গভীর পাণ্ডিত্য ছিল মোরেল্লার। আর তার প্রতিভা সাধারণ ছিল না। আর তার। মানসিক দৃঢ়তার তুলনা কেবলমাত্র অসুরের সঙ্গেই চলতে পারে।
তার গুণাবলী সম্বন্ধে আমার মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছিল বলেই তো বহু ব্যাপারেই আমি তার ছাত্র বনে গেলাম। তার সান্নিধ্যে আমার দিন কাটতে লাগল। তবে যা-ই হোক, অল্প দিনের মধ্যেই আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে, সে আমার কাছে এমন সব রহস্যসঞ্চারকারী লেখা নিয়ে আসত যেগুলোকে মোটামুটি জার্মান সাহিত্যের জঞ্জাল বলেই জ্ঞান করা হয়। তা হয়তো বা প্রেসবুর্গের শিক্ষালাভ করার জন্যই সম্ভব। হতো। সঠিক কারণ আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, তবে এগুলো ছিল তার প্রিয় আর। সর্বদা পাঠও করত। আর একটু একটু করে এগুলো আমার কাছেও প্রিয় হয়ে উঠল। কেন? কারণ কি? কারণ খুবই সহজ, দৃষ্টান্ত আর অভ্যাসের জন্যই এমনটা ঘটল। যা ই হোক, আমিও তার ভালোলাগা সাহিত্যের প্রতি আমার মনও মজে গেল।
যদি আমার নিতান্তই ভুল না হয়ে থাকে তবে বলছি, এসব ব্যাপার স্যাপারে। আমার বিচার-বিবেচনা বোধের তেমন কিছু করার ছিল না।
বিশেষ কোনো আদর্শের দ্বারা আমার চিন্তা-ভাবনাগুলো প্রভাবিত হয়েছে এমন। কথা অবশ্যই বলা যাবে না। অর্থাৎ আমি যে সব কাজ, যা-কিছু পড়াশুনা করতাম তার রহস্যময়তার তিলমাত্রও আমার মনকে আকর্ষণ করতে পারত না, মনে দাগ কাটার
তো প্রশ্নই ওঠে না। পড়তাম তবু পড়তাম, পড়তে হত।
সত্যি বলছি, আমার পাঠ-সঙ্গি, আমার পড়াশুনার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়েই আমি সম্পূর্ণরূপে নিজে উৎসাহি হয়ে, নিশ্চিন্তেই আমার স্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।
ব্যস, আমি শান্ত-সুস্থির মন নিয়ে আমার সহধর্মিণীর পাঠবিষয়ের ভেতরে রীতিমত ডুবে গেলাম।
আর তখন?নিষিদ্ধ পাঠ্য বিষয়গুলো যখন একান্তভাবে মন-প্রাণে সঁপে পড়াশুনায় মেতে যেতাম আর তখনই আমি বিশেষভাবে উপলব্ধি করতাম যে, একটা নিষিদ্ধ ভাব আমার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঠিক সে মুহূর্তেই আমার সহধর্মিণী মোরেল্লা তার বরফ-শীতল হাতটা আলতোভাবে আমার হাতের ওপর রেখে তৃপ্ত হতো। আর মৃত দর্শনকে নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হতো–তা জ্বলন্ত অক্ষরে আমার স্মৃতিতে লেখা হয়ে যেত।
আর তখন আমি একের পর এক ঘণ্টা তার কাছে, তার মুখোমুখি বসে কাটিয়ে দিতাম। অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে, উৎকর্ণ হয়ে তার মিষ্টিমধুর আর সুরেলা কণ্ঠস্বর শুনতাম। তারপর এক সময় তার সুরে ত্রাস প্রকাশ পেত, আমার মুখ ফ্যাকাশে বিবর্ণ। হয়ে যেত। তখন তার অভাবীয় স্বর আমার বুকের ভেতরে কম্পনের সৃষ্টি করত।
তারপর? তারপর ত্রাসে আনন্দ ফুর্তি মন থেকে ক্রমে মিলিয়ে যেতে যেতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। আর তখন অতিসুন্দর কুৎসিৎ হয়ে পড়ত। হিল্লোস যেমন জি হেন্না হয়ে ওঠে ঠিক এমনটার কথাই বলতে চাইছি।
উপরোক্ত বইপত্রগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা যে সব প্রবন্ধ বহুদিন যাবৎ মোরেল্লা আর আমার আলাপ আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু ছিল, তার যথাযথনির্ণয়, ও বিশ্লেষণ করার কোনো দরকার আছে বলে মনে করছি না। যাদের ধর্মীয় নীতিবাদ সম্বন্ধে ধারণা আছে, তারা সহজেই সেটা অনুধাবন করতে পারতেন।
আর ধর্মীয় নীতিবাদ সম্বন্ধে যাদের ধ্যান ধারণা নেই তারা ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারবেন না।
আমাদের আলোচনার অধিকাংশ বিষয়বস্তু কি ছিল বলছি, শেলিং-এর আইডেন্টিটি বাদ আর ফিটকের সর্বেশ্বর বাদ। আর অন্য যা-কিছু আলোচনা চলত তা নিতান্তই গৌণ।
মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কোনো মানুষের আলোচনা আমি সব সময়ই অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে শুনতাম। অবিচল চিত্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার সামনে বসে আমার এ ভালো-লাগা বিষয়টার আলোচনা শুনে যেতাম।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, মোরেল্লা যে উত্তেজিত ভঙ্গিতে তার বক্তব্যকে প্রকাশ করত তা আমার মনকে যারপরনাই আকর্ষণ করত। আর সে আকর্ষণেই আমি তার মুখোমুখি বসে ঘণ্টর পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম।
তবে এতদিনে সে লগ্নটা এসে গেল, যখন আমার সহধর্মিণীর আচার আচরণ যাদুমন্ত্রের মতো আমার মন প্রাণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে আরম্ভ করল।
তার সরু সুন্দর আঙুলের স্পর্শ, তার মিষ্টি-মধুর ক্ষীণ ও সুরেলা কণ্ঠস্বর, তার বিষণ্ণ চোখের মণি দুটোর চাকচিক্য এসবের কোনোকিছুই আমার তিলমাত্রও ভালো লাগত না, অর্থাৎ মোটেই বরদাস্ত করতে পারতাম না।
সে কিন্তু সবকিছুই আমার অনীহার ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারত। তবে কোনো অনুযোগই করত না। ব্যাপারটা এমন মনে হতো যে, সে যেন সবকিছু বুঝেও না-বোঝার ভান করে থাকত।
আর এও মনে হতো আমার মুখতা অথবা আমার মানসিক দুর্বলতা সম্বন্ধে সে অচেতন তো নয়ই, বরং সম্পূর্ণ সচেতন, তা সত্ত্বেও সে ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তাকেই নিয়তি বলত।
আর একটা ব্যাপারের এখানে উল্লেখ করার দরকার মনে করছি, আমার কিন্তু পরিষ্কার মনে হতো তার ওপর আমার আস্থা আর শ্রদ্ধা উভয়ই যে হ্রাস পাচ্ছে তার কারণটা আমার ঠিক জানা না থাকলেও সে ভালোই জানত। কোনো ব্যাপারে ভালো মন্দ কোনো কথাই সে বলত না। তবুও সেও তো এক নারী; দিন দিনই সে কেমন শুকিয়ে যেতে লাগল। ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে পড়তে লাগল, দুগালে লালচে ছোপ পড়ল। কপালের নীল শিরা-উপশিরাগুলো ক্রমেই ফুলে ভেসে উঠতে লাগল।
