হুম!
আমাদের এই যে বর্তমান মূর্তি, যে রূপ নিয়ে আমরা অবস্থান করছি তা তো প্রগতিশীর আর সাময়িক। আর আমাদের ভবিষ্যৎ! পরম, পূর্ণ অমর আমাদের ভবিষ্যৎ। পরম জীবনকেই আমরা পূর্ণ পরিকল্পনা বলে থাকি।
আমাদের মধ্যে তো কীটের রূপান্তর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাই বিদ্যমান।
আমাদের তো অবশ্যই সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। কিন্তু কীটের? তাদের তো এসম্পর্কে কোন ধারণাই নেই।
একটা কথা, একটু আগে তো আপনি স্পষ্টই বললেন, মেসমেরিক অবস্থাটা প্রায় মৃত্যুরই সম পর্যায়ের, ঠিক কিনা?
হ্যাঁ, তা-তো বলেছি-ই।
সেটা কি, খুলে বলুন।
দেখুন, আমি যখন বলছি, সেটা অবিকল মৃত্যুরই অনুরূপ, তখন আমি এটাই বলতে চেয়েছি, সেটা পরম জীবনেরই অনুরূপ। আশা করি এবার প্রশ্নটা আপনাকে বোঝাতে পেরেছি, কি বলেন?
তা তো বলেছিই।
ভালো কথা, আর একটা প্রশ্ন–মানুষ ছাড়া অন্য কোনো আদিম চিন্তাশীল জীবের আছে কি?
মি. ভি-র দিক থেকে আর কোনো জবাবই পাওয়া গেল না। তার মধ্যে একটা আকস্মিক পরিবর্তন প্রকট হয়ে পড়ায় তিনি বেশ কিছু সময় মৌনই রইলেন।
বেশ কয়েক মুহূর্ত নীরবতার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে মি. ভি বিরাট হাই তুললেন। তারপর আগের মতো ক্ষীণকণ্ঠেই বলতে লাগলেন মি. পি, সে বিরল বস্তুটাকে আমরা নেবুলা বলতে পারি না, যা অবশ্যই নেবুলা নয়, তাকে সে অগণিত প্রকারের পিণ্ডীকরণের মাধ্যমে নেবুলা, সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ আর অন্য মূর্তিতে রূপান্তর ঘটানো হয়। তার একমাত্র ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য তো হচ্ছে, অগণিত আদমি প্রাণীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের খাদ্যবস্তু যোগান দেওয়া, বুঝলেন?
মি. পি প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলেন–হুম।
দেখুন মি. পি, পরম জীবনের পূর্বক আদিম জীবনের প্রয়োজন যদি না-ই থাকত তবে তো এসব দেহ সৃষ্টি হওয়া অবশ্যই সম্ভব হত না। আদিম জীবনের
তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মি. পি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন–আপনি যে বক্তব্যটার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তা হচ্ছে–যদি আদিম জীবনের প্রয়োজন না থাকত তবে কোন তারাই থাকত না–তাই তো?
ঠিক তাই। আমি এটাই বোঝাতে চাচ্ছি।
সে তো বোঝলাম। কিন্তু এ প্রয়োজনটা কেন হল–যুক্তি কি?
জীবন আর বস্তু দুরকম–অজৈব জীবন আর অজৈব বস্তু। অজৈব জীবনের আর অজৈব বস্তুর–উভয় ক্ষেত্রেই ঐশ্বরিক ইচ্ছাশক্তিরই অনুরূপ একটা শহজ-সরল এবং অদ্বিতীয় বিধানের কাজকে প্রতিরোধ করার মতো আর কিছুই থাকতে পারে না, নেইও।
এ বাধা বা প্রতিরোধের প্রয়োজনে কি হয়েছিল?
