আমার পরিণতি যে কি হবে সে কথাটা ভাববার মতো সামান্যতম ফুরসত বা মন। কোনোটাই আমার নেই।
আমাদের জাহাজটা দ্রুত গতিতে অনবরত চক্কর মেরেই চলেছে। এবার লক্ষ্য করলাম, বৃত্তগুলো যেন ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। আর আমরা দ্রুত সমুদ্রের অতল গহ্বরের দিকে ধেয়ে চলেছি–তলিয়ে যাচ্ছি ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে।
নিরবচ্ছিন্ন আর্তচিৎকার, অনবরত গোঁ-গোঁ রবে আর্তনাদ হতে লাগল। আর সে সঙ্গে সমুদ্র আর ঢেউয়ের বজ্র-গম্ভীর বুক-কাঁপানো গর্জন তো রয়েছেই। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে জাহাজটা যেন মোচার খোলার মতো বার বার এদিক-ওদিক অস্বাভাবিক দুলতে লাগল। হায়! হায় ঈশ্বর! জাহাজ ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে! সমুদ্রের অতলগহ্বরে আশ্রয় নেবার জন্য আমাদের জাহাজটা যেন অস্থির হয়ে পড়েছে।
মেসমেরিক রেভেল্যেশন
মেসমেরিজম!
মেসমেরিজম, আমরা যাকে মৈস্মরবিদ্যা বলে জানি, তার যুক্তিটুক্তি সম্বন্ধে আমাদের মনে যত সন্দেহই জেগে থাকুক না কেন, সে বিষয়ের অদ্ভুত ঘটনাগুলো সম্বন্ধে কিন্তু প্রায় সবারই ভালো ধ্যান-ধারণা রয়েছে। তা সত্ত্বেও যাদের সন্দেহ বাতিক রয়েছে, সহজে অত্যাশ্চর্য কোনো ঘটনাকে বাস্তব বলে হাসিমুখে মেনে নিতে উৎসাহি নয়, সন্দেহ করাটাই তাদের কাজ। সবকিছুতেই সন্দেহ করে তারা গন্ধ শুঁকতে মেতে যায়।
সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত লোকগুলোনিষ্কর্মা আর বিশ্বনিন্দুক ছাড়া আর কোনো আখ্যায় আখ্যায়িত করা যেতে পারে, আমার মাথায় আসছে না।
কেবলমাত্র ইচ্ছাশক্তির দ্বারাই কোনো একজন, অন্য একজনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে আর এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখে তাদের হাসিমুখে ঠেলে দিতে পারে, যাকে প্রায় মৃত্যুর সামিলই মনে করতে দ্বিধা থার কথা নয়। অর্থাৎ সে যেন মৃত্যুর শিকার হয়ে পড়েছে, এমন মনে করতে বাধা নেই।
আর সে মর্মান্তিক অবস্থায় পড়লে লোকটা বহু চেষ্টা চালালেও খুবই দুর্বলভাবে তার বাইরের ইন্দ্রিয়গুলোকে কার্যকর করতে সক্ষম হয়। অথচ কোনো সূক্ষ বিশ্বাসের মাধ্যমে আর আমাদের নিতান্ত অজানা, একেবারেই অভাবনীয়ভাবে কোনো বস্তুকে। চাক্ষুষ করতে পারে, যা দৈহিক ইন্দ্রিয়গুলোর আয়ত্তের বাইরে। তাছাড়া তার বুদ্ধিমত্তাও একান্তই অভাবনীয়ভাবে সক্রিয়, সজীব ও উন্নত হয়ে পড়ে।
তার মনে যে লোকটা, এভাবে প্রভাব বিস্তার কওে, তার প্রতি সঙ্গতকারণেই। সহানুভূতি প্রগাঢ় হয়ে পড়ে। আর মোদ্দা কথা হচ্ছে, এরকম ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির সঙ্গে লোকটার প্রভাবিত হবার ইচ্ছাটাও বৃদ্ধি পায়। আর এজন্যই লোকটার কাজকর্ম অধিকতর ব্যাপক ও স্পষ্ট হয়ে পড়ে। এটাই নিয়ম, এটাই স্বাভাবিক।
এটাই আমি বোঝাতে চাইছি যে, মেসমেরিজম বিদ্যার এসব বিশেষত্বকে প্রমাণ করে দেখানোর প্রয়াস অপ্রয়োজনীয় ছাড়া কিছু নয়। তাই তো সে রকম অ-দরকারি কোনো কাজ আজ আমি এখানে উল্লেখ করে বিরক্তির কারণ হতে আদৌ উৎসাহি নই। বরং পাঠক-পাঠিকারা মনে করতে পারেন, আজ আমি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা উৎসাহ নিয়ে কলম ধরেছি। হরেক রকম প্রতিকূল ধারণা থাকা সত্ত্বেও আজ আমি কোনো বয়স, মন্তব্যের অবতারণা না করেই, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ বিষদভাবে তুলে ধলতে উৎসাহি হয়েছি, যেটা কোনো এক স্বপ্নের ঘোরে ভ্রমণকারী ব্যক্তি আর আমার মধ্যে হয়েছিল। আর সে সংলাপ পাঠ করলে পাঠক-পাঠিকাদের উল্লেখযোগ্য ভাবান্তর ঘটবে–ঘটতে বাধ্য হবে বলেই আমার নিশ্চিত ধারণা।
বহুদিন যাবই আমি মি. ভ্যাজকার্ক স্বপ্নের ঘোরে ভ্রমণকারী লোকটাকে স্বপ্নবস্থায় অভিভূত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার কর্মতৎপরতা আর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে তার অভিভূত হয়ে পড়ার ইচ্ছা আর উন্নতিও উত্তরোত্তর বেড়েই যাচ্ছিল।
বহুদিন যাবৎ লোকটা খয়-রোগে ও ঠন্ডায় ভুগছিল। আমার একনিষ্ঠ প্রয়াসের ফলে তার রোগটা অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণগুলো ক্রমেই হাস পাচ্ছিল। রোগ নিরাময় না হলেও যন্ত্রণার উপশম যে কিছু না কিছু হচ্ছিল এতে কোনোই দ্বিমত নেই।
বর্তমান মাসের পনেরো তারিখে তার রোগশয্যার পাশে আমাকে তলব করে পাঠানো হলো। সে ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না।
এই বিকেলে আমি ঝোলা-কাঁধে রোগীর ঘরে হাজির হলাম। আমি ঘরে পা দিয়েই ব্যাধিগ্রস্ত লোকটার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়েই বুঝে নিলাম। সে ব্যাধির যন্ত্রণায় খুবই কষ্ট পাচ্ছে। শ্বাসকষ্টও হচ্ছে খুবই না। তবে যক্ষা রোগের অন্য সব লক্ষণ খুবই স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। এরকম খিচুনি শুরু হলে স্নায়ুকেন্দ্রগুলোতে সামান্য পরিমাণে সরষের তেল মালিশ করলে রোগী কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! আজ রাতে এরকম চিকিৎসায় কিছুমাত্রও উপকার হলো না।
আমি চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরের ভেতরে পা দিতেই সে মুখে মুচকি হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে আমাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাল। আমাকে কাছে পাওয়ায় সে বড়ই আনন্দিত হয়েছে, আমার বুঝতে ভুল হলো না।
তার চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম, সে ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায় দগ্ধ হলেও মনের দিক থেকে শান্ত স্বস্তিতেই সময় কাটাচ্ছে।
একটা চেয়ারে শান্ত হয়ে বসতে বসতে আমি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালাম।
