বাইবেলের পাতায় খোঁজ করলে পাওয়া যাবে, মোজেস সদলবলে ঠিক কোন অঞ্চল থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন, মি. স্টিফেন্স সে স্থানটার হদিস পেয়েও সামনের দিকে আরও এগিয়ে যান। শেষপর্যন্ত দুটো পর্বতশ্রেণির মধ্যবর্তী একটা পথের সন্ধান পান। অনেক ভেবে-চিন্তে সে গিরিপথকেই মোজেসের সাগর পাড়ি দেবার পথ ধরে নিয়েছেন।
কিন্তু ফ্যারাওের সশস্ত্র সৈন্যদল নিয়ে দু লক্ষ অনুগামীসহ ওই স্থান দিয়ে এক রাতের মধ্যে বিশাল সমুদ্র অতিক্রম করা কি সম্ভব হতে পারে? তিনি কেন যে একবারও ভাবলেন না, এতগুলো বছরের মধ্যে সাগর সরে যাওয়া অসম্ভব নয়, আবার পানি ও তিন ফুট নেমে যাওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নয়?
দু লক্ষ অনুগামীসহ মোজেস এক রাতের মধ্যেই উপসাগরের অল্প পানি অতিক্রম করতে পারার পিছনে যে কারণ ছিল তা হচ্ছে–সে রাতে ভাটার ফলে পানি আরও অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। আর এরই ফলে তিনি এমন একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন। আবার সর্বশেষ বক্তব্য মি. স্টিফেন্সের দুখণ্ডের এ বই বড়ই সুখপাঠ্য।
লন্ডস কটেজ
গত গ্রীষ্মের কথা!
গ্রীষ্মের বিকেলে পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম। বেড়ানো মানে যাকে বলে নদীর পাড় ধরে হাঁটাহাঁটি করা। ব্যস, তাকে এর বেশি কিছু বলা যাবে না। হাঁটতে হাঁটতে বহু দূরে চলে যাওয়া। রাতবাস করা। যাক গে; যে কথা বলতে চাচ্ছি, নদীময় অঞ্চল, দিনের আলো প্রায় নিভে গিয়ে প্রকৃতির বুকে আলো-আঁধারির খেলা শুরু হয়ে গেছে।
একটু পরেই নেমে আসবে সন্ধ্যার অন্ধকার।
আবছা অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চারদিকে তাকিয়ে জায়গাটা সম্বন্ধে একটু-আধটু ধারণা করে নেবার চেষ্টা করতে লাগলাম।
কিন্তু হায়! কী মুশকিলেই যে পড়লাম তা আর বলার নয়। আঁকাবাঁকা পথটা যে কোথায় গেছে, কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না।
পথটা যে কেবল আঁকাবাঁকা তা-ই নয়। ভূমির গঠন প্রকৃতিও অদ্ভুত। উঁচু-নিচু, যাকে বলে রীতিমত ঢেউ খেলোননা। এমন একটা বিচিত্র ধরনের পথ বেয়ে আমি পুরো একটা ঘণ্টা ধরে হেঁটে চলেছি, তবু এ-পথের যেন বিরাম নেই, শেষ নেই। আমি কোথায় যে চলেছি, কোথায় গিয়ে যে এ-চলার শেষ হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। হতাশা আর হাহাকার সম্ভল করে অনবরত হেঁটেই চলেছি।
কিন্তু আর কতক্ষণ যে এমনি হারা উদ্দেশ্যে ঢেউ খেলানো পথ ধরে হাঁটতে হবে কিছুই আমার জানা নেই।
আমার মাথা ঝিম ঝিম করছে। কান দুটো রীতিমত ভোঁ-ভোঁ করছে। ভবিষ্যৎ যার ঘোলাটে তার মাথা তো ঘোরবারই কথা। কিন্তু ব্যাপারটা কেমন হলো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। যে গ্রামে আশ্রয় নিয়ে রাতবাস করব মনস্থ করে বেরিয়েছি, সে ছোট্ট মিষ্টি-মধুর গ্রামটা যে কোথায়, কোন্দিকে আর কতদূরে তা বুঝতেই পারছি না।
