ইতিপূর্বে তেমন কোনো ভাবের শিকার অবশ্যই হইনি। সে যে কী এক অবর্ণনীয় ভাব, তার বর্ণনা করা আমার কাছে বাস্তবিকই কঠিন সমস্যার ব্যাপার।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি জীবনভর প্রত্নতাত্বিক বস্তুসামগ্রি ঘাঁটাঘাঁটি করেই কাটিয়েছি। অর্থাৎ আমার অতীত কেটেছে মৃতের স্তূপ ঘাটাঘাটি করে। প্রত্নবস্তু কেনাবেচা করাই আমার একমাত্র পেশা। তাই বলতেই হয়, বর্তমানকে নিয়ে কোনোদিনই আমার মাথা ব্যথা ছিল না, অতীতই ছিল আমার সম্বল। আমার আত্মা ধ্বংসস্তূপে পরিণত না হওয়া অবধি আমি পৃথিবীর বহু দেশে চক্কর মেরে বেড়িয়েছি। আমি হরদম ঘুরে বেড়িয়েছি টার্ডমোর, বলবেক আর পার্সিপোলিসের প্রভৃতি ধ্বংসস্তূপে। আমার ঘুরে বেড়ানো ছিলনিত্যকার ব্যাপার।
ইদানিং মাঝে মধ্যেই নিজের অতীত আচরণের জন্য লজ্জাবোধ করি। তখন আমার মধ্যে যে ভয়ের সঞ্চার ঘটত, মন-প্রাণ ভয়ে আঁতকে উঠত আর যে অবর্ণনীয় ভয়ে থেকে থেকে কুঁকড়ে যেতাম আজ সে সব কথা স্মৃতির পটে ভেসে উঠলে খুবই লজ্জাবোধ করি, নিজেকে কম ছোট মনে হয় না।
একটা কথা, আমার অতীত জীবনে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে যে ঝড়ের তাণ্ডবের শিকার হয়েছে, আতঙ্কে শিউরে উঠে, বাতাস আর সমুদ্রের সে তাণ্ডবকে সাইমুন ও টর্ণেডো বলে বর্ণনা করলেও তাকে ছোট করেই ব্যক্ত করা হবে। আর এরকম ভয়ঙ্কর একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আমি কি আতঙ্কিত না হয়ে পারি? হ্যাঁ, সে পরিস্থিতিতে কেবলমাত্র আমি নই, যে কোনো বীরপুরুষই আতঙ্কে মুষড়ে পড়তে বাধ্য।
ভাঙাচোরা জাহাজটা গর্জনরত সমুদ্রের জলরাশির ওপর দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে তো চলেছেই। শুধুই কি সমুদ্রের উদ্দামতা? আমাদের জাহাজটাকে ঘিরে রেখে অন্তহীন জমাটবাধা অন্ধকার। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, অন্ধকার যক্ষপুরীর মধ্য দিয়ে আমাদের জাহাজটা যেন বাতাসের বেগে ধেয়ে চলেছে। আর ফেণাহীন পানির তোলপাড়ানি তো আছেই। প্রবল জলোচ্ছাস। আর থেকে থেকে অন্ধকার ভেদ করে প্রায় এক লীগ দূরত্ব জুড়ে অস্পষ্টভাবে বরফের প্রাচীর। বরফের প্রাচীর তুলে যেন দূর্গকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। আর সে প্রাচীর যেন আকাশছোঁয়া। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর প্রাচীর যেন অন্ধকার আকাশেরনির্জনতা ভঙ্গ করে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করছে।
আমার আশঙ্কা অমূলক নয়। বরং আমি যে আশঙ্কা করেছিলাম বাস্তবেও তাই ঘটে চলেছে। আমাদের ভাঙাচোরা জাহাজটা সত্যি সত্যি স্রোতের কবলে পড়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। তবে জোয়ারের ফলে সে উদ্দাম স্রোতটা সাদা বরফের গায়ে আছড়ে পড়ার পর প্রচণ্ড গতিতে জলপ্রপাতের সুতীব্র বেগ দক্ষিণ দিকে ধেয়ে চলেছে। তাকে যদি ওই নামকরণ করা উচিত মনে হয়। স্রোতের দুরন্ত টানে আমাদের জাহাজটা কে জানে, কোন হারা উদ্দেশে ধেয়ে চলেছে তো চলেছেই।
