আমরা যে কেবলমাত্র প্রকৃত আবিষ্কারের ক্ষেত্রেই দারুণভাবে পিছিয়ে পড়েছি তা-ই নয়, শিল্পকলার দিক থেকেও আমাদের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে।
কোন আমেরিকান সমালোচককে সমালোচনা লিখতে বসে পাঠকদের কেবলমাত্র সমালোচনার কথার ফুলঝুড়ি ছাড়া আরও অনেক কিছু উপহার দেবার জন্য মানসিক দিক থেকে তৈরি থাকতে হয়।
সমালোচনা নিজেই একটা আকর্ষণীয় শিল্পে পরিণত হয়ে উঠুক, সমালোচনার দাবি নিরপেক্ষভাবে করতে পারে এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চিন্তাধারা কজনের ভেতরে আছে বলুন তো?
আমরা গল্প-সমৃদ্ধ ম্যাগাজিনের কথা লিখতে বসে নিজেদের অযোগ্যতার কথাই চূড়ান্তভাবে পাঠক-পাটিকার সামনে তুলে ধরি, ঠিক কিনা?
বড় জোর তিন-চারজন ছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে দক্ষ লেখক যে আরও থাকতে পারে তা আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবি না বা ভাবতেই পারি না। দেখুন, গল্পকথা লেখার প্রসঙ্গে আমেরিকান আর ইংরেজ লেখকদের তুলনা করার কাজেই যখন হাত দিয়ে বসলাম তখন এক ইংরেজ কথাশিল্পীর লেখা পিটার স্নক গল্পটার কাহিনী সংক্ষেপে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
পিটার স্নক ছিল এক বস্ত্র ব্যবসায়ী। বিশপগেটে সে একটা কাপড়ের দোকান চায়। সে নিজে আর একজন কর্মচারী মিলে দোকানটা চালায়। দোকানটা খুব বেশি বড়সড় না হলেও সাজানো গোছানো তো বটেই। আর কাপড়ও রাখে হরেক রকমের। কোন ক্রেতা একবার তার দোকানে ঢুকলে, পছন্দসই কাপড় মিলল না অজুহাত দেখিয়ে, কোন খদ্দেরকেই সাধারণত ফিরে যেতে হয় না।
পিটার স্নকই এ কাহিনীর মুখ্য চরিত্র। লোকটা বোকার হদ্দ, কিন্তু আত্মম্ভরী। যাকে বলে একেবারে নিরেট আহাম্মক। তবে লোক হিসেবে তাকে ভালো বলতেই হবে। কথাবার্তা মিষ্টি, ব্যবহার অমায়িক। একটা ব্যাপার কারো নজর এড়ায় না, দোকানী পিটার স্নক সর্বক্ষণ মুখের ভাব এমন করে রাখে, যেন দারুণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি, গোড়ার দিকে তার কারবার ভালোই চলছিল। অধিকাংশ সময়েই তার দোকানে খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকত। কিন্তু সে আর কতদিন? যতদিন না মিস ক্লারিন্ডা বডফিনেরর সঙ্গে তার আলাপ পরিচয় হয় ততদিনই তার কারবার রমরমা ছিল।
মিস বডফিনকে ঠিক যুবতি বলা চলে না। বরং যৌবনের প্রায় শেষ সিঁড়িতে পা দিয়েছে বলাই ভালো। তার বয়স বছর তিরিশের খুব বেশি কম হবে বলে মনে হয় না। তবে এক নজরে দেখেই মনে হয় দেহে যৌবনকে এখনও ধরে রেখেছে। মুখশ্রী সুন্দরই বলা চলে। আর কথাবার্তা চালচলন মনে দাগ কাটার মতো। সবদা হেসে হেসে কথা বলে। হাসি যেন মুখে সব সময় লেগেই থাকে।
মেয়েদের সৌখীন টুপি, ফিতে আর লেস প্রভৃতি তৈরির ব্যাপারে তার দক্ষতা প্রশংসার যোগ্য।
