বহিরাগতরা মিশর দখল করবে। দেশটাকে একেবারে ছারখার করে ছাড়বে। মিশরকে ধূলিস্যাৎ করে দেবে।
শুধু কি এই? রাজ্য হিসেবে মিশরের অবনিত ঘটতে ঘটতে একেবারে নিচে নেমে যাবে আর জাতি হিসেবে তারা আর কোনোদিনই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
আর প্রকৃতিও মিশরের বিরোধিতায় লিপ্ত হবে। প্রকৃতির নিমর্ম-নিষ্ঠুর খেয়ালের শিকার হয়ে মিশরের একটা বিশাল অংশ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। আর মরুভূমির বালির তলায় তলিয়ে যাবে মিশরের একটা বিশাল জনপদ।
দু-এক শতক নয়, দু হাজার বছর ক্রমান্বয়ে ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা যাচাই হয়ে আসছে। প্রমাণীতও হয়েছে।
দেখা গেছে, কেবলমাত্র পিরামিডের পর পিরামিড সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করে চলেছে। যাদের এতটুকু ক্ষয় নেই, ধ্বংস তো নেই-ই।
আর এখানে-ওখানে শহরে পড়ে কাদামাটির তৈরি দুর্বল কিছু সংখ্যক বাসগৃহ।
অতীতেরই কেবল নয়, বর্তমানের মিশরের সঙ্গেও সুদৃঢ় অতীতের রাজশক্তির দাপট আর গৌরবময় কৃতিত্বের কোনো সাদৃশ্যই খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেশটা ঘুরে এলে মনে হবে, এ যেন মিশর নয়, অন্য কোনো দেশ, অন্য কোনো রাজ্য।
আবার এ-কথাও ভুললে চলবে না, মিশর দেশটা সম্বন্ধেই এমন ভবিষ্যদ্বাণী আছে যার সত্যতা আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি, বাস্তবরূপ পায়নি।
কি সে ভবিষ্যদ্বাণী, যা আজ পর্যন্ত বাস্তবরূপ পায়নি? সেটা হচ্ছে, সারা পৃথিবীটা খুশিতে ডগমগ হয়ে পড়বে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ার যোগাড় হবে, মিশর চিরদিন সবার তলায় পড়ে থাকবে না। পরমপিতা তার নির্মম নিষ্ঠুর প্রহারে মিশরকে জর্জরিত করবেন। তারপর আবার নিজেই প্রহারের পর প্রহার করে তাকে শান্ত করবে, বিপদের সূর্য অস্তমিত যাবে, পূর্ব আকাশে দেখা দেবে সুদিনের রক্তিম সূর্য।
মিশরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিশ্বাস করা যেতে পারে, ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবরূপ পেতে শুরু করেছে। ফ্যারগুদের রাজত্বকালেও যে মিশরের আদলে নতুন মিশরনির্মিত হতে শুরু হয়েছে।
আমি দীর্ঘদিন ধরে মিশরের প্রেক্ষাপটে লেখা বিভিন্ন পুঁথিপত্র পাঠ করে যে চিত্র দেখতে পেয়েছি তার উল্লেখ নিচে করলাম–
মিশরে দাসপ্রথা আজও বহাল তবিয়তে চলছে। দাস-ব্যবসায়ীদের কারবারও খুবই রমরমা। ক্রীতদাসদের দুটো বেশ বড়সড় নৌকায় বোঝাই করে নদীপথে নিয়ে যেতেও দেখা গেছে।
যে ক্রীতদাস তুর্কী-পরিবারে আশ্রয় লাভ করে তার ভাগ্য খুলে যায়। সে অন্যান্য দাস-দাসিদের চেয়ে বেশি আদরযত্ব পায়। আর সম্মান ও বিশ্বাসও সে বেশিই পেয়ে থাকে। কিছুদিন থেকে মনিবের আস্থাভাজন হতে পারলে এখন যেমন ক্রীতদাস স্বাধীনতা পেয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই স্বাধীন হয়ে যাওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র ব্যাপার ছিল না। মনিবের মেজাজ-মর্জির ওপরই নির্ভর করত, সে ক্রীতদাসই থেকে যাবে, নাকি স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে মুক্ত জীবনের স্বাদলাভে ধন্য হবে? আবার এমন ব্যাপারও ঘটতে দেখা গেছে, ক্রীতদাস মনিবের বিশ্বাসভাজন ও প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়ে তার কন্যাকে বিয়ে করে স্ত্রীরূপে লাভ করেছে। ক্রীতদাস হয়েছে জামাতা।
