টিউলিপ গাছটার গুঁড়ি তিনটি অদ্ভুতভাবে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাটি থেকে তিন ফুট ওপর থেকেই গুঁড়ি তিনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে অল্প অল্প করে তিনদিকে সরে গিয়ে ক্রমেই দূরত্ব বাড়াতে বাড়াতে ওপরে উঠে গেছে। তবে আকাশের দিকে বেশি ওপরে ওঠেনি। আর এরই ফলে ডালপালা আর পাতা ও ফুলে ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ওপরের দিকে একটা গুঁড়ির সঙ্গে অন্যটার ব্যবধান চার ফুটের কাছাকাছি।
গুঁড়ি তিনটির মধ্যে মাঝেরটা সোজা আশি ফুট ওপরে উঠে গেছে। আর তিনটি গুঁড়ির ডালপালা একত্রে মিলেমিশে গিয়ে একশো বিশ ফুট ওপরে গিয়ে শেষ হয়েছে।
টিউলিপ গাছের এমন মনোলোভা রূপ আর গাম্ভীর্য পৃথিবীর অন্য কোথাও, অন্য কোনো বনে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার ওপর ঘন সবুজ পাতার গায়ে সূর্যরশ্মির ছোঁয়া লেগে যেমন ঝকমক করে তখনকার শোভার বর্ণনা কেবলমাত্র ভাষার মাধ্যমে কারো কাছে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। আর পূর্ণবয়স্ক এক-একটা পাতা আট ইঞ্চি চওড়া যা গাছটা–ডালপালার সৌন্দর্যকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। সবুজ! সবুজ! আর কেবলই সবুজ! সবুজের এমন গৌরবময় বিচিত্র সমারোহও ফুলের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের কাছে নিতান্তই ম্লান হয়ে পড়েছে।
ফুলগুলো কেবলমাত্র চমৎকারিত্বেরই দাবি রাখে না। যে সঙ্গে প্রতিটা ফুলও বিরাট আকৃতিবিশিষ্ট। তার ওপর স্বল্পপরিসর স্থানে এমন বিরাট অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত লাখ দশেক ফুল যদি পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে ফুটে থাকে, তবে তা কি যে কোনো সৌন্দর্য-রসিকের চোখ ও মনকে কেড়ে নেবার দাবি রাখে না? আমার পাঠক পাঠিকার কাছে একটাই প্রত্যাশা রাখছি, দৃশ্যটা কী অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে তা কল্পনায় আনার চেষ্টা করুন। যদি তা কিছুটাও অন্তত সম্ভব হয় তবে মনে করব লেখনির মাধ্যমে ছবিটা আকার যে প্রয়াসী আমি হয়েছি তা সার্থকতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও কিছু সময় আমি পাঠক-পাঠিকার কাছ থেকে চেয়ে নিচ্ছি। এবার তিনটি গুঁড়ির কথা ভাবুন। তাদের আকৃতির একটা ছবি আপনার কল্পনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করুন। প্রতিটা গুঁড়ির ব্যাস চারফুট, ভূমি থেকে বিশ ফুট ওপরে। অগণিত ফুলের মন-মাতানো মিষ্টি-মধুর গন্ধ মিলেমিশে বাতাসের কাঁধে ভর দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ উপত্যকাটায়। মাতোয়ারা করে তোলে প্রতিটা পথিকের মন-প্রাণ। পরিবেশটার কথাটা একবার ভাবুন তো।
