যেখানে দাঁড়িয়ে আমি দেখছি, সেখান থেকে সুন্দর কুঁড়ে-ঘরটাকে আরও অনেক অনেক বেশি সুন্দর দেখাতে লাগল। সত্যি কথা বলতে কি, আমার তখন মনে হল, পটে আঁকা ছবিও বুঝি এমন মনোলোভা রূপ নিয়ে চোখের সামনে ফুটে ওঠে না।
সম্পূর্ণ বাড়িটার কথা বলছি না, মূল বাড়িটার দৈর্ঘ্য চব্বিশ ফুট, আর প্রস্থ ষোল ফুট। এর বেশি মোটেই নয়। আর মেঝে থেকে ছাদ অবধি মোট উচ্চতা আঠারো। ফুটের কিছু কম হতে পারে, কিন্তু বেশি অবশ্যই নয়।
বাড়িটার নিচের দিকটা লতা-পাতার ঝোঁপ দিয়ে ঘিরে রেখেছে, আর সামনে সবুজ ডালি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে সুদৃশ্য একটা ন্যাসপাতি গাছ। এটা বাড়িটার সৌন্দর্যকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। গাছের এ-ডালে ও-ডালে হরেকরকম খাঁচা ঝুলছে। প্রত্যেকটায় ভিন্ন-ভিন্ন জাতের পাখি বসে চারদিকে টুলটুল করে তাকাচ্ছে। তাদের সমবেত কলতানে উপত্যকাটা গমগম করছে।
সুদৃশ্য সার্সি দিয়ে জানালাগুলো ঢাকা। আর বাড়িটা টিউলিপ ফুলের সঙ্গে মিলিয়ে রঙ করা।
আমি দৃষ্টিনন্দন বাড়িটার দিকে এক পা-দুপা করে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনুসন্ধিৎসু চোখের মণি দুটোকে বাড়িটার গায়ে আলতোভাবে বুলাতে লাগলাম।
বাড়িটাকে যত দেখছি ততই যেন আমার চোখে সুন্দর দেখাতে লাগল।
পরমুহূর্তেই সাদা-কালো পাথরের চিমনিটার ওপর আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো।
বাড়িটার দিকে আরও কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকার পর আমি এবার বুঝতে পারলাম, বাড়িটার আগাগোড়াই মিশরীয় নকসার অস্তিত্ব বর্তমান। আর সেটার ওপরের দিকটা সরু, নিচের দিকটা ক্রমশ সরু হতে হতে ভূমি পর্যন্ত মিশে গেছে।
সেতুটা পেরিয়ে আমি কাকড় ছড়ানো জমিতে নামামাত্রই নিঃশব্দে, একেবারে বাঘের শিকার ধরার মুহূর্তের মতো পা টিপে টিপে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে শেষমেষ আচমকা একটা লম্বা লাফ দিয়ে একেবারে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ইয়া তাগড়া চেহারাধারী মাসপি।
একান্ত পরিচিত বন্ধুর কায়দায় মাসটি আমার দিকে একটা পা বাড়িয়ে দিল, আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করে নেবে কি না, না জেনেই এমনটা করল। আমিও বন্ধুর কায়দায়ই হাত উঁচিয়ে তাকে ইশারা করলাম।
মাসটিফ এবার চোয়াল বন্ধ করল। আমাকে নিয়ে তার চিন্তার অবসান ঘটল, বুঝলাম। সে আবার একটা পা বাড়িয়ে দিয়ে আমার প্রিয়-পোষা কুকুর পন্টোকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল।
দরজায় কোন ঘণ্টা চোখে পড়ল না। খুঁজে পাব কি করে, আসলে ঘণ্টার ব্যবস্থাই যে নেই। ফলে বাধ্য হয়ে হাতের ছড়ির ধাতব মাথাটা দিয়ে দরজার পাল্লায় টোকা দিলাম। দরজাটা আধ-খোলা অবস্থাতেই রয়েছে দেখলাম।
দরজায় বার-কয়েক টোকা দিতেই বাড়ির ভেতর থেকে পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো।
