আমার মনের কথা বুঝতে পেরে, জিজ্ঞাসা দূর করতে গিয়ে সে ম্লান হেসে বলল–আমার অসুখ-মানে দৈহিক যন্ত্রণা দূর করার জন্য আমি তোমাকে কষ্ট দিয়ে এখানে তলব করিনি।
আমি স্লান হেসে বললাম–ভালো কথা, কিন্তু এরকম জরুরি তলবের কারণটা কি–জানতে পারি কী?
অবশ্যই জানবে। সবই তোমাকে বলব।
কেন? বলো, কী তোমার কারণ?
অতিকষ্টে পাশ ফিরে শুতে শুতে বলল–শোনো, বর্তমানে কয়েকটা মানসিক চিন্তা আমার কাছে খুবই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কম বিস্ময় উৎপাদনও করেনি।
হুম!
তোমাকে ডাকার কারণ হচ্ছে, সেগুলো সম্বন্ধে জ্ঞান-বুদ্ধি আর উপদেশ দিয়ে আমার স্বস্তি ফিরিয়ে দেবেন।
ঠিক মাথায় গেল না।
মন দিয়ে শোনো, আরও খোলাখুলি বলছি–আমি আত্মার অমরত্বের ব্যাপারে মনে যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করি, আশাকরি সে-কথা আমাকে বলার দরকার নেই।
হুম!।
একটা কথা মনে রেখো, এ ব্যাপারটা নিয়ে আমি কিন্তু তেমন ভাবনা চিন্তা করি না। আসল কারণ কী জানো? ব্যাপারটা নিয়ে যুক্তিবিচারের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়েই আমি অধিকতর সন্দিগ্ধচিত্ত হয়ে পড়েছি।
আমি তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নীরবে তাকিয়েই রইলাম। তার কথার জবাবে বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে মুখ বুজে সবকিছু মন দিয়ে শোনা ছাড়া গতিও তো কিছু নেই।
তারপর কি বলছি ধৈর্য ধরে শেনো, আমাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কুজিন পড়াশুনা করার জন্য।
আমি এবার মুখ না খুলে আর নিজেকে সামলেসুমলে রাখতে না পেরে বললাম কুজিনের লেখা বইপত্র পড়েছ কী?
পড়েছি। তার লেখা এক-এক করে বেশ কয়েকটা বই পড়েছি। কেবল তাঁর লেখার কথাই বা বলি কেন? তার মার্কিন আর উত্তরোপীয় অনুরাগীদের বইপত্র পড়েছি।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
উদাহরণস্বরূপ চার্লস এলউড বইটা ভাগ্যগুণে আমি হাতে পেয়েছিলাম।
চার্লস এলউড মি. ব্রাউলসন-এর লেখা আশা করি আপনার জানাই আছে, তাই না?
হুম!
তিনি বইটার উপসংহারে অতি সংক্ষেপে যে বক্তব্য পেশ করেছেন, তা বারবার পড়ে আমি বাধ্য হয়ে এ-সিদ্ধান্তই নিতে বাধ্য হয়েছি, তিনি যা-কিছু বলতে চেয়েছেন, তা যেন তিনি নিজেই বোঝেননি। ব্যাপারটা যদি নিজেকেই ভালোভাবে বোঝাতে না পেরে থাকেন, তবে অন্যের মধ্যে ধারণা সঞ্চার কি করে সম্ভব, বলো?
আর কিছু? তোমার মধ্যে আর কোনো ধারণা–
ধৈর্য ধরো, আরও বলছি।
আমি চেয়ারটায় একটু নড়েচড়ে বসে তার বক্তব্য শোনার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় রইলাম। সে একটু দম নিয়ে আবার মুখ খুলল–হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, আমি কিন্তু অচিরেই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম, এরকম যুক্তির জাল ছড়িয়ে মানুষকে তার অমরত্বের বিশ্বাসের জালে আটকে ফেলা সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
আমি তোমার সঙ্গে সহমত পোষণ করছি।
সে আমার কথায় কান দিল কি না বলা মুশকিল। তবে এটা সত্য যে, আমার ইচ্ছা সেটাকে সমর্থন করতে পারে সত্য বটে, কিন্তু মন কিছুতেই মেনে নিতে উৎসাহি হবে না–এমনকি বুদ্ধি-বিবেচনাও না।
বেশ কয়েকটা ব্যাপারে আমার মধ্যে ধারণা জন্মেছে, মেসমেরিক অবস্থায় আমাকে কিছু সংখ্যক নির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয় তবে হয়তো ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে ফল সম্বন্ধে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
তার প্রস্তাবে আমি রাজি হয়ে গেলাম।
আমার দিক থেকে সবুজ সঙ্কেত পেয়ে তার মধ্যে স্বস্তির লক্ষণ প্রকাশ পেল।
ব্যস, আর মুহূর্তমাত্ৰ সময় নষ্ট না করে কাজে লেগে গেলাম।
বেশি ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলো। প্রথমবার চেষ্টা করতেই মি. ভ্যানকার্ক মেসমেরিক ঘুমের শিকার হয়ে বিছানায় একেবারে এলিয়ে পড়লেন।
সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ামাত্র তার শ্বাসক্রিয়া সহজভাবেই চলতে লাগল। আমি অনুসন্ধিৎসু নজরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম, সত্যি তার শ্বাসকার্যে এতটুকুও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়নি। আরও একটা ব্যাপার আমার নজরে ধরা পড়ল, এ অবস্থায় তার মধ্যে কোনোরকম শারীরিক অস্বস্তি দেখতে পেলাম না। মোদ্দাকথা, তার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে আমার মনে হলো যেন একটা লোক আমার সামনে গভীর ঘুমে ডুবে রয়েছে।
এবার সংলাপ শুরু করার পালা। এক্ষেত্রে রোগীর নামকরণ হলো ভি, আর আমি পি।
এবার উভয়ের কথোপকথন শুরু করা যাক—
মি. পি বলল–মি. ভি, আপনি কি ঘুমোচ্ছেন?
মি. ভি ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিল–হা-না, এখন গভীর ঘুমে ডুবে যেতে পারিনি।
তবে কি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছেন, এটাই বলতে চাইছেন?
তা অবশ্য মনে করতে পারেন।
এ-মুহূর্তে আপনার সবচেয়ে তীব্র আকাঙ্ক্ষা কি, দয়া করে বলুন?
গভীর ঘুমে ডুবে যেতে চাই।
কয়েকমুহূর্ত নীরবে থেকে মি. পি এবার বলল–এখন কি আপনি ঘুমিয়েছেন?
হুম।
তবে আপনি এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন, তা-ই কী?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
এবার নিজের সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি, বলবেন কী?
ধারণা? কি জানতে চাইছেন খোলাসা করে বলুন।
আপনার বর্তমান ব্যামোর কোন পরিণতি হতে পারে বলে আপনি নিজে ভাবছেন?
দীর্ঘ ইতস্ততের পর, ব্যাপার বলার চেষ্টা করে মি. ভি এবার আগের মতোই ক্ষীণকণ্ঠে জবাব দিলেন মারা যাব–আমি মারা যাব।
মৃত্যু-ভাবনা কী আপনার মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে?
হুম।
এবার বলুন তো, আপনার মধ্যে মৃত্যু-ভাবনা প্রকট হয়ে পড়ায় আপনি কী কষ্ট পাচ্ছেন?