একটা আগে পথের ধারে ধারে যেমন সবুজঘাসের বিচিত্র সমারোহ মন কেড়ে নিয়েছিল, চোখ দুটোকে করেছিল বিশেষভাবে প্রভাবিত, এখন উপত্যকার বুকে তা সম্পূর্ণ পৃথক রূপ নিয়ে আমার চোখের সামনে উপস্থিত। সে আগেকার সে মনোলোভা ঘন সবুজ ঘাস উপত্যকাটাকে মুড়ে রেখেছে। গালিচার মতো নরম, পুরু। আর অভাবনীয় সবুজ। এত অপরূপ রূপের সে বিচিত্র সমাবেশ ঘটতে পারে, তা সে বাস্তবিকই কল্পনাতীত।
আগেই উপত্যকার প্রবেশ-পথ দুটোর বর্ণনা দিয়ে রেখেছি। রূপের বিচারে কেউ কারো থেকে কোনো অংশে কম যায় না।
উত্তর-পশ্চিমে যে প্রবেশ পথটা রয়েছে, সেদিক থেকে ছোট্ট একটা পাহাড়ি নদী নেচে নেচে হেলে দুলে কুল কুল ধ্বনির সৃষ্টি করে ফেনার মুকুট মাথায় নিয়ে পাথরের স্তূপটার কাছে চলে এসেছে। যেখানে আকাশের দিকে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে হিকরি বাদাম গাছটা।
হিকরি বাদাম গাছটাকে পাশ কাটিয়ে আবার হেলে সাপের মতো এঁকেবেঁকে। জলরাশি অপরূপ সৌন্দর্যের আধার টিউলিপ গাছটা থেকে বিশ ফুট দক্ষিণ দিক থেকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে। এবার এদিক-ওদিক না তাকিয়ে সোজা পূর্ব-পশ্চিমের সীমানার মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে বয়ে গেছে। এখান থেকে আবার একই গতিতে ছুটে চলেছে ডিম্বাকার অধিত্যকাটায়। সেখানে গিয়ে স্রোতস্বিনী স্রোত যেন অনেকাংশে হারিয়ে ফেলেছে। তবু তার চলার বিরাম নেই। আবার বার বার কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে গিয়ে অধিত্যকার সৌন্দর্যের আধার ডিম্বাকার হ্রদে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়েছে।
ডিম্বাকার হ্রদটার সৌন্দর্য বাস্তবিকই অতুলনীয়। যে কোনো শিল্পরসিকের মতো সৌন্দর্য নিজের দেহে ধারণ করে দিনের পর দিন দশদিকের মনোরঞ্জন করে চলেছে।
বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকু হ্রদের স্বচ্ছ পানির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়ে যেন এক স্বপ্নময় জগৎ সৃষ্টি করেছে। একমাত্র ডিম্বাকার আয়নার সঙ্গেই এর তুলনা চলতে পারে।
হ্রদটার সৌন্দর্য অতুলনীয় হলেও আকৃতি কিন্তু মোটেই উল্লেখযোগ্য নয়। ঠিক ঠিকভাবে বলতে গেলে এটাকে ছোট্ট একটা হ্রদ বলাই শ্রেয়। এর সবচেয়ে চওড়া জায়গাটার ব্যাস এক গজের কিছু কম ছাড়া বেশি নয়।
আর পানি। স্বচ্ছ তো বটেই। তবে পানির স্বচ্ছতার বিচার করতে হলে সবার আগে কৃস্টাল পাথরের কথাই মনের কোণে জেগে ওঠে। সত্যি কথা বলতে কি, পানি এতই স্বচ্ছ যে, কোনো ক্রিস্টাল পাথরও বুঝি এর চেয়ে বেশি স্বচ্ছ নয়।
পানি অত্যাধিক স্বচ্ছ হওয়ায় তলদেশের ছোট-বড় আর বিভিন্ন আকৃতিবিশিষ্ট নুড়ি পাথরগুলোকে ঝকমক করতে স্পষ্ট দেখা যায়। আর হ্রদের চারদিকে পাড়গুলো সবুজ ঘাসের মখমল ছেয়ে রেখেছে। সবুজ! সরুজ! সবুজের এমন বিচিত্র সমারোহ দেখলে অতি বড় নিন্দুকও আবেগে আপ্লুত হয়ে এর রূপ-সৗন্দর্যে ভূয়সী প্রশংসা না করে পারবে না।