মিসেস বড়ফিন এসে পিটার স্নকের দোকানে চাকুরি নিল। ব্যস, খেল শুরু হয়ে গেল, জমেও গেল অল্পদিনের মধ্যেই। প্রেম আর অর্থোপার্জনের উচ্চাভিলাস বেঁটেখাট লোকটার মনটাকে টলিয়ে দিল। আগের মতো মন দিয়ে কারবার চালানো তার পক্ষে সম্ভব হলো না।
পিটার স্নক ভাবলেন, মিস বড়ফিনকে বিয়ে করে যদি ঘর বাধেন, যদি সহধর্মিনী হিসেবে সর্বক্ষণ কাছাকাছি পাশাপাশি পেয়ে যান তবে দোকানটার দুটো বিভাগ খুলে দেবেন।
দোকানটাকে দুটো ভাগ করে নিয়ে একদিকে মেয়েদের, আর অন্যদিকে ছেলেদের পোশাক পরিচ্ছদ রাখতে পারলে উভয় ব্যবসাই রমরমা হয়ে উঠবে। একই দোকানের পাশাপাশি বিভাগ থেকে যদি প্রযোজনীয় যাবতীয় পোশাক পরিচ্ছদ পেয়ে যায় তবে আর খদ্দেররা অন্য দোকানে যেতে উৎসাহি হবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিক্রিবাট্রা অনেকগুণ বেড়ে যেতে বাধ্য। আর দোকান ভাড়া দিতে হবে মাত্র একটার জন্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দোকান হবে দুটো, একঘরে দু-দুটো কারবার, এতে কাজকর্মও খুব আরামদায়ক হয়ে উঠবে।
এরকম ভাবনায় মশগুল হয়ে আমাদের নায়ক প্রেমের দিকে একটু-একটু করে গলা বাড়িয়ে দিতে লাগল।
মেয়েটা, মিস বডফিন একটু-আধটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে হলেও তার প্রেমে ক্রমে সাড়া দিতে আরম্ভ করল।
পিটার স্নক এবার থেকে যেখানে পাঁচ-দশজন জড়ো হয় সেখানে তার প্রেমিকা মিস বড়ফিনকে প্রায়ই নিয়ে যেতে আরম্ভ করল।
দিনের পর দিন মেলামেশার পর মিস বডফিন-ই একদিন প্রেমিক প্রবরকে প্রস্তাব দিল–চল, কোথাও থেকে বেরিয়ে আসা যাক।
পিটার স্নক প্রেমিকার কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত একটা প্রস্তাব পেয়ে যেন আনন্দে একেবারে আটখানা হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল বেড়াতে যেতে চাচ্ছ!
হ্যাঁ, এক জায়গায় দিনের পর দিন থাকায় খুব এক ঘেয়ে লাগছে। তাই ভাবছি কোথাও থেকে বেড়িয়ে এলে দুজনের মন একটু হালকা হবে।
প্রস্তাবটা নিঃসন্দে খুবই ভালো।
তবে চল, বেরিয়েই পড়া যাক।
কিন্তু কোথায় যেতে চাচ্ছ?
চল, মার্গেট ভ্রমণে যাওয়া যাক।
চমৎকার! তবে চল, কালই বেরিয়ে পড়া যাক।
আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হল, মিস বডফিন আগে যাত্রা করবে। তারপর খুবই জরুরি কিছু কাজকর্ম মিটিয়ে পিটার স্নক তার পিছন-পিছন রওনা হয়ে যাবে।
এদিকে পিটার স্লকের কাজকম মিটতে মিটতে জুলাই মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেল। এবার জাহাজ ধরে সে গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গেল। গন্তব্যস্থলে নিরাপদে পৌঁছেও পিটার স্নক দু-একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলল। সেগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, দোকান থেকে নতুন কায়দা কৌশলে তৈরি কিছু কোট-প্যান্ট সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। সবই নিজের ব্যবহারের জন্য।
