এবার আমার সামনের কুয়াশার বাধা ক্রমে সরে যাওয়ায় অদৃশ্য একটা ছবির যেন একটু অংশ আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল। ওই তো ওদিকে একটা চিমনির ওপরের অংশ, এদিকে একটা ঝাকড়া গাছ আর ওই দিকে পানি–জলাশয়। আমি যেন ঠিক এক অত্যাশ্চর্য মরিচিৎকার মুখোমুখি হলাম।
কুয়াশা ক্রমে সরতে সরতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। সূর্যের রক্তিম আভা অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। এখন পাহাড়টার আড়ালে পুরোপুরি গা ঢাকা দিয়েছে। প্রকৃতির বুকে গোধুলির আধো আলো আধো অন্ধকার বিরাজ করছে।
পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে তখনও হালকা অলোকরশ্মি উঁকি মেরে চলেছে। বেগুনি আর কমলা রঙের নিচে মখমলের মতো আশ্চর্য সবুজ ঘাসে চাদরের ওপরে সাদা কুয়াশা প্রতিফলিত হয়ে এক স্বপ্নময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সে যে কী মনোরম দৃশ্য! তা চাক্ষুষ না করলে কিছুতেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
উপত্যকাটার দৈর্ঘ্য খুব বেশি হলেও চার শো গজ। আর প্রস্থ কোথাও পঞ্চাশ আর কোথাও বা দেড়-শো কি দুশ গজ। উপত্যকাটার উত্তরের অংশ সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ। সেখান থেকে ক্রমে প্রশস্ত হতে হতে দক্ষিণ দিকে নেমে এসেছে। তবে ছকবাঁধা কোনো নিয়ম মেনে কিন্তু এ রকমটা হয়নি।
উপত্যকার সবচেয়ে প্রশস্ত স্থানটা দেখা যাবে দক্ষিণ সীমান্তের আটগজের মধ্যেই। আর উপত্যকাটা দিয়ে ঘেরা ক্রমে ঢালু হয়ে নেমে-যাওয়া চলে না। তবে উত্তর প্রান্তের জায়গাটার কথা অবশ্য স্বতন্ত্র।
উত্তরপ্রান্ত জুড়ে গ্রানাইট পাথরের স্কুপ খাড়াভাবে নব্বই ফুট উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে। দারুণ খাড়া স্তূপ।
উপত্যকার উত্তর দিকটা পঞ্চাশ ফুটের বেশি প্রশস্ত নয়, আগেই তো বলে রেখেছি। তবে এ উঁচু স্থানটা থেকে একটু একটু করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হলে ডাইনে আর বাঁয়ে ক্রমে ঢালু হয়ে নেমে-যাওয়া যে জায়গাটা নজরে পড়বে, তা ক্রমে কম-খাড়াই, কম-পাথুরে আর ঢালু হতে হতে এগিয়ে গেছে। সংক্ষেপে দক্ষিণ দিক যেমন ক্রমে ঢালু হয়ে নেমে গেছে ঠিক তেমনই পেলবও হয়েছে। তবুও উচ্চতা সম্পূর্ণ উপত্যকাটাকে মালার মতো ঘিরে রেখেছে, তবে ব্যতিক্রম কেবলমাত্র দুটো স্থানে। যে ব্যতিক্রমের কথা বলছি তার একটা দিক পশ্চিমে অবস্থান করছে। সে স্থানটার গ্রানাইট পাথরের গায়ে দশ গজ চওড়া ফাঁক দিয়ে উপত্যকার দিকে সূর্যরশ্মি ছুটে আসছে।
ফাঁক বলতে আমি গিরিপথের কথা বলতে চাচ্ছি। এ-গিরিপথটা যেন আরও প্রশস্ত হয়ে অগ্রসর হয়েছে দুর্গম পর্বত আর অজানা অচেনা পর্বতের দিকে।
এরকমই আরও একটা গিরিপথ অবস্থান করছে দক্ষিণ দিকে। এ-দিকটা খুবই কম ঢালু। আর তা রয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিমদিকে। বড় গজ দেড়-শো গজ হবে।
এ-গিরিপথ দুটোর মাঝে অবস্থিত অধিত্যকাটাকে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন স্থানটাকে জোর করে চেপে নামিয়ে দিয়েছে।
গাছগাছালির ব্যাপার সম্বন্ধে তো কথাই চলে না–এখানকার সবকিছুতেই যেন কোমলতা লক্ষিত হয়। কেবলমাত্র উত্তরেই নয় সোজা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে কোমলতার ছোঁয়াটুকু।
আর উত্তর দিকে? সে দিকে উঁকি-ঝুঁকি মারা খাড়াই পাথরের সামান্য দূরেই দৃষ্টিনন্দন চিরসবুজ গাছগাছালি দলে দলে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মৃদুমন্দ বাতাসে ডালপালা অনবরত দোল খেয়ে চলেছে। হাজারো জানা-অজানা গাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে নজরে পড়ছে কালচে ওয়ালনাট, চেস্টনাট আর ও গাছ। এদের মধ্যেও বেশি করে ওয়ালনাটের কথাই বলতে হয়। এদের ইয়া মোটা মোটা সোজাভাবে আকাশের দিকে উঠে গিয়ে পাথরের মাথায় যেন দোয়ার মতো আচ্ছাদন সৃষ্টি করে রেখেছে।
আবার যদি পায়ে পায়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়, তবে একই রকম গাছগাছালি। উত্তর দিকের গাছগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বৈসাদৃশ্য লক্ষিত হবে উচ্চতার দিক থেকে। উত্তর দিক থেকে ক্রমে উচ্চতা কমতে কমতে যেন এখানে এসে ভূমির সঙ্গে মিশে গেছে।
দক্ষিণ-দিকের পুরো ঢালু অঞ্চলও জুড়ে অবস্থান করছে ছোট ছোট আগাছা আর লতাপাতা। ব্যস, কেবল ছোট-বড় ঝোঁপঝাড়। আর তাদের ফাঁকে ফাঁকে এখানে ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে রূপালি উইলো গাছ নইলে সাদা পপলার।
আর উপত্যকার পায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, তিনটি মাত্র গাছ অকৃত্রিম সৌন্দর্যরাশি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে অতুলনীয় রূপ নিয়ে সদম্ভেনিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। তাদের একটা হচ্ছে, মনোলোভা সৌন্দর্যের আঁকর এলম গাছটার ওপর থেকে চোখ ফেরানোই দায়। আর এটা যেন অন্ত্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উপত্যকার দক্ষিণের তোরণ-দ্বারটা আগলাচ্ছে।
আর পশ্চিম দিকের প্রবেশপথটা আগলাচ্ছে হিকরি বাদাম গাছটা। এটা এলম গাছটার তুলনায় আকারে বেশ বড়। আর সৌন্দর্যের বিচারেও অনেকটাই এগিয়ে। এটা ভূমির সঙ্গে পয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে পড়ে সবগুলো ডালপালাকে অধিত্যকার ভেতরে বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভার দিকে।
আর এ-উপত্যকা আর অধিত্যকা অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর গাছটা হিকরি বাদাম গাছটা থেকে প্রায় ত্রিশ গজ পূর্বে দাঁড়িয়ে নিজের রূপ সৌন্দর্যকে অকৃপণভাবে মেলে দোিয় রয়েছে। এ-গাছের মনোলোভা রূপ জীবনে আর কোথাও আমার চোখে পড়েনি। তিন-তিনটি গুঁড়ির অত্যাশ্চর্য টিউলিপ গাছটাকে উপত্যকা গর্ব বললেও অত্যুক্তি হয় না।
