মি. ভি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন–। না না, কোনো কষ্টই না।
মি. পি যারপরনাই সবিস্ময়ে বলে উঠলেন–না! কোনো কষ্টই পাচ্ছেন না! মৃত্যুকে তবে আপনি সহজভাবেই গ্রহণ
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মি. পি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন– অবশ্যই। মৃত্যুকে আমি খুবই সহজভাবে, মানে হাসিমুখেই গ্রহণ করতে পারব।
তবে এ আমি নিঃসন্দেহ হতে পারি, এ-সম্ভাবনায় আপনি খুবই খুশি। ঠিক কিনা?
ঠিক। একটা কথা কি জানেন? জাগ্রত অবস্থায় আমি মরতে চাই। কিন্তু এ অবস্থায় মৃত্যু আমার মধ্যে কিছুমাত্রও আতঙ্ক সঞ্চার করছে তো না-ই, বরং এ-মুহূর্তে মৃত্যুই সবচেয়ে বড় কাম্য।
এর কারণ কি, মানে আপনার এরকম ধারণার কারণ সম্বন্ধে আপনার নিজের কী মনে হচ্ছে?
মেসমেরিক দশাটা মৃত্যুর এতই কাছাকাছি, যার জন্য এখন মৃত্যুই আমার একমাত্র কাম্য জ্ঞান করছি।
এটাই কী আপনার দৃঢ়প্রত্যয়?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
মি. ভি, আমি আপনার মুখ আপনার নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা আরও পরিষ্কার–আরও ভালোভাবে আমাকে বলুন।
তবে সমস্যাটা কোথায়?
দেখুন, নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা পরিষ্কারভাবে বলার জন্য যে শক্তি সামর্থ্য, যতটা চেষ্টা থাকা দরকার, তার অভাব খুব বেশি করে আমি বোধ করছি।
তবে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনার ভেতরে শক্তি সামর্থ্যের অভাব হেতু আপনি উপযুক্ত চেষ্টা চালাতে পারছেন না, এই তো?
তা তো বললামই।
আর কিছু?
আরও আছে।
আরও? সেটা কী, বলুন তো?
বার কয়েক আমতা আমতা করে মি. ভি এবার একই রকম ক্ষীণকণ্ঠে বললেন দেখুন, আপনার প্রশ্নেও যথেষ্ট ত্রুটি রয়েছে।
মানে, প্রশ্নে ত্রুটি?
হ্যাঁ, আপনার প্রশ্নগুলো জুতসই হচ্ছে না।
তবে আপনিই বলে দিন, আমি কী ধরণের প্রশ্ন করব?
গোড়া থেকে—
গোড়া থেকে? মি. পি তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলেন।
হ্যাঁ। গোড়া থেকে আবার শুরু করতে হবে।
ভালো কথা, তা না হয় করলাম। কিন্তু সে গোড়া, মানে শুরুটা যে কোথায়, তা তো বুঝতে পারছি না।
আপনার তো আর অজানা নয়, শুরুতেই অবস্থান করছেন স্বয়ং ঈশ্বর।
খুবই ক্ষীণ ও দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে মি. পি কথাটা উচ্চারণ করলেন। তবে এও সত্য যে, তাতে খুবই শ্রদ্ধার ভাব অবশ্যই রয়েছে। মি. পি এবার জিজ্ঞেস করলেন– ঈশ্বর? তবে ঈশ্বর কি, মানে ঈশ্বর সম্বন্ধে আপনার ধারণাটা জানতে পারি কী?
মিনিট কয়েক নীরবে ইতস্ততার পর মি. ভি মুখ খুললেন–আমি, আমি ঠিক বলতে পারব না।
ঈশ্বর আর আত্মার মধ্যে কোনো ফারাক আছে বলে আপনি মনে করেন কী? মি. পি নীরব রইলেন।
মি. ভি আবার এক প্রসঙ্গ পারলেন–ঈশ্বর আর আত্মা কী এক নয়? স্বয়ং ঈশ্বরই কী আত্মা নন?
