এতদিন তো নির্বিঘ্নেই পেরিয়ে গেল। কিন্তু এবারই তার নামকরণের একান্ত প্রয়োজন দেখা দিল। তার দীক্ষান্ত অনুষ্ঠানে কোনো-না-কোনো একটা নাম অবশ্যই দরকার হয়ে উঠল।
হ্যাঁ, আমার মেয়েটার নামকরণ অবশ্যই দরকার আর তা আমাকে করতেই হবে।
আমি প্রয়োজনের তাগিদে পুরনো ও নতুন, স্বদেশি ও বিদেশি বহু নামই মনে মনে আওড়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু হায়! তবে একটা পরলোকগতা, কবরে শায়িত মানুষের স্মৃতিকে বিঘ্নিত করার চিন্তা আমার মনের গভীরে বার বার ভেসে উঠতে লাগল কেন? কেন এমন একটা অভাবনীয় ব্যাপার আমার মাথায় ভিড় জমাল? কোন দত্যি-দানোর এ-কাজ? কোন দৈত্য এ নামটা উচ্চারণ করতে আমাকে প্রেরণা জোগাল? সে নামটা মনের কোণে ভেসে ওঠামাত্র আমার শরীরের সব কটা স্নায়ু একই সঙ্গে সচেতন হয়ে উঠল? আর আমার মাথা থেকে বুক অবধি লাল রক্তের স্রোত বইতে লাগল? কেন? কোন দৈত্য, কোন শয়তানের কারসাজিতে এমনটা হলো?
আমার বুকের গভীর প্রান্তে অবস্থানরত কোন শয়তানের প্রেরণায় আমি পবিত্র লোকটার কানে কানে প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করেছিলাম–মোরেল্লা?
কেবলমাত্র শয়তান বললে যথার্থ বলা হবে না, শয়তানের চেয়েও বড় কিছু যেন আমার সন্তানকেনিদারুণভাবে সঙ্কুচিত করেছিল, মৃত্যুর বিবর্ণতা তার আপাদমস্তক ছেয়ে ফেলল। সেই প্রায় না শোনা শব্দটা তার কানে যাওয়ামাত্র সে দারুণভাবে চমকে উঠল। অবর্ণনীয় একটা অস্বাভাবিকতা যেন হঠাৎ-ই তার মধ্যে ভর করল। আর কাঁচের মতো স্বচ্ছ চোখের মণি দুটোকে মর্ত্যলোক থেকে স্বর্গলোকের দিকে মেলে ধরেই আমাদের বংশের গর্ভগৃহের কালো মসৃণ পাথরের বেদীটার ওপর টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপরই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, এখানে, আমি এখানে!
খুবই স্পষ্ট আমি এখানে ওই সহজ-সরল কথা বাতাসবাহিত হয়ে আমার কানে এসে বাজল। তারপর কান থেকে গলিত সিসার মতো দ্রুত ধেয়ে গিয়ে আমার মস্তিষ্কে পৌঁছে গেল। বছরের পর বছর পেরিয়ে যাবে, কিন্তু সেদিনের স্মৃতি কোনোদিন, মুহূর্তের জন্যও আমার মন থেকে মিলিয়ে যাবে না।
আর ফুল এবং দ্রাক্ষালতার কথাও তো আমার অজ্ঞাত ছিল না। তবুও আমার দিন-রাত, আমার প্রতিটা মুহূর্তকে সাইপ্রেস আর হেমলক ছায়ায় ঢেকে রাখল।
আর স্থান এবং কালের কোনো হিসেবের অস্তিত্ব আমার মনে থাকল না। অদৃষ্টের নক্ষত্রগুলো আমার আকাশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চিরদিনের মতো বিদায় নিল। সুতরাং আমার পৃথিবী অন্ধকারের কালো ঘোমটার আড়ালে আত্মগোপন করল। পৃথিবীর যতসব মূর্তি চলন্ত ছায়ামূতির মতো অদ্ভুতভাবে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তাদের ভিড়ের মধ্যে আমি মোরেল্লাকে কেবলমাত্র মোরেল্লাকেই দেখি।
উফ! মোরেল্লা! মোরেল্লা! একটামাত্র কথা, একটামাত্র নামই বাতাসবাহিত হয়ে। আমার কানে এসে বাজতে লাগল। কিন্তু কোথায় মোরেল্লা! তার অস্তিত্ব কি করেই বা সম্ভব? মোরেল্লা যে পরলোকে পাড়ি জমিয়েছে। এ মাটির পৃথিবী ছেড়ে দূরে, বহু দূরে চলে গেছে।
