আমরা গহ্বরটার ভেতরে যতই নামতে লাগাম ততই ভয়ঙ্কর পরিণামের জ্বলন্ত নিদর্শন দেখতে পেলাম। আর যতই দেখছি, কৌতূহলও যেন ততই বাড়তে লাগল।
আমার কৌতূহল উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। আর সে সঙ্গে পুরো ব্যাপারটা বোঝার আগ্রহও আমাকে কম পেয়ে বসল না। আর সে অফুরন্ত আগ্রহ বুকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এগিয়ে চলা অন্য সব দ্রব্য সামগ্রির দিকে অনুসন্ধিৎসু নজরে ঘুরে ফিরে তাকাতে লাগলাম।
বহু দ্রব্য সামগি দেখতে দেখতে এক সময় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমি না নিয়ে পারলাম না।
সিদ্ধান্ত তিনটি এরকম—
প্রথমত–বস্তুটা যত ভারি হবে সেটা ততই দ্রুত গতিতে নামতে শুরু করবে। দ্বিতীয়ত-সমান বিস্তৃত দুটো স্কুপের মধ্যে একটা গোলাকার, অর্থাৎ বলের আকৃতিবিশিষ্ট হলে আর অন্যটা যে কোনো আকৃতিবিশিষ্ট হলে বলের মতো গোলাকার বস্তুটি অপেক্ষাকৃত দ্রুত নামতে থাকবে। আর তৃতীয়ত সমান আয়তনবিশিষ্ট দুটো বস্তুর মধ্যে একটা যদি সমগোলাকার হয় অন্যটা যে কোনো আকৃতিবিশিষ্ট হয় তবে সমগোলাকার বস্তুটা অপেক্ষাকৃত ধীরে ধীরে নামতে থাকবে।
কেবলমাত্র এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথাই বা বলি কেন? আরও একটা বিস্ময়কর ঘটনাও এ সিদ্ধান্তগুলোর অনুরূপ–সিদ্ধান্তগুলোকে সমর্থন করল। ব্যাপারটা হচ্ছে, প্রতিবার চক্কর খাওয়ার সময় আমাদের নজরে পড়ল অতিকায় একটা পিপে অথবা জাহাজের মাস্তুল বা তার পাইপ অথবা ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে গোড়ার দিকে যে সব বস্তু আমার নজরে পড়েছিল সেগুলো বর্তমানে আমাদের থেকে বহু ওপরে অবস্থান করছে। মনে হলো প্রথমবস্থায় তারা যেখানে অবস্থান করছিল সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে চলে তো যায়নি বরং প্রায় একই জায়গাইে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এবার যা-কিছু কর্তব্য বলে মনে করলাম তার কিছুই করতে কিছুমাত্রও ইতস্তত করলাম না।
সবার আগে আমি মনস্থির করে ফেললাম, পানির পিপেটার সঙ্গে নিজেকে আচ্ছা করে বেঁধে ফেলব। তারপর একটু সুযোগ পেলেই সেটাসহ পানিতে লাপ দেব। আচ্ছা করে পিপেটার সঙ্গে বাঁধা-থাকার ফলে আমার পক্ষে পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকা মোটেও অসম্ভব হবে না। আমি পানিতে ভাসমান পিপেগুলোর দিকে ভাইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য চেষ্টা করলাম। আর সে সঙ্গে আমার ইচ্ছাটার কথাও তাকে বোঝাবার জন্য প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলাম।
ভাইটি হয়তো আমার বক্তব্য অনুধাবন করতে পারলে, বুঝেও যেন বুঝতে পারল না। এ-কথা বলার অর্থ–সে বার বার মাথা নেড়ে আমাকে বুঝিয়ে দিল, সে জায়গা ছেড়ে আসতে নারাজ। হয়তো ভবিষ্যৎ অজানা বিপদাশঙ্কায় তার মন কিছুতেই আমার প্রস্তাবে রাজি নয়।