আমার বিশ্বাস, আমার তখনকার আতঙ্কের অনুভূতিকে উপলব্ধি করা তিলমাত্রও সম্ভব নয়। সবকিছু নিশ্চিতভাবে জেনে-বুঝেও আমাকে সে অঞ্চলের জমাটবাধা রহস্য ভেদ করার অত্যুগ্র কৌতূহল, অভাবনীয় আগ্রহের কাছে আমি পরাজয় স্বীকার না করে পারলাম না। আমি অগ্র-পশ্চাৎ আর ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা নিঃশেষে হারিয়ে ফেললাম, তাই তো রহস্য ভেদের অদম্য কৌতূহল নিয়ে আমি মৃত্যুর সে ভয়ঙ্কর মূর্তির মুখোমুখি হওয়ার জন্য এগিয়ে না গিয়ে পারলাম না। আর এও সম্পূর্ণ সত্য যে, কোনো উত্তেজনাপূর্ণ জ্ঞানের দিকে আমরা দ্রুত, অতি দ্রুত ধেয়ে চলেছি–এমন এক জমাটবাধা অন্তহীন রহস্যের দিকে অগ্রসর হয়ে যাকে পাওয়ার অর্থই হচ্ছে নিশ্চিত ধ্বংস-মৃত্যু।
আমরা কোথায় চলেছি, কোথায় গিয়ে যে আমাদের এ যাত্রা ভয়ঙ্কর, এ পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটবে, কিছুই জানা নেই। এমনও হতে পারে, এ দুর্বার জলস্রোত আমাদের একেবারে দক্ষিণ মেরুতে নিয়ে হাজির করবে। আর আমরা হয়তো বা ভয়ঙ্কর সে অন্তিম পরিণতির দিকে যাব।
জাহাজের নাবিকরা কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে নেই। তারা অস্থির আর কাঁপা কাঁপা পায়ে ডেকের ওপর হাঁটাহাঁটি করছে।
আমি আবারও অনুসন্ধিৎসু নজরে নাবিকদের এর-ওর মুখের দিকে বার বার তাকাতে লাগলাম। তাদের মুখে এখন যেন কেমন একটা নতুন ছাপ দেখতে পেলাম। তাদের চোখ মুখে হতাশার ও বিরক্তির ছাপটুকু যেন অনেকাংশে ম্লান হয়ে গেছে, আর সে জায়গা দখল করেছে গভীর আশা। মুখের হালকা হাসির প্রলেপটুকু আমাকে এ কথাটা ভাবতেই উৎসাহিত করছে।
কখন যে বাতাসের গতিবেগ মন্থর হয়ে গেছে, আর কখন যে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে গেছে, আমি কিছুই টের পাইনি। এখন বাতাস পিছন দিকে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে তিরতির করে বইতে শুরু করেছে।
অত্যাশ্চর্য একটা ব্যাপার আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমরা যখন পালের গদাটাকে কোনোরকমে বয়ে নিয়ে অগ্রসর হতে আরম্ভ করেছি, ঠিক সে মুহূর্তেই জাহাজটা সমুদ্রের ওপরে মাঝে মাঝে ভেসে উঠতে লাগল। হায়! এ কী মহাচক্করে পড়া গেল রে বাবা! এ কী নতুনতর আতঙ্কের শিকার হয়ে পড়লাম। একের পর এক আতঙ্ক আমার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে লাগল।
এক সময়ে আচমকা লক্ষ্য করলাম, আমাদের সামনের সমুদ্রটা যেন দু-দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। আর বাঁ দিকেও। সুবিশাল একটা রঙমঞ্চকে কেন্দ্র করে আমরা ভেঁ-ভোঁ করে অনবরত চক্কর মারতে শুরু করলাম। আর উভয়দিকে জমাটবাঁধা ঘুটঘুঁটে অন্ধকার বিরাজ করছে। সে গাঢ় অন্ধকারে রঙ্গমঞ্চটার প্রাচীরের শীর্ষদেশগুলো দূরের অন্ধকারে চাপা পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
