মি. ভি-ই প্রশ্নটার উত্তর দিয়ে প্রসঙ্গটাকে বোধগম্য করে দিতে গিয়ে বললেন আমি কণাবিহীন বস্তুর এ বৈশিষ্ট্যেরই ইঙ্গিত দিচ্ছি। কণাবিহীন বস্তু মূলত অবিভাজ্য–এক, না একক না। একে কেউ কেউ পরমৎ বলেও সম্বোধন করে থাকেন। তাই বলছি কি, যাবতীয় বস্তুকে নিজের মধ্যে নিয়েই তো সে একক। আমরা যাকে ঈশ্বর বলে থাকি, এ-বস্তুই তো তিনি।
ভালো কথা। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার একটু আপত্তি আছে।
আপত্তি? কেন? কী সে আপত্তি?
আপত্তিটা এখানেই যে, নিছক একটা বস্তু আর ঈশ্বর এক করে দেখার কথা বলছি। আপনার কি মনে হয় এমন একটা উক্তির মধ্যদিয়ে যথেষ্ট অশ্রদ্ধার ভাব প্রকাশ পাচ্ছে আপনার কি মনে হয় বলুন তো?
রোগী মি. ভি নীরব রইলেন। মি. পি-র তার মধ্যে কতখানি প্রভাব বিস্তার করল, কি আদৌ করল না, তা বুঝতে পারল না। আসলে মি. পি-র কথাটা তার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল সে-রকম কোনো ভাবই তার মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে না।
তাই রোগী মি, পি-র কথার তাৎপর্যটুকু হৃদয়ঙ্গম করার আগেই তিনি তাঁর কাছে। প্রসঙ্গটা আর একবার পারলেন। মি. ভি এবার মুখ খুললেন–মি. পি, বলুন তো, বস্তুকে মনের চেয়েও কম শ্রদ্ধা করা হবে কেন? কোনো যুক্তি কি আপনার জানা আছে, বলুন তো?
মি. পি এ প্রশ্নের উত্তরে কি বলবেন, ভাবতে-না-ভাবতেই মি. ভি-ই ক্ষণিক বিরতির পর আবার সরব হলেন–দেখুন মি. পি, আত্মাকে যে-সব শক্তিধারক জ্ঞান করা হয়, সে-সব শক্তির অধিকারী হয়েও ঈশ্বর তো মূলত বস্তুরই পরিপূর্ণরূপ, আপনার মনে কোনো দ্বিধা আছে কী?
মি. পি নীরব চাহনি মেলে তার দিকে তাকিয়ে থেকে আমতা আমতা করতে লাগলেন। আসলে তার প্রশ্নের সঠিক জবাব গুছিয়ে উঠতে পারলেন না।
তাকে নীরব দেখে মি. ভি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলেন–হুম।
মি. পি অনেক ভেবে-চিন্তে মুখ খুললেন–আপনি তো এ-কথাই বলতে চাইছেন, যে, কণাবিহীন বস্তু চলমান হয়ে পড়লেই সেটা চিন্তার রূপ পায়, ঠিক কিনা?
হা, মোটামুটিভাবে আমি এটাই বলতে চাইছি। সত্যি কথা বলতে চাইছি। সত্যি কথা কি, এ-চলমানই তো সার্বিক মনের সার্বিকচিন্তা। এই চিন্তাই তো সৃষ্টির মূলে কাজ করে থাকে, অর্থাৎ এ-চিন্তাকেই আমরা বলব সৃষ্টির কারণ।
হুম।
অতএব আমরা বলতে পারি, যাবতীয় সৃষ্টিবস্তু তো ঈশ্বরেরই চিন্তার ফসল।
তবে আপনি এ-কথাটাকে বলছেন, মোটামুটিভাবে এই তো?
ঠিক এটাই আমি বোঝাতে চাইছি–সার্বিক মনই হচ্ছে ঈশ্বর।
তারপর? আর কিছু?
হ্যাঁ আরও আছে, নতুন ব্যক্তি বিশেষের জন্য বস্তু অত্যাবশ্যক।
কিন্তু আপনার বক্তব্য অনুযায়ী আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি–আপনি কিন্তু বর্তমানে বস্তু আর মন-এর কথা তত্ত্ববিদদের মতোই ব্যক্ত করছেন–ভুল বলেছি?