মুহূর্তের মধ্যেই দরজার পাল্লা দুটো হাট হয়ে গেল। প্রায় আঠারো বছর বয়স্কা এক মহিলার মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তার চোখে-মুখে হাসির প্রলেপ। এমন অত্যুজ্জ্বল চোখ আর মিষ্টি-মধুর হাসিমাখা মুখ আর জীবনে অবশ্য কোথাও, অন্য কোনো মহিলার মুখেই আমি দেখিনি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এমন মহিলা বাস্তবিকই নজিরবিহীন আর তুলনাবিহীন।
নারী নয়, নারীর নারীত্বই শেষপর্যন্ত পুরুষকে কাছে টানে। ভালোবাসার জোরে বাঁধে, অন্তরের ভালোবাসা নিঙড়ে দিয়ে নিজেকে নিঃস্ব, রিক্ত করে তোলে। তার চোখে সে অত্যাশ্চর্য নারীত্বকেই দেখলাম। তার চলনের মনোলোভা ভঙ্গিমাতেও যে নারীত্বকে চাক্ষুষ করলাম।
তার চাহনি পুরুষকে মুহূর্তে আপন করে নেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা ধরে। চাহনি সহস্য আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করল।
অ্যানি! সে অষ্টাদশীর নাম অ্যানি।
আঃ! কী মধুর নাম–অ্যানি!
ভেতর থেকে এক পুরুষ-কণ্ঠ ভেসে এলো অ্যানি–প্রেয়সী অ্যানি। ডাক শুনেই বুঝে নিলাম, গৃহস্বামী ডাকছেন।
আমি তখনও অপলক চোখে অ্যানির পিঙ্গলে চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, তার সোনালি কাধপর্যন্ত নেমে-আসা কেশরাশি। কুঞ্চিত কেশরাশি তার কাঁধ দুটো জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। আমি বিস্ময় বিস্ফারিত চাহনি মেলে তার যৌবনের জোয়ার-লাগা দেহপল্লবের সৌন্দর্য মন-প্রাণ ভরে উপভোগ করলাম।
অ্যানি, কী মিষ্টি মধুর নাম। নাম আর দৈহিক সৌন্দর্যের মধ্যে এমন অভাবনীয় সাদৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না।
তারপর হ্যাঁ, তারপরই আমি এসে দাঁড়ালাম সৌম্যকান্তি, স্বল্পভাষী যুবক গৃহস্বামী মুখোমুখি। পরে জানতে পারি তার নাম মি. ল্যান্ডর।
নিতান্তই সাদামাটা আসবাবপত্রে ঘরটাকে পরিপাটি করে সাজানো কোথাও এতটুকুও আড়ম্বরের লেশমাত্রও নেই।
ঘরটার একধারে একটা মর্বেল পাথরের গোল টেবিল। তার ওপর কয়েকটা বই। ক্রিস্টাল কাঁচের প্রায় বর্গাকার একটা আতর। তার ফুলদানিতে হরেক রঙের ফুলের তোড়া শোভা পাচ্ছে।
আমি বর্তমান কাহিনীর লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। অহেতুক বাড়িটার বর্ণনাকে আর টেনে নিয়ে লাভও তো কিছু নেই।
লস অব ব্রিদ
বিয়ের ঠিক পরের সকালের কথা।
আমার সবে বিয়ে-করা বউটা সবে বিছানা ছেড়ে ঘরের মেঝেতে পা দিয়েছে। ঠিক সে মুহূর্তেই আমি খেঁকিয়ে উঠলাম। আমি বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম।
আমার কাণ্ড দেখে আমার নতুন বউটা তো একেবার থ বনে গেল। আমি গলা ছেড়ে তাকে গালাগালি দিতে লাগলাম–শয়তান মাগি, ডাইনি, হাড়গিলে, হতচ্ছাড়ি, মুখপুড়ি–আর কত বাছা বাছা গালাগালি ব্যবহার করে তাকে আদর সোহাগ জানাতে লাগলাম।