আপনি আত্মা বলতে কি বোঝাতে চাচ্ছেন? এ-কথা আমি যখন জেগে ছিলাম, তখন তা জানতাম, বুঝতাম।
কিন্তু এখন? আপনার এ পরিস্থিতিতে আপনার মধ্যে কোন ধারণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে?
কিন্তু বর্তমানে আত্মা আমার কাছে ঠিক একটা শব্দমাত্র। যেমন ধরুন–সত্য, সুন্দর বলতে একটা গুণকেই বোঝায়।
মি. ভি, এবার বলুন তো, ঈশ্বর কী অজড় নন–আপনার বক্তব্য কী?
না। অবশ্যই না।
তার উত্তরটা, বিশেষ করে এমন দৃঢ়ভাবে দেওয়া উত্তরটা কানে যেতেই মি. পি সচকিত হয়ে তড়াক করে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আকস্মিক বিস্ময়ের ঘোরটুকু কাটাতে মি. পি-কে খুবই বেগ পেতে হলো। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি আবার পরবর্তী প্রশ্ন করার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলেন।
মি, পি-র এবারের প্রশ্ন–তা-ই যদি বলেন, তবে তিনি আসলে কি?
মি. ভি এবার সত্যি খুব ফাঁপড়ে পড়লেন। এ প্রশ্নের কি জবাব দেবেন, সহসা গুছিয়ে উঠতে পারলেন না। তাই অনন্যোপায় হয়েই কয়েক মুহূর্ত নীরবতার মধ্য দিয়েই কাটিয়ে দিলেন। তারপর এক সময় আমতা-আমতা করে বললেন–হ্যাঁ, তা ও তো সত্য বটে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন?
কি? সমস্যাটা কি বলে আপনি মনে করছেন?
ঈশ্বর আত্মা নন।
এ-কথা তো আগেই বললেন। কিন্তু কেন নন? আর এমন কোন সমস্যা রয়েছে, যার জন্য আপনি ঈশ্বরকে আত্মা বলে স্বীকার করতে কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না?
কারণস্বরূপ আমি প্রথমেই বলব, তার অস্তিত্ব বর্তমান, ঠিক কিনা?
হ্যাঁ, তা-তো খুবই সত্য।
আরও আছে।
যেমন–?
যেমন, তিনি বস্তু নন। অন্তত বস্তু বলতে আপনি যা বোঝেন, সে কথাই আমি বলছি।
আর কিছু?
হ্যাঁ। বস্তুর বিভিন্ন স্তর বর্তমান। স্বীকার করছেন তো?
হুম।
বস্তুর যে বিভিন্ন স্তর রয়েছে তা আমরা স্বীকার করলেও সে-বিষয়ে আমাদের তিলমাত্র ধারণাও নেই, ঠিক কিনা?
মি. পি আমতা-আমতা করে বললেন–যা বলেছেন কোনো ধারণাই নেই।
মি. ভি মুহূর্তের জন্য থেমে আবার মুখ খুললেন–এবার যা বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন–সূক্ষ স্থূলদ্বারা চালিত হয়। আর স্কুলের মধ্যে সূক্ষ মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বোঝার কোনো উপায়ই থাকে না।
হুম।
উদাহরণস্বরূপ বলছি–ধরুন, বৈদ্যুতিক নীতি আবহাওয়ার দ্বারা পরিচালিত হয়। আবার আবহাওয়া জড়িয়ে-পেঁচিয়ে অবস্থা করে বৈদ্যুতিক নীতি।
বস্তুর এ-স্তরগত পার্থক্য ক্রমেই সূক্ষতার দিকে অগ্রসর হতে হতে এমন এক সময় আসে, যখন আমরা কণাবিহীন বস্তুতে পৌঁছে যাই। এই কণাবিহীন বস্তুর গঠনগত বৈশিষ্ট্য কি, তা-ই তো ভাবছেন?
মি. পি নীরব রইলেন।
