আর মুহূর্তেই জন্য আমার অন্তরাত্মাটায় দয়া-মায়ার উদ্রেক ঘটতে-না-ঘটতেই পরমুহূর্তেই তার অর্থবহ চোখ দুটোর দিকে দৃষ্টিপাত করতেই আমার মনটা পীড়িত হয়ে পড়ত। আর মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করত, ঘুরে যেত মাথাটা। ঘুরে যেত বলতে আমি কী বলতে চাইছি, তাই না? কোনো মানুষ যখন খুবই গভীর কোন খাদ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করে তখন হঠাৎ তার মাথাটা যেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে, হঠাৎ-ই ঘুরে যায়, ঠিক তেমন ব্যাপারের কথা বলতে চাইছি।
তবে কি আমি এ-কথাই বলব যে, আমার সহধর্মিণী মোরেল্লা-র মৃত্যুই আমি মনে-প্রাণে কামনা করতাম? হ্যাঁ, করতামও তা-ই বটে। কিন্তু তার বিদেহী আত্মা আরও দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার পার্থিব জগতের আস্তানাটাকে আঁকড়েই থাকল।
বহু সপ্তাহ, বহু বিতৃষ্ণাসঞ্চারকারী মাস, আমার যন্ত্রণাকাতর স্নায়ুগুলো যতদিন না আমার মনকে বাগে আনতে সক্ষম হলো, যতই সময় পেরিয়ে যেতে লাগল ততই আমি হিংস্র জানোয়ারের মতো হয়ে পড়তে লাগলাম। শয়তান আমার মনকে বশ করে ফেলল। আমি প্রতিটা দিন, প্রতিটা ঘণ্টা, প্রতিটা বিরক্তিকর মুহূর্তকে অভিসম্পাতে ঝাঁঝরা করে দিতে আরম্ভ করলাম। হায় এ কী হলো!
এক সময় হেমন্তকাল এলো। হেমন্তের এক সন্ধ্যায় বাতাস যখন একেবারেই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, তখন আমার সহধর্মিণী মোরেল্লা আমাকে কাছে ডাকল। ডেকে তার বিছানার কাছে নিয়ে এলো। তখন পৃথিবীর ওপর হালকা একটা কুয়াশার চাদর আলতোভাবে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তপ্ত একটা আভা পানির উপরিতলের ওপর বিরাজ করছে।
আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। আমি এগিয়ে গিয়ে তার কাছে, মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ানো-মাত্র সে বলে উঠল–আজকের দিনটা বড় ভালো! কী চমৎকার, তাই না?
আমি প্রায় অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলাম–হুম!
সে পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চলল–সত্যি করে বলতে গেলে, অনেক দিনের মধ্যে বেঁচে থাকার, বা মৃত্যুবরণ করার উপযুক্ত একটা দিন, তাই না?
হুম!
লক্ষ্য করে দেখ, পৃথিবীর পুত্র সন্তানদের, জীবনের পক্ষে আজকের দিনটা খুবই প্রকৃষ্ট আঃ! স্বর্গের কন্যাদের মৃত্যুবরণের পক্ষে খুবই প্রকৃষ্ট দিন।
আমি এগিয়ে তার বিছানার একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁড়ালাম। তার শায়িত দেহপল্লবের ওপরে ঝুঁকে আলতো করে একটা চুমু খেলাম। তারপর আর একবার, তারপর আরও একবার।
সে বলে চলল–মৃত্যু আমার শিয়রে। আমি মরতে চলেছি, তবুও আমি বেঁচে থাকব।
আমি আঁতকে উঠে বললাম–মোরেল্লা মোরেল্লা!
আজ একটা কথা বলার খুবই দরকার মনে করছি।
মোরেল্লা। এত ইতস্ততের কি–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে আবার বলতে শুরু করল–আমাকে অন্তর থেকে ভালোবাসতে পারতে, এমন কোনোদিন কখনই আসেনি।
আমি একেবারে মিইয়ে গিয়ে বলে উঠলাম–মোরেল্লা!
