাত্র সমস্যা ছিল না। তবে সত্যি কথা বলতে কি, কথা বলা যাকে বলে সে অবস্থা কিন্তু আমি খুইয়ে বসেছিলাম। কণ্ঠনালীর পেশীর এক বিশেষ ধরনের খিচুনির ফলে কোনোরকমে ফিসফিস করে মনের ভাব ব্যক্ত করতে পারছিলাম–ব্যস এটুকুই। সে স্বরটা কেমন? সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে কে কে করে আওয়াজ বেরিয়ে এলে যেমন বিদঘুঁটে শোনায়, ঠিক সে রকম আওয়াজের মাধ্যমে কথা বলতে পারতাম।
হঠাৎ কেন আমার গলার এ-হাল হল? বউকে মুখ ঝাটা দিতে গিয়েই আমার হাল এরকম বেহাল হল? বউকে মুখ ঝামটা দিতে গিয়েই আমার হাল এরকম বেহাল হয়ে গেল।
সকালে বউকে আদর সোহাগ জানাবার মুহূর্ত থেকেই আমার ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেল, এ-জন্মে বুঝি আর ফুসফুস কায়দা কৌশল গলা দিয়ে বের করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না–কোনোদিনই না। না, গলা চিড়ে ফেললেও আমি আর ফুসফুসের হম্বিতম্বি দেখাতে পারব না।
আমার ফুসফুসনিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও গলার পেশীগুলো সেবার কোনোরকমে আমার ইজ্জৎ বাঁচিয়ে ছিল। যাকে বলে কোনোরকমে নাজেহাল পরিস্থিতি থেকে অব্যহতি পেয়ে যাওয়া।
আমার এমন হাল হলো যেন আত্মত্যার মতো পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। ভেবে চিন্তে বাতিল করলাম–মাথা থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলে দিলাম। ধুৎ! এমন কাজও। করতে আছে! নিতান্ত আহম্মক ছাড়া এ-রকম বিতিকিচ্ছিরি কাজে কারো মতি যায় না। আসলে পরিকল্পনাটা মাথায় আসতেই আমি এমনকিউরে উঠেছিলাম, যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
আমি দুম করে চেয়ারে বসে পড়লাম। মাথানিচু করে কয়েকমুহূর্ত গোমড়ামুখে বসে থাকলাম। আমার আকস্মিক অদ্ভুত বেহালদশা নিয়ে কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে ভাবতে লাগলাম, শুধু ভেবেই চলাম। কিছুক্ষণ মর্মান্তিক কল্পনা আমার মাথার চারদিকে ভিড় করে রইল। সেগুলোকে বার বার ঝেড়ে মুছে ফেলে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাতে লাগলাম। ঝেটিয়ে বিদায় করলেও যা পিছু ছাড়ে না, তাকে তাড়াব কি করে? আসলে প্রতিটা চিন্তাই যে হৃদয়বিদারক।