কিন্তু আমাদের উভয়ের মধ্যে তখন যা ব্যবধান তাতে করে আমার পক্ষে তার কাছে যাওয়াও সম্ভব নয়। কাছাকাছি যেতে পারলে হয়তো বা আমার বক্তব্য তাকে। ভালোভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করাতেও পারতাম।
তাই অন্য উপায় না দেখে আমি নিজেকে পিপেটার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে পিপেটাসমেত সমুদ্রে লাফিয়ে পড়লাম।
হ্যাঁ, আমি যে আশা বুকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম কার্যত ঘটলও তাই। নইলে আমার পক্ষে তোমার কাছে এ কাহিনী ব্যক্ত করা কি করে সম্ভব হতো? অর্থাৎ আমি যখন তোমাকে কাহিনীটা বলার সুযোগ পেয়েছি, অতএব আশা করি তোমার বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়, পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়েই আমার পিতৃদত্ত জীবনটা রক্ষা পেয়েছিল, তাই না? অতএব আমি এবার যা-কিছু বলব আশা করি অবশ্যই তা অনুমান করতে পারছ। তাই তো তাড়াতাড়ি কাহিনীটার যবনিকার দিকে। এগিয়ে যাচ্ছি। আমি জাহাজ থেকে পিপেটাসহ ঝাঁপিয়ে পড়ার পরই অর্থাৎ প্রায় এক ঘণ্টা পরেই সেটা আমার অভিন্নহৃদয় ভাইকে নিয়ে উল্কার বেগে অনেকখানি নেমে গেল। আর এদিকে আমাকে নিয়ে পিপেটা আরও কিছুটা তলিয়ে যাবার পরই ঘূর্ণাবর্তের প্রকৃতিটা দ্রুত পাল্টে যেতে আরম্ভ করল।
আরও অতিকায় ও গভীর গর্তটার কালো মসৃণ খাড়া দেওয়ালটা অল্প অল্প করে কমে যেতে আরম্ভ করল। কমতে কমতে এক সময় অনেকখানিই কমে গেল।
এদিকে ঘূর্ণাবর্তের চক্কর মারা অবস্থাটা ক্রমে ধীর মন্থর হয়ে যেতে আরম্ভ করল।
আর অচিরেই ফেণারাশি আর রামধনুও বেপাত্তা হয়ে গেল। আরও অবিশ্বাস্য ব্যাপার যা আমার নজরে পড়ল তা হচ্ছে, গহ্বরটার তলদেশটা যেন ধীরে ধীরে হলেও ক্রমেই ওপরে উঠে যেতে আরম্ভ করল। বেশ কিছুটা ওপরে উঠেও এলো।
আকাশে ঘন কালো মেঘ কেটে গিয়ে আকাশটাও পরিষ্কার হতে হতে একেবারে নীল বর্ণ ধারণ করল। বাতাসের তীব্রতাও লাঘব হতে হতে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এলো। পশ্চিম আকাশের গায়ে থালার মতো গোলাকার চাঁদটা অত্যুজ্জ্বল রূপ নিয়ে চোখের সামনে দেখা দিল।
অচিরেই দেখলাম, আমি পানির ওপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছি অর্থাৎ ভেসে বেড়াচ্ছি।
পরমুহূর্তেই আমার চোখের সামনে লকডেনের তীরভূমি স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল। আর আমি অবস্থান করছি, মসকো-স্ট্রামের আবর্তের ওপরে।
সমুদ্র শান্ত থাকার কথা, কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের দরুণ সমুদ্র উথাল পাথাল করছে, উত্তাল-উদ্দাম তার রূপ। এক একটা ঢেউ যেন আকাশটাকে ছোঁয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ছে।
আমি ঢেউয়ের কবলে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। ঢেউ আমাকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে খালের মধ্যে ফেলে দিল। আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্ট্রামের খালে ঢুকে পড়তে বাধ্য হলাম। আর তারপরই হাজির হলাম, জেলেদের ডেরায়।
