একটু আগে মি. স্টিফেন্সের আলোচ্য গ্রন্থের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আর কৌতূহলপূর্ণ যে জায়গার কথা বলেছি, আবার সে প্রসঙ্গে ফিরে যাওয়া যাক। তার একান্ত ইচ্ছা ছিল, একবার মাউন্ট সিনাই দর্শনে যাবেন। সেখানকার দ্রষ্টব্যগুলো দেখে, যাবেন পবিত্রভূমি দর্শনে।
তিনি এ ভ্রমণ সারতে গিয়ে সোজা পথে না গিয়ে মরুভূমির বিপদসঙ্কুল পথেই অগ্রসর হবেন। এরকম ইচ্ছার পিছনে কারণও রয়েছে যথেষ্ট। কারণ, দৈববাসীর অভিসম্পাত আজও সেখানে কার্য করা হয়ে চলেছে আর স্থানটা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃতও হয়নি। জায়গাটার নাম ইডুমিয়া–ইডুমিয়া দেশ।
ভবিষ্যদ্বাণী সম্বন্ধে মি. স্টিফেন্সকে তখনই চিন্তা-ভাবনা করতে হয়েছিল।
এমন বহু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে যা হুবহু বাস্তবে পরিণত হয়ে যায়। একটা কথা মনের গোপন করে উঁকি দেয়, সমগ্র খ্রিস্টান জগতকে একত্রিত করা, আর যাতে একই নীতি অনুসরণ করে চলে তারই জন্য যেন ভবিষ্যৎ কথাগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এটা যখন হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হয়, ব্যাপারটা কুয়াশার আড়ালে চাপা পড়ে রয়েছে বুঝতে পেরেও অবিশ্বাসকে কেউ বাড়তে তো দেয়ই না, সাধ্যমত চাপা দিয়ে রাখতেই সচেষ্ট হয়। আর অধীর প্রতীক্ষায় থাকে, ভবিষ্যদ্বাণী যদি ফলে যায় ফলুক। কারো পক্ষে এমন প্রগাঢ় ভবিষ্যৎ-জ্ঞান থাকতে যে পারে না, তা কি আর বুঝতে পারা যায় না।
এবার ইমুডিয়া দেশ সম্পর্কে সে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে সে প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করা যাক।
বংশ পরম্পরায় এ অঞ্চল দুর্ভেদ্য থাকবে। একেবারে এমন দুর্গম অঞ্চল হয়ে থাকবে, যার ফলে কোনোদিনই এর ওপর দিয়ে মানুষের পক্ষে যাতায়াত করা সম্ভব হবে না।
এ দেশটা বকজাতীয় লম্বা গলাওয়ালা বারখোর্যান্ট পাখিদের দখলে থাকবে বছরের পর বছর ধরে। আর দাঁড় কাক আর পেঁচার দলও সেখানে পরমানন্দে দাপাদাপি করে বেড়াবে। আর এ বিস্তীর্ণ প্রান্ত জুড়ে শুধু পাথর আর পাথর বিরাজ করবে আর পদে পদে থাকবে অফুরন্ত বিভ্রান্তি।
এ উষার ভূমি বাইরের কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে শত ডাকাডাকি করলেও সে এ পথ মাড়াবে না। শুধু কি এই? এখানে রাজকুমার বলেও কারো অস্তিত্ব থাকবে না।
যত সব প্রাসাদ সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেগুলোতে ক্রমে কাটা জাতীয় গাছ গজাবে, আর এক সময়ে সেগুলো ক্রমে পুরো প্রাসাদই ঢেকে ফেলবে। আর দুর্গে বিচুটি ঝোঁপ গজাবে এবং তা পুরো দুৰ্গটাকেই এক সময় ছেয়ে ফেলবে।
ড্রাগন আর পেঁচার দল এখানে আধিপত্য বিস্তার করবে। আর এক সময় পুরো অঞ্চালটাই তাদের শাসনাধীন হয়ে পড়বে।
উষার ভূমির হিংস্র পশুর সঙ্গে নিকটবর্তী অঞ্চলের বন্যপশু প্রায়ই বিবাদে লিপ্ত হবে। তাদের তীব্র হুঙ্কারে আকাশ-বাতাস কেঁপে কেঁপে উঠবে।
