তবে তার গর্ভের সন্তান–মৃত্যুশয্যায়, মৃত্যুর প্রায় পূর্ব মুহূর্তে সে যাকে প্রসব জন্মদান করেছিল, আর গর্ভধারিণীর ফুসফুস নিঙড়ে শেষ নিকাস ত্যাগ করার আগে পর্যন্ত সে নিশ্বাসই ত্যাগ করেনি। সেই সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তান, একটা কন্যা সন্তান, প্রাণে বেঁচে গেল।
দেহের দিক থেকে আর বুদ্ধি বিবেচনার বিচারে সে মেয়েটা অদ্ভুত রকমের বড় হয়ে উঠল। সত্যি বড়ই আশ্চর্য ব্যাপার! মেয়েটা যেন একেবারে তার পরলোকগতা মায়েরই কার্বনকপি। হুবহু প্রতিবিম্ব।
স্বীকার না করে উপায় নেই, আমি তাকে কেবল ভালোবাসতামই না, অন্তর থেকে ভালোবাসতাম। আমার মতো এমন গভীর ভালোবাসা পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষের মনে, পৃথিবীর অন্য কেউ, অন্য কোনো মানুষকে ভালোবাসতে পারে বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করতে পারতাম না।
হায়! কিছুদিন যেতে না যেতেই সে ভালোবাসার স্বর্গ ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল, ভালোবাসার স্বর্গ অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল।
জমাট বাঁধা আতঙ্ক, বিষাদ, আর দুঃখ-দুর্দশা চরম রূপ নিয়ে তার ওপর আছড়ে পড়ল। আমি তো এই একটু আগেই বলেছি, মেয়েটা দেহ আর মনে তর তর করে অদ্ভুত রকমের বড় হয়ে উঠল।
সত্যি সম্পূর্ণ সত্যি কথা, তার দৈহিক বৃদ্ধি এত দ্রুত ও এত বেশি ছিল যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তবে এও সত্য যে, তার মানসিক বৃদ্ধির এত দ্রুত প্রসারণ– সে চিন্তা ভাবনাগুলো আমার মনে এসে ঘাঁটি গেড়েছিল, তা ছিল ভয়ঙ্করতায় পরিপূর্ণ। ভয়ঙ্কর বড়ই ভয়ঙ্কর।
আমি যখন শিশুর চিন্তা-ভাবনার মধ্যে এক প্রাপ্তবয়স্কা নারীর মনোবৃত্তি আর শক্তির প্রকাশ আবিষ্কার করতে আরম্ভ করলাম, একটা শিশুর মুখে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর অভিজ্ঞতার কথা যখন শুনতাম, আর তার আয়ত ও চঞ্চল চোখের মণি দুটোতে প্রাপ্তবয়সের আবেগ-উচ্ছ্বাস-জ্ঞানের ছাপ ফুটে উঠত, তখন আমার মনের প্রতিক্রিয়া কি অন্যদিকে, মোড় নিতে পারত? আমি কি অন্য কোন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাকে দেখতে পারতাম?
আমার ভীত-সন্ত্রস্ত মনের আয়নায় এসব খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠল–তাকে যখন নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ তখন যদি ভয়ঙ্কর অথবা উত্তেজক কোনো সন্দেহ আমার অন্তরের গভীরে দানা বেঁধে থাকে।
তা যদি না-ও হয়, যদি আমার চিন্তা-ভাবনা যদি পরলোকগতা, কবরস্থ মোরেল্লার অদ্ভুত সব কাহিনী আর মতবাদের মধ্যে যদি ফিরে যায় তবে কী সেটা খুবই অবাক হবার মতো ব্যাপার হবে?
একমাত্র সে কারণেই তো সে প্রাণীটাকে পৃথিবীর সন্ধানী চোখগুলোর আড়ালে আমি নিয়ে চলে গেলাম। ভাগ্যদেবী যাকে ভালোবাসা দান করতে আমাকে বাধ্য করেছে। সত্যি এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায়ই আমার ছিল না।
আর এবার থেকে আমি আমার বাড়ির নির্জন-নিরালায় বসে বেদনাদায়ক উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সঙ্গে আমার সে নিজের মানুষটার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে লাগলাম।
এদিকে বছর যত পেরোতে লাগল আমি ততই দিনের পর দিন সে মুখটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে রেখে আর তার বাড়-বাড়ন্ত দেহপল্লবটার কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় সেদিনের সে শুটার সঙ্গে তার বিষাদক্লিষ্ট পরলোকগতা গর্ভধারিণীর সঙ্গেনিত্য নতুন মিল স্পষ্ট লক্ষ্য করতে লাগলাম।
তার মুখের হাসিটা যে অবিকল তার মায়েরই হাসির মতো তা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হতো, কিন্তু সে-মিল যখন পূর্ণ একাত্মতা হয়ে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠত তখনই আমার ভেতরটা আতঙ্কে কেঁপে উঠত, আমি দারুণভাবে কুঁকড়ে যেতাম। মোরেল্লার চোখ দুটোর সঙ্গে যে তার চোখ দুটোর হুবহু সাদৃশ্য থাকত তাহলে মেনে নিতাম, বরদাস্ত করতে পারতাম। কিন্তু সে চোখ দুটোতে, চোখের মণি দুটোতেও যে তার মায়ের, মোরেল্লার নিজের দৃষ্টি আর বিভ্রান্তিকর অর্থবাহী হয়ে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পেত।
আরও আছে, রেশমের সুতোর মতো কোঁকড়ানো সোনালি চুলের গোছা, সমুন্নত কপাল, সেই বিবর্ণ আঙুলগুলো, সেই একই মর্মভেদী বিষণ্ণসুরে কথা বলা আর সবার ওপওে উফ্, সবার ওপরে প্রাণবন্ত মনের মানুষটার মুখে পরলোকগতা মানুষটার কথা বলার কায়দা কৌশল আর ভাবাবেগের চিহ্ন–এসব চিন্তা-ভাবনা আর ভয়-ভীতি আমার ভেতরটাকে ঘুণ পোকার মতো কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে একেবারে ঝাঁঝরা করে দিত। হায়! সে মর্মান্তিক চিন্তাকীটের মৃত্যু নেই, বিনাশ নেই। উফ কী দুর্বিষহ যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত আমাকে অস্থির করে রাখত।
তার জীবনের দুটো পঞ্চাব্দ এমন অবর্ণনীয় দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। কিন্তু তবু আমার মেয়েটা তখন নামহীনই থেকে গেল। বুকের সবটুকু পিতৃস্নেহ নিঙড়ে একটা কথাই বার বার বিভিন্নভাবে বেরিয়ে আসত, আমার সন্তান, আমার মেয়ে আর আমার প্রিয়। এভাবেই তাকে সম্ভাষণ করা হতো, অর্থাৎ সম্ভাষিত হতো।
তার বরাতে এমন সম্ভাষণ কেন জুটত, তাই না? আসল কারণটা হচ্ছে, সে সব সময়, প্রতিটা মুহূর্ত কঠোর নির্জনতার মধ্যে থাকার ফলে অন্য কোনো সম্ভাষণ থেকেনিদারুণভাবে বঞ্চিত হয়েছে।
মোরেল্লা মাটির পৃথিবী, আমাকে, আমাদের ছেড়ে অন্যলোকে পাড়ি জমানোর সঙ্গেই তার নামটাও চিরদিনের মতো মুছে গেছে। আমিও কোনোদিন তার কথা মেয়ের কাছে কিছুই বলিনি। আমার পক্ষে বলা সম্ভবও ছিল না।