সে পূর্ব প্রসঙ্গে জের টেনে বলে চলল–আমার কথা মনে রেখো, জীবনে যাকে তুমি অন্তর থেকে ঘৃণা করেছ, তাচ্ছিল্য করেছ, মৃত্যুর পর তুমি তাকেই পূজা করবে, বলে রাখছি।
মোরেল্লা! এ তুমি বলছ কি।
হ্যাঁ, আমি মরতে চলেছি; আবারও বলছি, আমি মরতে চলেছি। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে কিন্তু সে প্রেমের শপথ রয়েছে। উফ্! তুমি আমার জন্য আর কতটুকু ভালোবাসাই বা অন্তরে পোষণ করতে?
আমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলাম–মোরেল্লা!
আরও আছে, আমার আত্মা যখন দেহ-খাঁচা ছেড়ে চলে যাবে সন্তানটার মধ্যে তখনও প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে।
মোরেল্লা! মোরেল্লা!
হ্যাঁ, সত্যি বলছি, সন্তনাটা তখনই জীবিতই থাকবে। সে সন্তান তোমার আর আমার মোরেল্লার সন্তান।
মুহূর্তের জন্য থেমে, একটু দম নিয়ে মোরেল্লা আবার বলতে আরম্ভ করল– শোন–মনে রেখো, সামনের দিনগুলো থাকবে দুঃখে ভরপুর। অফুরন্ত দুঃখ-যন্ত্রণা। কেমন দুঃখ? যে দুঃখ অন্যসব অনুভূতির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, সাইপ্রাস গাছ যেমন যাবতীয় গাছগাছালির মধ্যে দীর্ঘ।
আমি করুণ দৃষ্টিতে তার ফ্যাকাশে মুখটার দিকে দৃষ্টি অব্যাহতই রাখলাম।
সে আগের মতোই বিষণ্ণমুখে বলে চলল–হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, দুঃখ, তোমার সামনে অন্তহীন দুঃখ অবস্থান করছে। কারণ, তোমার সুখের দিন যে ফুরিয়ে গেছে। পিস্তামের গোলাপ বছরে দুবার করে ফোটে, খুবই সত্য বটে। কিন্তু একই জীবনে দুবার সুখ আসে না। শুনে রাখ, সময়ের সঙ্গে তোমার আর লুকোচুরি খেলা সম্ভব নয়। খেরতে তুমি পারবে না। কিন্তু দ্রাক্ষালতা আর মেহীদির কথা মন থেকে মুছে ফেলে দিয়ে এ মর্তভূমিতে অবস্থান করেই তোমার কবরের নিচ্ছিদ্র অন্ধকার সহ্য করতে হবে, মুসলমানরা ঠিক যেমনটা মক্কায করে।
আমার সহ্যের বাঁধ ভেঙে গেল। আমি দু কানে হাত চেপে ধরে উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম–মোরেল্লা!
হ্যাঁ, যা বললাম, সবই সত্য, মিলিয়ে নিও।
মোরেল্লা! এমন ভয়ঙ্কর কথা তুমি কি করে জানলে?
মোরেল্লা আমার কথার জবাব দিল না। জবাব দেবার মতো অবকাশ পেল না। সুযোগ পেলে কি জবাব দিত, কে জানে?
যাক, আমার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই মোরেল্লা বালিশের ওপরেই তার মুখটা ঘুরিয়ে নিল। তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো মৃদু মৃদু, তিরতির করে কেঁপে উঠল। হ্যাঁ, এভাবেই সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করল।
মোরেল্লার মুখ থেকে কোনো কথা আর শুনতে পাইনি। মোরেল্লা আমাকে ও আমাদের পৃথিবী থেকে চিরদিনের মতো চলে গেল।