মজা লুটবে শকুন-শকুনি। তারা মৃত পশুর মাংসে মজা করে ভোজ সারবে।
আমার অভিশাপে মাউন্ট সিনাই পর্বত জর্জরিত হবে। আর এরই ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল বছরের পর বছর ধরে জনমানবশূন্য হয়ে শ্মশানের মতো হয়ে থাকবে।
সেখানে যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। কেউ যদি নেহাৎ সেখানে যাওয়র জন্য জেদ ধরে তবুও তার পক্ষে কিছুতেই লক্ষ্যে পৌঁছনো সম্ভব হবে না, পথ ভুল করে অন্যদিকে ধাওয়া করবে। যাদের মরুভূমিতেই জন্ম, আর মরুভূমির বালির ওপরেই বেড়ে উঠেছে, দুর্ধর্ষ সে আরববাসীরাও এ অঞ্চলে আসার নামে শিউরে উঠবে। কোনোকিছুর বিনিময়েও তাদের সেখানে যাওয়ার জন্য রাজি করাতে পারবে না।
এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলটা এমন ভয়ঙ্কর অভিশাপগ্রস্ত হওয়ার আগে এর উপর দিয়ে রোমান রাস্তা প্রবাহিত ছিল। এখান দিয়েই দলে দলে কাতারে কাতারে মানুষ দূরদেশে পাড়ি জমাত। এ পথে বিপদের সামান্যতম আশঙ্কাও থাকত না।
তখন কিন্তু কারো মনেই সামান্যতম আশঙ্কাও উঁকি দেয়নি যে, অদূর ভবিষ্যতে কেউ আর এ রাস্তা দিয়ে গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে না। এ রকম একটা বিশ্বাস্য কথা মনে স্থান দেওয়া তো দূরের ব্যাপার, কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি।
অভিশাপ উচ্চারিত হওয়ার সাতশো বছর পরের বিবরণীয় মারফত জানতে পারা। গেছে, তখনও রাস্তার ব্যবহার চালু ছিল।
তীর্থযাত্রীর দল অভিশপ্ত অঞ্চল ছুঁয়ে, পাশে অঞ্চলের ওপর দিয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে চলে গেছে। কিন্তু ভুলেও কেউ অঞ্চলটার ভেতরে যেতে উৎসাহি হয়নি।
কিন্তু সম্প্রতিকালের পর্যটকদের অভিশাপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অভিশপ্ত অঞ্চলটার ওপর দিয়ে নির্দিধায় পাড়ি দিয়ে তারা মৃত্যুর শিকার হয়েছে বটে, কিন্তু তাদের মৃত্যুর কারণ অভিশাপ নয়, অন্য কিছু।
অতএব এ-কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা চলে, সেখানে যেতে এবং সেখানে আসতে হলে কেউ-ই গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না। এ অভিশাপ পুরোপুরি কার্যকরী হয়নি। বরং বলা চলে, অভিশাপের ব্যাপারটা অসত্যই প্রমাণীত হয়েছে।
মি. স্টিফেন্স অভিশাপকে কেন্দ্র করে অন্য অর্থনির্ণয় করেছেন।
ইডুমিয়া পথের ব্যবহার বাণিজ্যপথ হিসেবে আর থাকবে না। এর সঙ্গে অভিশাপের কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে পথের গুরুত্ব কমে গেলে যা হয় এক্ষেত্রেও তা-ই হবে। বণিকদের কাছে পথের গুরুত্ব যেমন বাড়তে পারে, ঠিক একইরকমভাবে কমে যাওয়া তো বিচিত্র নয়।
অতএব অভিশাপের ব্যাপারটা নিয়ে, সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করে, মিছে তর্কে লিপ্ত হয়ে মি. স্টিফেন্সের একটা দ্বন্দ্ব সম্বন্ধে মতামত ব্যক্ত করে আমরা বরং আলোচনার ইতি টানি।
