জাহাজ থেকে নামবার পোশাকের সে থলেটা হঠাৎ জলে পড়ে যায়। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে সেটা পানিতে তলিয়ে গিয়ে একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেল।
দোকান থেকে যাত্রা করার আগে মিস বডফিন কিন্তু তাকে বার বার বলে গিয়েছিল, সে যেন কিছুতেই পুরনো কোট-প্যান্ট পরে তার সামনে না যায়।
আর দ্বিতীয় অঘটনটা হচ্ছে, জাহাজ থেকে হুড়মুড় করে নামবার সময় নায়ক ভাই আচমকা হোঁচট খেয়ে হাঁটুর তলাকার অনেকটা জায়গার চামড়া তুলে ফেলল। পরিস্থিতি এমন হলো যে, শল্য চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে উপায় রইল না। চিকিৎসক ওষুধপত্র যা দেবার তা তো দিলেনই উপরন্তু সর্বনাশের কথা যা শোনালেন তা হচ্ছে, তিনি বার বার সতর্ক করে দিলেন, বেশ কিছুদিন যেন প্রেমিকার সঙ্গে নাচানাচিতে না মাতেন। যদি তার নির্দেশ না মানেন তবে পা নিয়ে চূড়ান্ত ভোগান্তিতে যে তাকে পড়তে হবে এতে কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। সর্বনাশের ওপর সর্বনাশ।
আরও আছে, ব্যস্ত-হাতে একটা বোতলের ছিপি আচমকা ছুটে এসে পিটার স্নকের একটা চোখে আঘাত করল। ব্যস, সাময়িকভাবে সে কানা হয়ে গেল।
এসবের পিছন পিছন এল আর এক রকমের অঘটন। যাকে বলে একেবারে সোনায় সোহাগা। ব্যাপারটা ঘটল মি. লাস্ট নামক এক ভদ্রলোকের আকস্মিক আগমনের ফলে। মি. লাস্ট জুতোর কারিগর। জুতো তৈরি করে পেটের ভাত যোগার করে। কারবারটা জুতোর হলে কি হবে, দেখলে মনে হয় যেন জবরদস্ত এক মিলিটারি। তালগাছের মতো ইয়া লম্বা, চওড়াও সে তুলনায় কম নয় মানানসই। সব মিলিয়ে সুপুরষ না বলা গেলেও হেয় করার মতো চেহারা অবশ্যই নয়।
ভদ্রলোক করিতকর্মা সন্দেহ নেই। পিটার স্নক কাজকর্ম সেরে আসতে গিয়ে যে কদিন দেরি করেছিলেন এর মধ্যে মিস বডফিনের পিছনে ঘুরঘুর করতে লেগে যায়। কাজও হাসিল করে ফেলে। তার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলায় মেতে যায়।
শেষপর্যন্ত পিটার স্নক সেখানে পৌঁছনোর পর নাটক রীতিমত জমে উঠল। প্রেমিক দুজন আর প্রেমিকা একজন। কেউ, কারো অধিকার ছাড়তে রাজি নয়। অতএব জোর সংঘাত বেঁধে গেল।
নায়িকার দখল নিয়ে শেষপর্যন্ত দুই প্রেমিকের মধ্যে বিবাদ হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেল। প্রেমিক লাস্ট মোক্ষম এক ঘুষি হাঁকিয়ে দিল পিটার স্নকের মুখে। দেখতে দেখতে মুখ ফুলে একেবারে ফুলে হাড়ি হয়ে গেল।
বেগতিক দেখে বেচারা পিটার স্নক অসহায় অবস্থায় চোখের পানি মুছতে মুছতে জাহাজে গিয়ে উঠল। মিস বডফিনও তাকে পথের কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়ায় সেখান থেকে সরে পড়া ছাড়া পিটার স্নকের অন্য কোন গতিও তো কিছু রইল না।
যা-ই হোক, প্রেমিকার কাছ থেকে অবহেলিত পিটার স্নক পথের ভিখারী হয়ে জাহাজে চেপে বাড়ির দিকে রওনা হলো। সে যে জাহাজে চেপে প্রেমিকার সঙ্গে মিলিত হতে এসেছিল আবার সে জাহাজেই দেশে ফিরে গেল।
পথে এক জায়গায় জাহাজ নোঙর করল। বহু যাত্রী মজা লোটার জন্য জাহাজ ছেড়ে ডাঙায় নেমে গেল।
বেচারা পিটার স্নক তো পথের ভিখারী। মজা লোটার ব্যাপার স্যাপার তার শিকেয় উঠে গেছে অনেক আগেই। তার ওপর দেহ-খাঁচাটাও ভাঙাচোরা। তাই বাধ্য হয়ে সে মনস্থির করল, জাহাজে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেবে।
তার মাথায় হরেক রকমের দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত চক্কর মারছে। সবচেয়ে বড় চিন্তা, পরের দিনই এক পাওনাদারকে মোটা টাকা মেটাতে হবে। টাকাগুলো ঠিকমতো শোধ না দিতে পারলে রীতিমত ইজ্জৎ নষ্টের ব্যাপার।
পিটার স্নক দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। এটা-ওটা ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। একটু বাদে কয়েকজন খালাসি পিটার স্নককে নিয়ে রঙ্গ তামাশায় মেতে গেল। জোর করে তার গলায় মদ ঢেলে দিল। মদের নেশা তাকে জেঁকে ধরল। খালাসিরা ধরাধরি করে তাকে ফেলে দিল সমুদ্রের পানিতে। ঢেউয়ের মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল।
তারপর পিটার স্নককে তার দোকানে দেখা গেল। কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছে, ওই পাওনাদারের টাকাটা না মিটালে আর ইজ্জৎ থাকবে না।
তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দেখে কর্মচারীটা বোঝাতে লাগল–এর জন্য এত ভাববেন না। টাকা তো ক্যাশ বাক্সেই রয়েছে। আমি হিসাবপত্র দেখে টাকা মিলিয়ে রেখেছি। টাকা, কম পড়বে না।
ভালো কথা। তবে আমি মালপত্রের অর্ডার দিয়ে আসছি। তুমি দোকানেই থেকো। ইতিমধ্যে কেউ মালপত্র নিয়ে এসে আলমারিতে গুছিয়ে রেখো। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসব। কর্মচারীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে পিটার স্নক দোকান থেকে বেরিয়ে পথে নামল।
সে দোকান থেকে বেরিয়ে প্রথমেই গেল ব্যাংকে। সেখানে তার নামে টাকা যা জমা রয়েছে, প্রায় সবই তুলে নিল।
কোটের পকেটে নোটের তোড়া খুঁজতে খুঁজতে সে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এলো।
এবার হাঁটতে হাঁটতে পথের ধারের কয়েকটা বড় বড় মদের দোকানে ঢুকল। সব কটা দোকানে বড় বড় মদের বোতল অর্ডার দিয়ে আবার পথে নামল। তবে মদেও দোকানদারদের প্রাপ্য টাকাটা সব মিটিয়ে না দিয়ে অগ্রিম স্বরূপ অল্প-অল্প টাকা দিয়েছে।
পিটার স্নকের টাকা কোন ব্যাংকে জমা থাকে, সেটা সবারই জানা রয়েছে আর সব সময়ই তার নামে প্রচুর অর্থ জমা থাকে এ ব্যাপারেও সবাই নিশ্চিত। তাই বাকি টাকা মিটিয়ে দেবার জন্য কেউ ওজর আপত্তি করেনি।
