আরও আছে, মাথার ওপরের নীল আকাশের গায়ে পেঁজা তুলার মতো ভেসে বেড়ানো টুকরো টুকরো মেঘের প্রতিবিম্ব হ্রদের স্বচ্ছ জলে পড়ে এক অনন্য মনোলোভা দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।
রূপের সৌন্দর্য হ্রদটার পানি কোথায় শুরু আর কোথায় যে তার শেষ এক নজরে তা বোঝার উপায় নেই। আর হ্রদের আয়নার মতো স্বচ্ছ জলে ট্রাউট মাছ ছাড়া জানা অজানা হরেক রং আর আকৃতিবিশিষ্ট মাছ মনের আনন্দে খেলায় মেতেছে যার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির ওপর দিয়ে উড়ুক্কু মাছ অনবরত চক্কর খেয়ে বেড়াচ্ছে। তারা এত ব্যস্ততার সঙ্গে ও দ্রুত পানিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যে, হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় তারা বুঝি সর্বক্ষণ পানির ওপরেই মনের আনন্দে ছুটোছুটিতে মেতে রয়েছে। তারা বুঝি শুন্যেই অবস্থান করছে হ্রদের জলে নয়।
ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকা হ্রদের স্বচ্ছ জলে ভাসছে। বাতাসে অনবরত হালকাভাবে দোল খাচ্ছে। কেবলমাত্র তার তলদেশই নয়, সম্পূর্ণ শরীরটা–এমনকি প্রতিটা সূক্ষ্মতম অংশও দর্পণের মতো স্বচ্ছজলে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে।
হ্রদটার উত্তর দিকের পাড়ের কাছে, একেবারে গায়েই রয়েছে ছোট্ট একটা দ্বীপ দ্বীপভূমি। সেখানে একটা মুরগির খামার দেখা যাচ্ছে। দ্বীপটা এতই ছোট যে খামারবাড়িটাই পুরো জায়গা দখল করে নিয়েছে।
ছায়াছবির মতো সুদৃশ্য এ-দ্বীপটার সঙ্গে ছোট অথচ চমৎকার একটা সকোর সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। সাঁকোটা এতই ছোট যে, এক সঙ্গে বেশি মানুষ নয়, কেবলমাত্র একজনের পক্ষেই কোনোরকমে যাতায়াত সম্ভব। কল্পনাতীত হালকা। আর গঠন বৈচিত্র্য আদিমযুগের সাঁকোর মতোই মনোলোভা সৌন্দর্যমণ্ডিত। টিউলিপ কাঠের একটা মাত্র তক্তা এটা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। দৈর্ঘ্য চল্লিশ ফুট। চোখে লাগার মতো খিলের মাধ্যমে সাঁকোর তক্তাটাকে উঁচু করে তুলে রেখেছে–যাতে এদিক-ওদিক হেলে না যায় আর নড়বড় না করে তারই জন্য এ ব্যবস্থা।
খুবই সরু একটা জলধারা হদের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ত্রিশ গজ জায়গা জুড়ে নাচানাচি দাপাদাপি করতে করতে শেষমেশ জলপ্রপাতের আকার নিয়ে লাফিয়ে একশো ফুট তলায় আছড়ে পড়েছে।
হ্রদটার গভীরতা উল্লেখযোগ্য ভাবে গভীর। কোথাও কোনো গভীরতা ত্রিশ ফুটের কম নয়। তবে কল্লোলিনী জলাধারাটার গভীরতা কিন্তু কোথাও তিন ফুটের কম ছাড়া বেশি নয়। আর চওড়া? আট ফুটের বেশি চওড়া নয়। সবচেয়ে বেশি চওড়া জায়গাটার কথা বলছি।
হ্রদের পাড় দুটোর মতোই দ্বীপের চারদিক সবুজ ঘাসে ছাওয়া নয়–এটুকুই যা পার্থক্য লক্ষিত হয়। আর দ্বীপের অগভরী পানি কোন কোন ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত স্বচ্ছ। দর্পণের চেয়ে পরিষ্কার প্রতিবিম্ব পড়ে, মুখ দেখা যায়।
মাঝে মধ্যে ঘাসের সবুজ পাড়ের সবুজ আভায় ঘাটতি পড়েছে। কারণ, হরেক রঙের আর নিখুঁত গোলাকার ঝোঁপ থাকার জন্যই এমনটা হয়েছে।