জৈব জীবন আর বস্তুসমহূহের সৃষ্টি সম্ভবনাময় হয়ে উঠেছিল।
হ্যাঁ, আমার অসুখটা আমাকে আচ্ছা করে জেঁকে ধরেছিল। যে মুহূর্তে তার ব্যামোটা ক্ষীণকণ্ঠে কথাগুলো উচ্চারণ করছিল, তখন আমি তার মুখের দিকে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে তাকালাম। অদ্ভুত, একেবারেই বিস্ময়কর একটা ভাবভক্তি তার মুখে প্রত্যক্ষ করে আমি রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। স্বীকার করতে লজ্জা নেই আমি তখন ভয়ে কুঁকড়ে যাবার যোগার হলাম। আতঙ্কে আমার বুকের ভেতরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল যার থামার কোন লক্ষণই আমার চোখে পড়ল না।
ব্যাপার স্যাপার দেখে আমার মনে হল, মুহূর্ত মাত্রও দেরি না করে মেসমেরিক অবস্থা থেকে তাকে জাগিয়ে তোলা একান্ত দরকার।
আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করতে ভরসা পেলাম না। তিনি মেসমেরিক দশা কাটিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পান তার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি মিটিয়ে ফেললাম।
জাগিয়ে দেওয়ামাত্র তার সারামুখে অত্যুজ্জ্বল একটা হাসির ছোপ ঝিলিক দিয়ে উঠল।
তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যাওয়ার পরমুহূর্তেই তিনি ঘোলাটে চোখের মণি দুটো মেলে বার কয়েক এদিক-ওদিক তাকাল। তার পরই তার মাথাটা আচমকা বালিশের ওপর এলিয়ে পড়ল। তিনি মারা গেলেন। সব শেষ!
আমার চোখের সামনেই তার মৃতদেহটা এক মিনিটের মধ্যেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।
কৌতূহলবশত তার ভ্রতে হাত রাখলাম। দেখলাম জ্বটা মুহূর্তের মধ্যেই বরফ শীতল হয়ে গেছে।
সাধারণ পরিস্থিতিতে এজরায়ের হাত দিয়ে তার হাতটাকে মুঠো করে চেপে ধরার ফলে এমন অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটা সম্ভব।
তবে? আমি তবে এখন কি মনে করব, মেসমেরিক রোগগ্রস্ত লোকটা কথোপকথনের শেষের দিকের বক্তব্য যা-কিছু আমাকে বলেছিল, সবই ছায়ার জগৎ থেকেই বলেছিল?
মোরেল্লা
মোরেল্লা!
আমার বান্ধবী মোরেল্লা।
আমি যথেষ্ট অথচ বিশেষ অনুরাগের দৃষ্টিতেই আমার বান্ধবী মোরেল্লাকে দেখতাম।
বান্ধবী মোরেল্লার সঙ্গে আমার পরিচয় আজকের নয়, দীর্ঘ কয়েক বছর আগেই তার সঙ্গে আমার হঠাৎ-ই পরিচয় হয়েছিল। গড়ে উঠেছি যোগসূত্র।
কিন্তু তাকে প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই অজানা এক আগুনে আমার অন্তরাত্মা জ্বলতে আরম্ভ করল। কীসের আগুন, কেমনতর আগুন, তাই না? সে আগুন কিন্তু মোটেই প্রেম ভালোবাসার আগুন নয়। যা-ই হোক, সেটাই একটু-একটু করে বেড়ে গিয়ে এমন যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠল যে, আমার পক্ষে সে আগুনের প্রকৃতরূপ বুঝতে তো পারলামই না, আবার তাকে সামলে রাখাও সম্ভব হলো না।
এতকিছু সত্ত্বেও আমাদের দুজনের দেখা সাক্ষাৎ হত। আর ভাগ্যদেবী আমাদের দুজনকে একই ডুরিতে বেঁধে দিল।
সত্যি বলছি, ভালোবাসার কথা কিন্তু আমি ভুলেও কোনোদিন মনে ঠাই দেইনি। আর মুখে প্রকাশ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। তবে এটা সত্য যে, মোরেল্লা সমাজ সংসারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেবলমাত্র আমার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত হয়ে থেকে গেল। সে আমাকে সুখি করল। কীসের সুখ? কেমন সুখ? সে সুখ বাস্তবিকই বিস্ময়ের স্বপ্ন দেখার সুখের সঙ্গেই তুলনীয়।