মোরেল্লার নিসাড় দেহটাকে নিজের হাতে কবরস্থানে নিয়ে গেলাম। আর সেখানকার জমিতে দ্বিতীয় মোরেল্লাকে শুইয়ে দিলাম। সে সমাধিতে প্রথম মোরেল্লা নিশ্চিহ্ন। প্রথম মোরেল্লাকে সেখানে দেখতে না পেয়ে বিষণ্ণ, দীর্ঘ অট্টহাসিতে আকাশ-বাতাস ছড়িয়ে দিলাম।
ম্যাগাজিন রাইটিং পিটার স্নক
ইদানিং ম্যাগাজিন সাহিত্য সম্বন্ধে এক বই হাতে পেয়েছি। পড়লাম।
ম্যাগাজিন সাহিত্যে ফরাসি আর ইংরেজরা অনেক উন্নতি করেছে, সত্য বটে। তবে আমেরিকানদের চেয়ে তারা অনেক, অনেক বেশি এগিয়ে।
আমরা, আমেরিকানরা কি করি? আমরা অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে তা ছাপাই। তারপর তা মনোযোগ দিয়ে পড়ি।
আমরা ম্যাগাজিনের আত্মাকে বুঝতে পারি না–যার ব্যাখ্যা হয় না, সংজ্ঞাও নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, ম্যাগাজিনের ক্ষমতা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ম্যাগাজিনের ক্ষমতাকে আমরা খর্ব করে–দাবিয়ে রেখেছি। আবার সংবাদপত্রের ক্ষেত্রকেও আমরা একই রকমভাবে খর্ব করে রেখেছি। যে ক্ষেত্র অসীমতাকে সঙ্কুচিত করে আমরা সীমিত গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ রেখেছি।
ফরাসি আর ইংরেজরা তাদের ম্যাগাজিনকে বৈচিত্র্য দিয়ে শক্তিশালী করে তোলেনি, শক্তিশালী করেছে বিষয়ের উৎকর্ষতা দিয়ে। আর এভাবেই তারা আমাদের টপকে চলে গেছে। আর এ কারণেই আমরা পিছিয়ে না পড়ে পারিনি।
এবার আমেরিকান মাগাজিনের প্রসঙ্গে দু-চার কথা আলোচনা করা যাক। তাদের ম্যাগাজিন খুব কমই আমাদের মনে রেখাপাত করতে পারে। বিদেশি লেখা পড়লে আমাদের মন সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে, গলে যায়।
আর ম্যাগাজিনের লেখার ওপর কাজ সারা যায় না, বিবরণে যাওয়া দরকার হয়ে পড়ে–সেখানই তো প্রকৃত আবিষ্কার।
এখন ভেবে দেখা দরকার, প্রকৃত মৌলিকতা কি? আবেগ-উচ্ছ্বাস বা প্রেরণার আধিক্য কখনই প্রকৃত মৌলিকতা হতে পারে না। যদি একরম ভাব হয় তবে এটাই হবে সবচেয়ে বড় ভুল।
মৌলিক সৃষ্টি খুবই কঠিন, স্বীকার করতেই হবে। কারণ, গভীরভাবে ভেবেচিন্তে, ধৈর্য সহকারে অনেক, অনেক যত্নসহকারে মৌলিক কিছু লিখতে হয়।
আমেরিকানরা কেন লিখতে গিয়ে গভীরে যেতে, বিশদভাবে মনোভাব ব্যক্ত করতে পারেন না কেন? এর উত্তর একটাই–বেশ কিছু সংখ্যক আমেরিকান লেখক লিখতে বসে বিশদে যাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও ব্যর্থ হওয়ার পিছনে একটাই কারণ, পত্রিকার প্রকাশকরা লেখককে সম্মান দক্ষিণা এতই কম দেন যে, তাদের পরিশ্রম ও সময়ের দাম প্রাপ্য অনুযায়ী পান না। ফরে তাদের পোষায় না। এ কারণ তো অবশ্যই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, আর এ ছাড়াও অনেক খুবই সঙ্গত কারণের জন্য আমরা সাহিত্যের এই খুবই গুরুত্বপূর্ণ শাখায় যুগের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তবে এও খুবই সত্য যে, এ শাখাটার গুরুত্ব দিন দিনই দ্রুততালে বেড়ে চলেছে। আর এও আশা করা যাচ্ছে, অচিরেই সাহিত্যের যাবতীয় শাখার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। আর এটাই সম্ভব, এটাই স্বাভাবিক।
