এতকিছুর পরও বর্তমানে পঞ্চাশজন অধিবাসী আজও শহরটার বুকে বসবাস করছে। আর ক্রমান্বয়ে শহরটার উন্নতিও ঘটে চলেছে। আলেকজান্দ্রিয়া শহরটা লিণিয়া মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে, ভেন্টা খালের বাইরে অবস্থিত।
জলপাবনের সময় কেবলমাত্র ভেন্টা খালই নীলনদের পানি নিজ বক্ষে ধারণ করে, বয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল। আর আলেকজান্দ্রিয়া সে মিশরের সঙ্গে যোগসাজোস রক্ষা করে চলেছে। এ-কথা তখনকার মানুষ ভেবে নিয়েছিল।
আলেকজান্দ্রিয়া শহরের পত্তন করেছিল আলেকজান্ডার। তাই তারই নামানুসারে শহরটার এরকম নামকরণ হয়।
আলেকজান্দ্রিয়া শহরটার প্রতিষ্ঠার পিছনে দ্বিগ্বীজয়ী বীরের উদ্দেশ্য ছিল প্রাচ্য বিজয় নির্বিঘ্ন রাখা।
বর্তমানে আফ্রিকা বা সিরিয়ার উপকূল বরাবর একমাত্র নিরাপদ বন্দর হিসেবে, একমাত্র এ শহরটাকেই মনে করা যায়–আসলেও তাই। এক সময় এখানে অদ্ভুত বহু বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা ছিল। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই আলেকজান্দ্রিয়া বেশ বড়সড় একটা শহরে পরিণত হয়ে গেল।
শহরটার পরিধি পনেরো মাইল জুড়ে। নাগরিকের সংখ্যা তিনলক্ষ। প্রায় একই সংখ্যক পরিচালক-পরিচালিকা। সুদৃশ্য-মনোলোভা একটা রাজপথ, যা দু হাজার ফুট লম্বা। এটা শহরের একপ্রান্ত থেকে শুরু হয়ে অন্যপ্রান্তে গিয়ে শেষ হয়েছে।
শহরটার একপ্রান্তে অবস্থিত ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর আর অন্যপ্রান্তে অবস্থিত ম্যারিওটিক হ্রদের বন্দর।
সমুদ্র উপকূল বরাবর আর একটা রাস্তা রয়েছে। এটা প্রধান রাজপথকে সমকোণে খণ্ডিত করেছে। শহরে আর যা-কিছু দেখা যায়, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুদীর্ঘ একটা রথ দৌড়ের ময়দান আর বিশাল সাকার্স। আর দেখা যাবে, দু শশা ফুটেরও বেশি দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট একটা ব্যায়ামাগার। আরও রয়েছে, আমোদপ্রমোদপ্রিয় অধিবাসীদের জন্য প্রচুর সংখ্যক থিয়েটার আর রয়েছে সুবিশাল হামাম–যাকে বিলাসবহুল স্নানাগার আখ্যা দেওয়া হয়।
অতীতে এক সময় সারা দেন সৈন্য আলেজান্দ্রিয়া শহরটাকে দখল করে নেওয়ার পর তাদের সেনাপতি ওমর খন্দিকাকে জানিয়েছিল, এখানকার ধনদৌলত আর সৌন্দর্যের হিসাব-নিকাশ করা সম্ভব নয়। কিছুতেই নয়।
যখনকার কথা বলছি, শোনা যায় তখন নাকি সেখানে ছিল চার হাজার প্রাসাদ, চার হাজার স্নানাগার, চার হাজার নাট্যশালা অথবা গণমিলন ভবন, বারো হাজার হরেক রকম দোকান আর ইহুদি ছিল।
আলেকজান্দ্রিয়া শহরটা মুসলমানদের হাতে পড়ার সময় থেকেই নাকি সবকিছুই দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ইন্ডিয়ায় যাওয়ার ঘুর পথের সন্ধান লাভ করার
পর আলেকজান্দ্রিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের গৌরব ক্ষুণ্ণ হতে থাকে।
বর্তমানে আলেকজান্দ্রিয়া শহর তুর্কি অধিকারে যাওয়ার পর আবার ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি নয়, শাসনব্যবস্থাও সুদৃঢ় করে তোলা হয়। সব মিলিয়ে দেশটার হৃত গৌরব অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।
১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের কথা।
সে বছর মি. স্টিফেল আলেকজান্দ্রিয়া যান। সেখানে কিছুদিন থেকে সেখানকার রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে আন্তরিকতার সঙ্গে খোঁজ-খবর নেন। তারপর উপরে উল্লিখিত বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ করেন।
সে বছর তিনি নীল নদের তীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। উক্ত বিবরণাদি ছাড়া তিনি আর যা-কিছু লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তা পড়ে মিশর সম্বন্ধে বহু তথ্য জানা যায়। সবচেয়ে বেশি উপকৃত হওয়া মিশরের ভবিষ্যৎ জানা সম্ভব হওয়ার জন্য। মিশরের ভবিষ্যৎ কি হবে, এ প্রসঙ্গে বহু নির্ভরযোগ্য মূল্যবান তথ্য তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন।
তারা বাইবেল সম্বন্ধে উৎসাহি পাঠকরা তার লিখিত বিবরণী পাঠ করে শুধুমাত্র বিশেষ উপকৃত হবেন তা নয়, বিশেষ গুরুত্বও উপলব্ধি করবেন।
তার বিবরণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তিনি যা কিছু লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তার সে বক্তব্য খুবই পরিষ্কার, কোনোকিছুতেই ঝাপসা ভাব নেই। বক্তব্য এতটুকুও অস্পষ্ট নয়।
প্রাচীনকালে রাজারাজরাদের আমল যখন রীতিমত রমরমা ছিল, উন্নতির চরম শিখরে উঠেছিল, তখনই ভবিষ্যৎ দ্রষ্টারা সুস্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন, সিংহাসনে আসীন থাকতে থাকতেই রাজবংশ একেবারেনিমূর্ল হয়ে যাবে। তাদের বংশে বাতি দেওয়ার মতো কেউ-ই জীবিত থাকবে না।
এমন স্পষ্টভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা কি করে যে সম্ভব, ভেবে পাওয়া যায় না। তাই একে নিতান্তই অসম্ভব বলে মনে হয়। অতএব তা বিস্ময় উৎপাদন করার মতো কথাই বটে।
মোজেস যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং মানুষের প্রতি অসীম মমত্ববোধ ও সহানুভূতির পরিচয় দিয়েছিলেন, তার আগেই কি মিশর প্রকৃতই একটা রাজ্য ছিল, সেখানকার সিংহাসনে তখন পর্যন্ত কতজন বসেছিলেন, আর কে কত বছর রাজত্ব করে গেছেন, সবই সহজ-সরল ভাষায় ব্যক্ত করে গেছেন। আর সে সব তথ্য এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লেখা হয়েছে, যার ফলে কোনো উলেখযোগ্য তথ্যই বাদ পড়তে পারেনি।
মিশরে রাজার কোনো অস্তিত্বই আর থাকবে না। এ ভবিষ্যদ্বাণী করার আগে মিশরের সিংহাসন কোনোদিন প্রায় দু হাজার বছরের মধ্যে একটা দিনের জন্যও খালি যায়নি। তবুও রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, মিশরে দেশবাসীর কেউ অর্থাৎ নিজেদের কেউ কোনোদিই সিংহাসনে বসতে পারবে না।