সূর্যদেব সারাটা দিন যে কোন গোপন অন্তরালে লুকিয়ে ছিলেন কে জানে। সারাটা দিন মুখও দেখতে পাইনি। চারদিক হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া ছিল। তা সত্ত্বেও ভ্যাপসা গরমে রীতিমত হাইফাই করছি। না, কুয়াশা বলাটা হয়তো ঠিক হবে না, বরং ধোঁয়াশা বলাই উচিত।
সূর্য পাটে বসতে না বসতে ধোঁয়াশার আস্তরণটা যেন আরও পুরু হয়ে আমার সামনে হাজির হয়েছে। আর অবাঞ্ছিত ধোয়াশার জন্যই হয়তো আমাকে এমন ধন্ধে। পড়তে হয়েছে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে পড়েছে। অনুসন্ধিৎসু চোখে চারদিকে তাকিয়েও কিছুই ঠাহর করতে পারছি না।
আমি এক পথহারা পথিক, খুবই সত্য বটে। পথের নিকানা হারিয়ে আমি এখন যেন অজানা দেশের দিকে হেঁটে চলেছি। তবে আমি ঘাবড়ে গেছি। মুষড়ে পড়েছি এমন কথা কেউ যদি ভেবে থাকেন তবে কিন্তু আমার প্রতি অবিচারই করা হবে। কারণ, পথে নামার সময় আমিতো মোটামুটি জেনেই এসেছিলাম, আমার মন পছন্দ–ভালো-লাগা মিষ্টি মধুর ছোট্ট গ্রামটার হদিস যদি নেহাৎ না-ই পাই, ছোট্টমিেট্ট ওলন্দাজ খামার বাড়ি বা কোনোরকমে মাথা গোঁজবার মতো ব্যবস্থা যা হোক একটা না একটা হয়েই যাবে। যদিও চোখের সামনে জনবসতির চিহ্নও নেই।
সত্যি এমন সঙ্কটজনক একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও আমি এতটুকুও ঘাবড়ে যাইনি। বরং মনকে এই বলে শক্ত করে বেঁধেছি, যদি কোনোরকম উপায় না ই হয় তবে…ক্যাম্বিসের ব্যাগটাকে বালিশ হিসেবে ব্যবহার করে, আর একমাত্র সঙ্গি কুকুরটাকে পাহারায় মোতায়েন করে খোলা আকাশের তলায় ঘুমিয়ে মজা লোটার জন্যও আমি মানসিক প্রস্তুতি অনেক আগেই নিয়ে রেখেছি।
তাই তো আমি কোনোরকম উদ্বেগ উৎকণ্ঠার শিকার না হয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে দুলকি চালে পথ পাড়ি দিয়ে চলেছি। এমন সময় হঠাৎ-ই আমার নজরে পড়ল একটা ঘাসের আস্তরণে মোড়া জমি। আর অন্যান্য ঘাসগুলো সে জমিটা থেকে একটু বিচ্ছিন্ন, গাড়ি-চলার পথের দিকে এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে।
সামান্য ঝুঁকে আবছা আলোয় প্রায় ঢেকে-থাকা পথটার দিকে অনুসন্ধিৎসু চোখে ব্যাপারটাকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করলাম।
হ্যাঁ, আমার অনুমান অভ্রান্তই বটে। গাড়ির চাকা চলার প্রায় অস্পষ্ট চিহ্ন চোখে পড়ল। মাথার ওপরের গাছের ডালপালা ঝুঁকে পড়েছে। তবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেনি যে, তারা পাহাড়ি গাড়ি চলার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে এগিয়ে-যাওয়া পথটাকে দেখতেও অসুবিধা হলো না। তবে পথ বলতে আমরা যা বুঝি এটা কিন্তু ঠিক সে রকম নয়। তবে চাকার চিহ্ন যে রয়েছে এতে তিলমাত্রও সন্দেহ নেই। আর তা প্রায় অস্পষ্ট হলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এখান দিয়ে মাঝে মধ্যে গাড়ি চলাচল করে।
