আমি ক্লান্ত অবসন্ন। আর টিকে থাকার মতো সামান্যতম ক্ষমতাও আমার মধ্যে অবশিষ্ট নেই। ঠিক এ পরিস্থিতিতেই একটা নৌকা আমাকে তুলে নিয়ে প্রাণে বাঁচিয়ে দিল। সদ্যলব্ধ স্মৃতি আর অবর্ণনীয় আতঙ্কে আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেললাম।
আমি যাদের নৌকায় আশ্রয় পেলাম, যারা আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে ছি নিয়ে নৌকায় তুলে নিল, সবাই আমার প্রাক্তন সহকর্মী। নিত্যকার কাজের সঙ্গি। তা সত্ত্বেও তারা আমাকে চিনতেই পারল না। আমার দিকে এমন ঢ্যাবা ঢ্যাবা চোখ করে তাকিয়ে রইল যেন চোখের সামনে মানুষ ভূত দেখলে যা করে থাকে। একদিন, মাত্র একটা দিন আগেও আমার যে চুলগুলো কুচকুচে কালো ছিল সেগুলো এ মুহূর্তে তুমি যেমন সাদা দেখছ, ঠিক সেরকমই দেখতে পেল। অবাক হবার মতো কথাই তো বটে। তাদের আর যা-কিছু বক্তব্য সেগুলোর মধ্যে, আমার মুখটাই পুরোপুরি বদলে গেছে।
আমি তাদের কাছে আমার কাহিনী সবিস্তারে বলেছি, তারা বিশ্বাস করেনি, করতে পারেনি।
এবার তোমার দরবারে আমার কাহিনী পেশ করলাম। আমার এ প্রত্যাশা ও বিশ্বাসটুকু আছে, সবচেয়ে ফুর্তিবাজ ছেলেরা আমার এ কাহিনীকে বেশি হৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করবে আর বিশ্বাস করবে।
ডাইরির পাতা থেকে
৬ এপ্রিল!
শনিবার!
সারা রাত ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিরলস কর্মযজ্ঞে মেতে থেকে ভোরের আলো ফোঁটার আগেই আমি বেলুনটাকে বাতাস ভরে ফোলাবার কাজে লেগে গেলাম। কুয়াশা খুবই প্রতিবন্ধকতা করল। কুয়াশায় রেশমের কাপড় ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছিল। তাই বাতাসের চাপে কাপড়ের ভাঁজগুলো খুলতে চাই ছিল না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাতাস ভরে বেলুনটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ব্যবহারের উপযোগি করে তুলতে প্রায় এগারোটা বেজে গেল।
কাজ পুরোপুরি মোনোর পর দিলাম বাঁধন কেটে। ব্যস, বাতাসের চাপে সেটা তর তর করে ওপরে উঠে আমাদের নিয়ে ইংলিশ চ্যানেলের দিকে এগিয়ে চলল।
বাতাসের গতি আশাতীতভাবে বেড়ে যাওয়ায় অতিকায় বেলুন আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি দ্রুত গতিতে ওপরে উঠতে আরম্ভ করল। সত্যিকথা বলতে কি, বেলুনটা আমাদের নিয়ে উল্কার বেগে ছুটে চলল।
দ্রুত গতিতে ওপরে উঠতে উঠতে আমরা পাহাড়ের মাথাগুলো ডিঙিয়ে বেশি করে রোদেও দিকে যেতে আরম্ভ করলাম। আমাদের গতিও দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল।
আমরা ব্যারোমিটারের গায়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম। মিনিট দশেকের মধ্যেই ব্যারোমিটার যন্ত্রে পনেরো হাজার ফুট উচ্চতায় পারদ স্থির হলো।
