আর একটা ব্যাপার আমার নজরে পড়ল, এখানকার জমির ঘাসগুলো ভেলভেটের মতোই তুলতুলে আর পুরুও যথেষ্ট। আর বরং অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। এখন দৃষ্টিনন্দন ঘাস ইংল্যান্ডের আর কোথাও চোখে পড়েনি।
আর এ ঘাসের গালিচার ওপর দিয়ে গাড়ির চাকা নিঃশব্দে যাতায়াত করে। নিঃশব্দে বলছি এ কারণে যে, পথের ওপর পাথরের কুঁচি অথবা ভাঙা ডালপালার মতো কোনো সমস্যা নেই। পথ আপনা থাকতে সৃষ্টি হয়নি, তৈরি করা হয়েছে। পাথর সরিয়ে ফেলে দুদিকে অনুচ্চ আলের মতো তৈরি করে সীমানা নির্ধারণ করে নেওয়া হয়েছে। তবে এ-কথাও বলা যাবে না যে, খুবই গোছগাছ করে বা একেবারেই অগোছালোভাবে সেটাকে তৈরি করা হয়েছে।
সযত্নে পাথর গেঁথে গেঁথে, পাথরে নিয়মিত ব্যবধানে থোকা থোকা ফুল ফুটে রয়েছে, যা পথটাকে আরও বেশি চমৎকারিত্ব দান করেছে। এক নজরে দেখলেই মনে হয় চোখের সামনে বুঝি কেউ পটে-আঁকা একটা ছবি টাঙিয়ে রেখেছে। সে যে কী মনোলোভা এক দৃশ্য! তা নিতান্তই উপলব্ধির ব্যাপার, কাউকে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক আমার মাথায় ঢুকল না। চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখছি তা সে একটা উন্নতমানের শিল্পকীর্তি এ বিষয়ে কিছুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। যে কোনো শিল্পরসিক অবশ্যই আমার সঙ্গে একমত হবেন।
কেবলমাত্র আমার হাতের নাগালের মধ্যেকার পথটুকুর কথাই বা বলি কেন, সম্পূর্ণ পথটাই রীতিমত চমৎকারিত্বের দাবি রাখে।
স্বীকার না করে পারছি না, এখানে যা-কিছু চাক্ষুষ করছি অবহেলা অবজ্ঞাসহকারে তৈরি করা হলেও সুরুচিসম্পন্ন শিল্প-ভাবনার জন্য শিল্পকীর্তিতে অবহেলা কিছু আছে বলে চোখে ধরা পড়ল না। তাই কায়িক পরিশ্রম আর সময়ও খুব কমই করতে হয়েছে। বিস্ময় উৎপাদনকারী ব্যাপারই বটে।
অন্যন্য শিল্পকর্ম আমার চোখ ও মনকে এমনই প্রভাবিত করে ফেলল যে, মনে হলো কোন অদৃশ্যশক্তি যেন চুম্বকের মতো আমার পা দুটোকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। চলার মতো শক্তি ও মন উভয়ই যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি। তবে কেউ যদি ভাবেন, শিল্পাধিক্যের জন্য আমার এ হাল হয়েছে তবে নিতান্তই ভুল করবেন। শিল্পাধিক্যের জন্য না ভেবে বরং শিল্পনৈপুণ্যের কথা যদি বলেন তবে অবশ্যই মেনে নেওয়ার মতোই কথা হবে বটে।
সে, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করুন না কেন, আমি কিন্তু সুদক্ষ শিল্পীর সুনিপূর্ণ দৃষ্টিনন্দন শিল্পীকীর্তিকে অবজ্ঞা করে আর একপা-ও এগিয়ে যেতে পারলাম না। পথের ধারে ঘাসের গালিচার ওপর বসে পড়তে বাধ্য হলাম। সেখানে বসে উৎসাহী চোখের মণি দুটোকে বার বার এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিল্প- নৈপূণ্যটুকু চাক্ষুষ করে আধঘণ্টা ধরে চোখ ও মনকে তৃপ্ত করে নিলাম।
হায়! এ কী অপরূপ শোভার আধার আমি চোখের সামনে দেখলাম! আমি যতই দেখলাম, ততই উপলব্ধি করলাম, একজন কৃতী শিল্পীর দেখভালের মাধ্যমেই এমন মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আর একটা ব্যাপার আমার অনুসন্ধিৎসু চোখে ধরা পড়েছে, সরল রেখায় সজ্জা উপস্থিত বটে। আবার সে সঙ্গে ছন্দবদ্ধভাবে রঙের বক্রতাও উপস্থিত। অতএব বৈচিত্র যে আছে তা তো স্বীকার করতেই হচ্ছে। তবে বৈচিত্রের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে শিল্পকীর্তিকে আরও অনেক, অনেক বেশি মনোলোভা করে চোখের সামনে মেলে ধরা হয়েছে।
উফ! কী যে অসামান্য সমন্বয় ভাবা যায় না। একেবারেই পরিপাটি, পুরোপুরি নিখুঁত সমন্বয়। নিতান্ত খুঁতখুঁতে স্বভাবের সমালোচকের পক্ষে এতটুকু ত্রুটি বিচ্যুতি বের করা সম্ভব হবে না।
এক সময় নরম সবুজ ঘাসের আসন ছেড়ে উঠে পড়তেই হলো। আমার যে বসে বসে শিল্প নৈপূণ্য দেখে চোখ ও মনকে তৃপ্তিদান করলেই চলবে না। আমাকে যে এগিয়ে যেতে হবে, মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাই খুঁজে বের করতে হবে।
যা-ই হোক, আমি উঠেই পড়লাম। দু-চার পা এগিয়ে ডান দিকে বাঁক ঘুরে এ পথে পা দিলাম। এগিয়ে চললাম। সামান্য এগিয়েই লক্ষ্য করলাম, হেলেসাপের মতো আঁকাবাঁকা গতিতে এগিয়ে আমার সামনের পথটা এক সময় নজরের বাইরে চলে গেছে। কয়েক পা গিয়েই আবার বাঁক নিতে হলো। তারপর আবারও বাক নিয়ে গতি অব্যাহত রাখতে হলো।
একটু পরেই খুবই হালকা, অস্পষ্টও বলা চলে এমন একটা তিরতিরে আওয়াজ আমার কানে এলো। উকৰ্ণ হয়ে লক্ষ্য করে আওয়াজটা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা করে নিতে চাইলাম। মনে হলো পানি পড়ার আওয়াজ। কাছে কোথাও কোনো অনুচ্ছ জায়গা থেকে পানি নিচে পড়ছে। হঠাৎই বাঁক নিয়ে দুপা এগোতেই চোখে পড়ল একটা বাড়ির দিকে পথটা ক্রমে ঢালু হতে হতে একই সর্পিল গতিতে এগিয়ে গেছে। বার বার উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে ব্যাপারটা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা নেবার চেষ্টা করলাম।
না, ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। নিচের উপত্যকাটা কুয়াশার চাদরে মোড়া থাকায় স্পষ্টভাবে কিছু দেখা সম্ভব হলো না। সূর্য পশ্চিম আকাশের গায়ে হেলে পড়েছে অনেক আগেই। এখন দূরে পাহাড়ের আড়ালে গা-ঢাকা দেবার সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। ঝির ঝির করে ভালোলাগা বাতাস বইছে। দেহে ও মনে রোমাঞ্চ জাগানো হাওয়া। আর তারই দৌলতে কুয়াশা একটু একটু করে ওপরে উঠে যাচ্ছে। আর এরই ফলে সামনের দৃশ্য ক্রমেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে।