অধিত্যকার ঘন সবুজ ঘাসের মখমলের ওপর দলে দলে ভেড়া, তিনটি পোষা। হরিণ, অগণিত ধবধবে সাদা হাঁসের দল মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা বিশালদেহী মাসটিক কুকুর সতর্ক দৃষ্টি মেলে তাদের পাহারা দিচ্ছে। তার লম্বা ঝুলন্ত কান, ঠোঁট আর লক্লকে জিভটা চোখে পড়লেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। সে অধিত্যকার সর্বত্র ঘুরে ঘুরে হরিন, ভেড়া আর হাঁসগুলোর ওপর চোখেল মণি দুটোকে অনবরত ঘোরাচ্ছে।
প্রচুর আইভিলতার ঝোঁপ পূর্ব আর পশ্চিম প্রান্তের নিরস-কর্কশ পাথরগুলোকে ঢেকে রেখেছে। লতার আধিক্যের জন্যই পাথরের একটা অংশও চোখে পড়ছে না।
আর উত্তর দিক? সরস, নিটোল আর লকলকে আঙুর লতায় উত্তর দিকের খাড়াই পাথর ঢাকা পড়ে গেছে। লতাগুলোর মধ্যে কোনটা পথরের খাঁজ থেকে আর কোনটা বা মাটি থেকে সরাসরি গজিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছেয়ে ফেলেছে। এ কী মনোলোভা দৃশ্য। তা চাক্ষুষ না করলে অন্যের মুখ থেকে শুনে সম্যক ধারণা লাভ করা কিছুতেই সম্ভব। নয় বলেই আমার বিশ্বাস।
উপত্যকার ঠিক নিচের দিকে সামান্য উচ্চতার একটা পাথরের প্রাচীর রয়েছে। হরিণ তিনটি সে প্রাচীরটাকে ডিঙোবার জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও সেটাকে ডিঙিয়ে বিপরীত দিকে যেতে পারছে না। শেষপর্যন্ত তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিল।
কোথাও বেড়া জাতীয় কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। তার দরকারই বা কি? প্রকৃতিই সে কাজ সেরে রেখেছে। স্থানে স্থানে পাথরের প্রাচীর সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটা স্থানকে অন্য স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আর তাদের সামনে লতার বাধা সৃষ্টি হয়েছে। যত সতর্ক হয়েই চলাফেরা করুক না কেন ভেড়া বা হরিণের পা তাতে আটকে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
যেখান সেখান দিয়ে ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই। একটামাত্র পথ দিয়েই ভেতরে ঢুকতে হয়–আমি যে-দিকে দাঁড়িয়ে ভূ-স্বর্গের অন্যান্য দৃশ্য চাক্ষুষ করে চোখ ও মনকে তৃপ্ত করে চলেছি।
পাহাড়ে সঙ্কীর্ণ অথচ স্রোতস্বিনীর নেচে নেচে হেলে-দুলে এগিয়ে যাওয়ার অনন্য সৌন্দর্যের কথা তো বলেছি। কিন্তু উত্তর থেকে দক্ষিণে আবার পশ্চিম থেকে পূর্বে যাওয়ার পথের মাঝে একটা ফাস তৈরি করার ফলে মাঝখানে ছোট্ট অথচ অপরূপ রূপের আধার একটা উপদ্বীপ গড়ে উঠেছে–পানির মাঝে প্রকৃতি সৃষ্ট ছোট্ট এক খণ্ড ভূখণ্ড। আর সে উপদ্বীপটার কেন্দ্রস্থলে মনে দাগ কাটার মতো চমৎকার একটা বাড়ি, একটা বসতবাড়ি অবস্থান করছে। উপদ্বীপটার দিকে এক নজরে দৃষ্টিপাত করলেই সেটাকে পটে আঁকা একটা দৃষ্টিনন্দন ছবি বলেই মনে হয়। যাক, যে কথা বলতে চাচ্ছি–যাকে বাড়ি বললাম সেটা কিন্তু অন্য পাঁচটা বাড়ির মতো ইট-কাঠ পাথরের বাড়ি নয়, ছিমছাম একটা ছোট্ট কুড়েঘর ছাড়া কিছু নয়।