আর প্রাচ্যের মানুষের চাল-চলন আচার-আচরণের কোনো পরিবর্তনই হয়নি, পুরোপুরি আগের মতোই রয়ে গেছে। কিছু সংখ্যক জিনিস–পোশাক-পরিচ্ছদ, বাগধারা আর অনুষ্ঠানাদি পর্যটকদের চোখের সামনে একই ছবি ফুটে ওঠে। তখন তাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে বাইবেলের ভাষা আর ইতিহাসের ঘটনাবলি একে একে জেগে ওঠে।
ইউরোপের মানুষের মধ্যে বাড়ি-ঘর, বাগ-বাগিচা নির্মাণকৌশল আর আচার আচরণের পরিবর্তন প্রায়ই কম-বেশি হচ্ছে। কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলোতে এসব অপরিবর্তিতই থেকে যাচ্ছে। দু হাজার বছর আগে পরিস্থিতি যেমন ছিল আজও ঠিক তেমনই আছে।
প্রাচ্যের দেশগুলোতে অগ্রগতি রুখে দেওয়ার জন্য প্রয়াস প্রতিনিয়ত অব্যাহত রয়েছে। কিছুতেই যেন উন্নতি করতে দেওয়া হবে না, সে চেষ্টাই পুরোদমে চলছে। তা কিন্তু অবিশ্বাস্য রকম সীমিত রয়েছে, বাইবেল ইতিহাসের অঞ্চল এবং সমাদৃত অঞ্চলগুলোতে।
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, প্রায় সর্বত্র সভ্যতার বন্যা বয়ে চলেছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সভ্যতার অগ্রগতি সমান চলেছে। কিন্তু এখানে? এখানে সে সভ্যতার জোয়ার অন্যদিকে, অন্যপথে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। মূল স্রোত থেকে কিছুতেই যেন বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে না। যাকে সভ্যতা সংস্কৃতি বলে সে যে তিমিরে ছিল ঠিক সে তিমিরেই রয়ে গেছে।
আমরা এবার পাতা উলটে মি. স্টিফেন্সের লিখিত বিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক স্থানটার দিকে দৃষ্টি করি, দেখাই যাক না তিনি সেখানে কোন মূল্যবান তথ্যের উল্লেখ করেছেন?
হ্যাঁ, এই তো একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, মাউন্ট সিনাই-এ যাবার তীব্র বাসনা তার মনে ছিল। সেখানে থেকে পবিত্র ভূমি দর্শনের বাসনা ছিল। সেখানকার পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে সে মহাপুরুষকে প্রণাম জানাবেন।
মি. স্টিফেন লিখেছেন, মিশরে জলভ্রমণ ব্যয়বহুল তো নয়ই বরং খুবই সস্তা। যথেষ্ট আরাম ও আনন্দদায়কও বটে। সেখানে নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আরামে-আয়েসে সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখা যায়। আর ভ্রমণ খুবই আনন্দদায়ক বটে। সবচেয়ে বড় কথা, বিপদের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আর দশজন মাঝিমাল্ল নিয়ে নিজের দেশের পতাকা মাস্তুলের মাথায় উড়িয়ে নিশ্চিন্তে ভ্রমণ সারা যায়। কোনোরকম বিপদের ঝুঁকি এতে নেই। আর ভাড়া? মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ ডলারের বিনিময়ে এক মাসের জন্য বেশ বড়সড় একটা নৌকা ভাড়া মেলে।