তখন আবহাওয়া ছিল মনোরম। কুয়াশার লেশমাত্রও ছিল না। আর দিনটাও ছিল রৌদ্র কিরণোজ্জ্বল। তাই স্বাভাবিকভাবেই এত ওপর থেকে হলেও পায়ের নিচের স্তর ভূ-ভাগকে মনোলোভা দেখাতে লাগল। চোখ ও মন বড়ই তৃপ্ত হলো।
আমাদের গতি অব্যাহতই রইল। আমরা দক্ষিণ অঞ্চলের পর্বতমালার দিকে উল্কার বেগে ধেয়ে চললাম। মুহূর্তের জন্যও আমাদের গতি মন্থর হয়নি। আমরা চলছি তো চলছি। তবে তখন আমরা এতই উচ্চতা বজায় রেখে চলেছি যার ফলে আমাদের সামান্যতম বিপদের সম্ভাবনাও ছিল না।
ঘড়ির মিনিটের কাটাটা এগোতে এগোতে ছয়টার ঘরে পৌঁছল। বেলা সাড়ে এগারোটা বাজল। ঠিক তখনই আমার অনুসন্ধিৎসু নজরে ইংলিশ চ্যানেল ধরা পড়ে গেল। আকস্মিক পুলকানন্দে মন-প্রাণ নেচে উঠল।
আমাদের গতি অব্যাহতই রইল। আরও পনের মিনিট এগিয়ে যাওয়ার পর উপকূলের গায়ে আছড়ে পড়া ঢেউগুলোকে আমাদের ঠিক পায়ের তলায় দেখতে পেলাম।
বুঝতে পারলাম, আমরা এবার সমুদ্রের ওপরে পৌঁছে গিয়েছি। উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রকে দারুণ আক্রাশে আমাদের পায়ের তলায় অবস্থান করে অনবরত ফোঁস ফোঁস করতে দেখলাম।
এবার আমরা ভেবেচিন্তে মনস্থ করলাম, বেলুনটার গ্যাস কিছু পরিমাণে ছেড়ে দেব। এর ফলে আমাদের ধীরে ধীরে কিছুটা নিচে নামা সম্ভব হবে। কার্যত করলাম তাই। বেলুনটা থেকে কিছু পরিমাণ গ্যাস বের করে দেওয়ার ফলে আমরা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে আরম্ভ করলাম।
প্রায় বিশ মিনিট ধরে আমরা ক্রমেই নিচে নেমে যেতে লাগলাম।
মিনিট বিশের মধ্যেই আমাদের বেলুনের সঙ্গে সংযুক্ত প্রথম বয়টা সমুদ্র স্পর্শ করল। আমরা প্রায় আগের গতিতেই এগোতে লাগলাম।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেলুনটার দ্বিতীয় বয়াটা সমুদ্র স্পর্শ করল। এবার বেলুনটার গতিবেগ অপেক্ষাকৃত ধীর মন্থর হয়ে এলো। আমরা সমুদ্রের ছন্দবদ্ধ ঢেউয়ের তালে তালে এগিয়ে চলতে লাগলাম। এখন আমাদের গতি মোটামুটি স্থির হয়ে এলো।
এবার বেলুনটার ভ্রু এবং হালের কার্যকারিতা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিল। কারণ, যে কোনো সময় এদের ব্যবহার করতে হতে পারে। সে দুটোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য উভয়কে একই সঙ্গে সক্রিয় করে দেওয়া হলো।
এখন আমাদের সবার আগে লক্ষ্য বেলুনটাকে ঘুরিয়ে পূর্বদিকে, প্যারিসের দিকে নিয়ে যাওয়া।
সামান্য চেষ্টার মাধ্যমে আমরা বেলুনটাকে আমাদের বাঞ্ছিত দিকে ঘুরিয়ে নিতে পারলাম। কাজ হাসিল হবার পর আমাদের মধ্যে এক অনাস্বাদিত আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। অনাবিল আনন্দে আমাদের সবার মুখে হাসির ছোপ ফুটে উঠল। বাঞ্ছিত কাজে সাফল্য লাভ করামাত্র আমরা সমবেত কণ্ঠে পর-পর নয় বার জয়ধ্বনি করে উঠলাম।