না। ঠিকই বলেছেন বটে। কেন এমনটা বলছি–তাই তো জানতে চাইছেন?
হ্যাঁ, ঠিক এটাই আমার জিজ্ঞাস্য। বলুন, এ-বিষয়ে আপনার মত কী?
শুনুন তবে বলছি–বিভ্রান্তি এড়াবার জন্যই আমাকে এ-পথ বেছে নিতেই হয়েছে। আমি যখন মন কথাটা উল্লেখ করি তখন পরম বস্তু অর্থাৎ কণাবিহীন বস্তুকেই বোঝাই। আর যখন বস্তু কথাটা ব্যবহার করি তখন পরম বস্তু ছাড়া অন্য সবকিছুর কথা বোঝাই।
তবে দেখা যাচ্ছে, আপনি এ-কথাই বলছিলেন যে, বস্তুর প্রয়োজন নতুন ব্যক্তিত্বের জন্য–ঠিক কিনা?
হুম্। এ-কথা তো বলছিলাম।
কারণ কী, দয়া করে বলবেন?
অবশ্যই। যখন মন একীভূত হওয়ার পরিবর্তে অস্তিত্বশীল হয়, সে তো তখনই ঈশ্বর। কেমন করে–জানতে চাইছেন? ঐশ্বরিক মনের অংশকে চিন্তাশীল ব্যক্তি সত্ত্বাকে সৃষ্টি করার তাগিদে দেহধারী করে তোলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
তবে ঈশ্বর সম্বন্ধে আপনার বক্তব্য–দেহবিমুক্ত মানুষই হচ্ছেন ঈশ্বর এই তো?
দীর্ঘ সময় ধরে ইতস্তত করে মি. ভি এক সময় মুখ খুললেন–এমন কথা তো আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।
কেন? সম্ভব নয় কেন?
কি করে বলব? এ তো পুরোপুরি স্ববিরোধী কথা।
আপনি তো এ-কথা অবশ্যই বলেছেন–দেহ খাঁচা থেকে মুক্ত হলেই মানুষ ঈশ্বর হয়ে যায় বলেননি?
অবশ্যই, অবশ্যই বলেছি। শুধু বলেছি নয়, আরও দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছি– এটাই সত্য। দেহ-খাঁচা থেকে মুক্তি পেলেই, মানুষ ঈশ্বর হয়ে যায়, ব্যক্তি হয়ে যায় বৈশিষ্টহীন।
কিন্তু মানুষ কি কখনও এভাবে দেহ-খাঁচা বিমুক্ত হতে পারে?
না, তা অবশ্য পারে না, অন্তত পারবেও না কখনই। আরে, মানুষ যে একটা। প্রাণী। প্রাণীরাই তো ঈশ্বরের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা। আর চিন্তার স্বরূপই হচ্ছে, তা অপরিবর্তনীয়–এবার বুঝলেন কী?
না, মাথায় ঠিক ঢুকল না তো।
কিছুই বুঝতে পারলেন না?।
সে রকমই তো মনে হচ্ছে। আপনি বলছেন, মানুষের পক্ষে কোনোদিনই দেহখাঁচাকে ছাড়া সম্ভব হবে না, তাই না?
কোনোদিনই দেহহীন হওয়া সম্ভব হবে না।
আমি যেন কেমন ধন্ধে পড়ে যাচ্ছি।
ধন্ধ?
হ্যাঁ। মানে আমার সবকিছু কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। দয়া করে একটু খোলাসা করে বলবেন কি?
বলছি তবে শুনুন। দুপ্রকার দেহের অস্তিত্ব বর্তমান।
দু প্রকার!
হ্যাঁ। এক প্রকার হচ্ছে, আমি আর দ্বিতীয় প্রকার সম্পূর্ণ। মনে করতে পারেন কীট আর প্রজাপতির দুটো অবস্থার মতো। আমরা কাকে মৃত্যু আখ্যা দিয়ে থাকি, বলতে পারেন?
মি. পি-কে নীরব দেখে মি. ভি-ই আবার বলতে আরম্ভ করলেন। আমরা যাকে মৃত্যু আখ্যা দিয়ে থাকি সেটাকে আসলে বেদনাময় রূপান্তর ছাড়া আর কি-ই বা ভাবা যেতে পারে?
